‘ভ্রাম্যমাণ ভালোবাসা’

Print Friendly, PDF & Email

আমাদের গল্পটার শুরু হয় ইন্টার লাইফের কলেজের ব্যস্ততার দিনগুলোতে। এই কলেজে নিজের মন কাউকে খুব একটা আকৃষ্ট করেনি। একেবারেই যে করেনি তা না, ভালোও লেগে যেত কাউকে কাউকে। তবে সেই দূর থেকে ভালোলাগা পর্যন্তই। ফার্স্ট ইয়ারে কলেজেরই একটা মেয়ের সাথেই ভালোমতো পরিচয় হয়। পরিচয়ের শুরুটা ফেসবুকে চ্যাটের মধ্য দিয়ে। এরপর নম্বর নিয়েছিলাম। হোয়াটসঅ্যাপে শুরু হলো কথা। একদিন ওকে কলেজের পূর্বগেটে দেখে টেক্সট করেছিলাম যে আমি এপাশে আছি। সাথে ওর দুটো বান্ধবী ছিল। ও একা আমার দিকে এগিয়ে আসল। সেদিনই আমাদের প্রথম দেখা। বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর সুযোগ হয়নি। এরপর সময়ে অসময়ে কথা হতো। ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের সম্পর্কটার মাত্রা অনেকখানি বেড়ে গিয়েছে। আমার কেন যেন মনে হতো ও আমাকে হয়তো পছন্দ করে। ওর কেয়ারে বিরক্তির ছাপ আর ভালোলাগার অদলবদল হলেও শেষপর্যন্ত ভালোলাগাটাই জায়গা করে নিলো। আমি তখনও বুঝতে পারিনি আমার ওকে ঠিক কতটা ভালো লাগে। দুজনের বাসা দুই দিকে। কিছুদিন পর থেকে বাসায় আসার সময় একসাথে আসা শুরু করলাম। কলেজ শেষে বাসে করে বাসায় যেতে হতো। অনেকখানি রাস্তা একই দিকে গিয়ে দুজনের দুই রাস্তা। আমাকে তাই অনেক আগে নেমে যেতে হতো। যতক্ষণ একসাথে থাকতাম, পাশাপাশি বসতাম। আমার ওকে রেখে নেমে যেতে খারাপ লাগতো। অনেকসময় আমি আর না নেমে ওর সাথেই শেষপর্যন্ত যেতাম, তারপর বাসায় ফিরে আসতাম। আবার এমনও হয়েছে আমি ওর সাথে শেষপর্যন্ত এসে পড়লে ওউ আমার সাথে আমার বাসার দিক পর্যন্ত এসেছে, তারপর আবার ও বাসায় ফিরে গেছে। দুজনের বাসার দূরত্বটা সেই বাসের হিসেবে ৪০ মিনিটের হবে। ভালোই দূর বলা যায়। সারাদিন ক্লাস কোচিং করে বাইরে ঘুরার সময়টা নগণ্য। ও কখনও বাসায় মিথ্যা বলে আমার সাথে দেখা করতে আসেনি। তাই প্রতিদিনের ক্লাসের শেষে সেই একসাথে আসাই দেখা হওয়ার সেরা উপায় ছিল। ওর বাইরে কোনো কাজ থাকলে তার মাঝেও আমার সাথে দেখা করতো। অবশ্য প্রথম হাত ধরা অই বাসের মধ্যেই, যদিও আমি তখনও ওকে প্রপোজ করিনি। তবে ততদিনে ভালোমতোই দুজন দুজনকে বোঝা হয়ে গেছে যে, আমরা একে অপরকে পছন্দ করি। সেদিন ওর হাত ধরায় ওর আপত্তি না দেখেই ওর মনের কথা পড়ে ফেলেছিলাম। এক হতাশার কারণে একবার সিগারেট ধরেছিলাম, খুব মন খারাপ থাকলে লাইটারটা হাতে নিতে ভুলতাম না। ওর সেটা নিয়ে খুব আপত্তি ছিল। ওর অভিমানের কারণে সেটা ছাড়তেও পেরেছি, অবশ্য ওর অভিমান থেকে ওর ভালোবাসার কারণে বললেই বোধ হয় বেশি ঠিক হয়।৮ ফেব্রুয়ারি, কিছুটা ঘুম নির্ঘুম মেশানো রাতের প্রহর শেষে ভোর হয়ে এসেছে। ওকে ফোনে পেলাম, দেখি জেগে আছে। কথায় কথায় ফোনে অনেকটা অপ্রস্তুতভাবেই বলে দেই আমি ওকে ভালোবাসি। অনেক দিনের চাপা কথা মুখ দিয়ে বের হয়েই গেল। সেদিন থেকেই দুজনের স্বীকৃত সম্পর্কের অভিষেক। এরপর একসাথে ঘুরেছি, একজন আরেকজনের জন্য অপেক্ষা করেছি, হাতে হাত রেখে হেঁটেছি, কখনও বা ওর মাথা আমার কাঁধে জায়গা করে নিত আর বাসের সেই ভ্রাম্যমাণ প্রেম তো ছিলই। সবকিছু মিলিয়ে প্রেমের স্বর্গে এসে পড়েছিলাম মনে হচ্ছিল। এভাবেই মিষ্টিভাবে কেটে গেল ইন্টার লাইফ।

