চতুর শিয়াল

Print Friendly, PDF & Email

বাঘ, শিয়াল, বানর, নেউল আর ইঁদুর পাঁচ বন্ধুতে বেজায় ভাব। তারা সারাদিন একসঙ্গে বনে ঘুরে বেড়ায় আর শিকার ধরার চেষ্টা করে। যদিও সব দিন সমান শিকার মেলে না; তারপরও ছোট হোক বড় হোক শিকার করে সবাই মিলে ভাগ করে খায়। শিকারের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের নির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে। এজন্য ভাগ সব সময় সমান হয়। বাঘের দায়িত্ব শক্তি দিয়ে শিকারকে পরাজিত করা। শিয়াল হলো পরামর্শদাতা। বানরের দায়িত্ব গাছের মগডালে উঠে আশেপাশে শিকার থাকলে দেখে বন্ধুদের জানানো।

আর ইঁদুর?

তার দাঁতে বেজায় ধার। শিকার করতে অনেক সময় কাজে লাগে। নেউলও শিকার ধরতে সাধ্যমতো সাহায্য করে। সুতরাং পাঁচ বন্ধু মিলে শিকার করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না।

কিন্তু একদিন সমস্যা হলো এক হরিণ শিকার করতে গিয়ে। এ যে সে হরিণ নয়! তার গায়ে এবং পায়ে ভয়ানক জোর। মাথায় ইয়া বড় শিং! দৌড়ে তাকে ধরতে গিয়ে বাঘ পর্যন্ত ফেল্টুস হলো। হরিণের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে বেচারা বাঘ ঘেমে অস্থির, দম আসে আর যায় এমন অবস্থা!

বানর এমনিতেই নিরামিষভোজী। মাংস সে খায় না বললেই চলে। সুতরাং বাঘের পরাজয় দেখে সে আগেই হাল ছেড়ে দিয়ে গাছের ডালে উঠে বসে রইলো। শিয়াল হরিণের শিং দেখে আগেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সে সেদিনের মতো হরিণের পিছু না নিয়ে বন্ধুদের ডেকে আলোচনায় বসল।

শিয়াল বলল, এভাবে হরিণকে পরাস্ত করা যাবে না। হরিণ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন তাকে আক্রমণ করতে হবে। প্রথমেই ইঁদুর হরিণের পায়ের রগ কেটে দিবে। তাহলে হরিণ আর দৌড়াতেও পারবে না, শিং বাকিয়ে তেড়েও আসবে না। তারপর বাঘ গিয়ে হরিণের ঘাড় মটকে দিলেই কেল্লাফতে।

পরিকল্পনাটা সবার পছন্দ হলো। কিন্তু হরিণ কখন ঘুমাবে, কোথায় ঘুমাবে এটা জানাবে কে? শিয়াল এ দায়িত্ব বানরকে দিলো। বানর গাছের উপর থেকে হরিণের উপর লক্ষ রাখবে।

সব শুনে বাঘ বলল, তবে তাই হোক।

ইঁদুর বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ তাই হোক।

নেউল বলল, ঠিক ঠিক তাই হোক।

পরদিন পরিকল্পনা অনুযায়ি ইঁদুর যখন ঘুমন্ত হরিণের পায়ের রগ কেটে দিলো তখন কাছাকাছি ঝোঁপের আড়াল থেকে বাঘ হুঙ্কার দিয়ে বেড়িয়ে এসে আহত হরিণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বেচারা হরিণ! মৃত্যুর আগে লড়াই করার সময়টুকু পেল না।

এবার বন্ধুদের আনন্দ দেখে কে! শিয়াল নাচতে নাচতে বলল, এই শিকারের জন্য আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি। এবার তোমরা সবাই ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে এসো। আমি ততক্ষণ এটাকে পাহাড়া দিচ্ছি। তোমরা ফিরে এলে একসঙ্গে মজা করে আজ হরিণের মাংস খাবো।

সবাই হাত-মুখ ধোয়ার জন্য চলে যেতেই শিয়াল কখনও ঘাড় উঁচু করে, কখনও কান খাড়া করে পাহাড়া দিতে লাগল। ভাবটা এমন সে দায়িত্ব পালনে কোনো ত্রুটি করছে না। একটু পর বাঘ হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে আসতেই দেখল, হরিণ মুখ ভার করে বসে আছে। বাঘ বলল, বন্ধু কী ব্যাপার, আজ এই আনন্দের দিনে তোমার মুখ ভার কেন?

শিয়াল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, সেকথা শুনে আর কী করবে বন্ধু?

বাঘ বলল, তারপরও তুমি বলো।

শিয়াল বলল, বাদ দাও সেকথা। তুমি হরিণের মাংস খাও। আমি যাই।

বাঘ আশ্চর্য হয়ে বলল, কেন?

শিয়াল এবার কেঁদেই ফেলল। বলল, সেদিনের পিচ্চি ইঁদুর বলে কিনা এই হরিণ শিকারে তোমার কোনো অবদানই নেই। একথা শোনার পর মনটা এতো খারাপ হয়ে গেল যে এই হরিণের মাংস আমার ছুঁয়ে দেখতেও আর ইচ্ছে করছে না। পাজি ইঁদুর তোমার কী বদনামটাই না করলো!

একথা শুনে বাঘ তো রেগে টং। হুঙ্কার দিয়ে বলল, বটে! তুমি দাঁড়াও, আমি এখুনি আরো দশটা হরিণ মেরে আনছি। তারপর আমরা ঐ হরিণের মাংস খাবো।

একথা বলে বাঘ চলে যেতেই ইঁদুর এসে উপস্থিত। ইঁদুরকে দেখে শিয়াল ব্যস্ত হয়ে তার কাছে এগিয়ে এসে বলল, ভাই ইঁদুর তুমি বাঘকে কী বলেছ? বাঘ ভীষণ রেগে আছে। আমি তাকে অনেক বোঝালাম কিন্তু তার রাগ কিছুতেই কমছে না। তার সামনে পরলে আজ আর তোমার রক্ষা নাই।

সব শুনে ইঁদুর এমন ভয় পেল যে লেজ গুটিয়ে এক দৌড়ে গর্তে ঢুকে পড়ল। ইঁদুর গর্তে লুকানোর পর বানর এলো। বানরকে দেখে শিয়াল বলল, বন্ধু খবর খুব খারাপ! বাঘ এইমাত্র তোমাকে খুঁজতে বের হলো। বলল, আজ নাকি তার হরিণ খেতে ভালো লাগছে না। আজ সে বানরের মাংস খাবে। বন্ধু হয়ে কেউ বন্ধুকে খায়? ছি ছি ছি। আমি তাকে কত বুঝালাম কিন্তু কিছুতেই সে আমার কথা শুনল না। সময় থাকতে বন্ধু তাড়াতাড়ি পালাও।

একথা শুনে বানর এমন ভয় পেল যে এক লাফে গাছের ডাল ধরে ঝুলতে ঝুলতে চম্পট দিলো। বানর চলে যেতেই ধূর্ত শিয়াল গায়ে হরিণের রক্ত, ধুলোবালি মেখে মাটিতে আঁচড় কাটতে লাগল। তারপর চোখ লাল করে বিকট ভেংচি দিয়ে বসে রইল।

নেউল হাত-মুখ ধুয়ে এসে দেখে একী বিষম কাণ্ড! নেউল যতই শিয়ালকে বলে, কী হয়েছে? শিয়াল ততই ভেংচি কেটে, দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে নেউলের দিকে তেড়ে আসে। শেষে নেউল অনেক মিনতি করে বলল, ভাই কী হয়েছে বলোই না?

এবার শিয়াল নাক ফুলিয়ে, চোখ পাকিয়ে বলল, বাঘ পালাল, বানর পালাল এখন নেউল বলে কি না, কী হয়েছে? এবার তোমার পালা। সময় থাকতে পালাও। নইলে ওদের মতো মেরে তোমাকেও…

শিয়ালের এমন রাগী চেহারা দেখে নেউল আগেই ভয় পেয়েছিল। এখন সব শুনে বলল, হরিণের মাংস আমার দরকার নেই ভাই, আমি চললাম। এভাবে একে একে সবাই চলে যেতেই শিয়াল আরাম করে হরিণের মাংস খেতে বসল। সে একবার মাংসে কামড় দেয় আর হো হো করে হেসে ওঠে। চতুর শিয়ালের আনন্দ আর ধরে না!