সামনে অ্যাডমিশন টেস্ট। দুজনেরই ইচ্ছা মেডিকেলে পড়া। সুস্মিতা পড়ালেখায় বরাবরই সিরিয়াস। অ্যাডমিশন টেস্টে ওর মেডিকেলে চান্স হয়ে গেল। দুর্ভাগ্যবশত আমার কপালে তা লেখা ছিল না। এরপর ভর্তি হই চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে। আর ও ঢাকায় চলে গেল। ওর আমাকে নিয়ে কোনো আপত্তি ছিল না। ও আমাকে সবভাবেই চেয়েছে, সবটুকু দিয়েই ভালোবেসেছে। ডিসেম্বরে একদিন ওর বড় দিদি ওর মোবাইল ফোনে আমাদের মেসেজগুলো দেখে ফেলে। ওর দিদি ওকে আলাদা ডেকে নিয়ে সব সত্যি জানতে চায় আর সুস্মিতাও সব সত্যিই বলে। ওর বাসায় হয়তো আমি যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হইনি। ওর বাসা থেকে সম্পর্ক রাখতে বারণ করল, কথা না বলতে বলল, দুজনের পড়াশোনা শেষ হলে দেখবে জানালো। পরে একদিন দেখা করে ও আমাকে ওর বাসার ঘটনা জানায়। তবে ও থামেনি, আমাদের সম্পর্ক থেমে থাকেনি। আমি সেকেন্ড টাইম মেডিকেলে এক্সাম দিব ঠিক করেছিলাম। ও ঢাকা থেকে ওর নোটগুলো চিটাগাং নিয়ে এসে আমাকে দিয়েছিল। মাঝেমধ্যে ডিপ্রেশনে থাকতাম। ও অনেক সাপোর্ট দিত, কীভাবে কী পড়তে হবে সেসবও বলতো। ছুটিতে ও চিটাগাং আসলেও দুই-একবারের বেশি দেখা হতো না। মিথ্যে বলে ওর বের হবার অভ্যাস হয়নি তখনও। ও আবার চলে যাবার সময় আমি স্টেশন আসতাম। খুব অল্প সময়ের জন্য ওকে দেখতে পেতাম। রোজ পাশে পাওয়া মানুষটাকে নিজের সামনে থেকে দূরে চলে যাবার দৃশ্যটা সহ্য করে নিতে হতো। আর ফোনই তখন দুজনের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হতো। দেখতে দেখতে আরও একটি বছর প্রায় শেষ। ওর সান্নিধ্যে অ্যাডমিশন টেস্ট পর্যন্ত এগিয়ে গেছি, পরীক্ষাও ভালো হয়েছিল। সফলতার মুখও দেখেছি। দুজনের লাইফে একটা স্বস্তি নেমে আসল বলে মনে হলো। এরপর ওদের বাসা থেকেই একবার দিদির ফোন পেয়েছিলাম, ভালোমতো পড়ালেখার উপদেশ দিয়েছিল। দুজনে এখন দুই মেডিকেল কলেজে। ও ঢাকায় আর আমি বরিশালে।