মহাসড়ক নয় যেন মরণ ফাঁদ : লক্ষ্মীপুর-ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লার সড়ক বেহাল

Print Friendly, PDF & Email

নোয়াখালীতে সড়ক-মহাসড়কগুলোর বেহাল অবস্থা। এসব সড়কে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে ধীরগতিতে শত শত যানবাহন চলাচল করছে। জরাজীর্ণ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। তার পাশাপাশি চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। নোয়াখালী ও জনপদ বিভাগের বিরুদ্ধে সড়ক সংস্কার ও উন্নয়নকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম-লক্ষ্মীপুর প্রধান সড়কের বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা থেকে চন্দ্রগঞ্জ পূর্ব বাজার পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার একেবারে যান চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সর্বশেষ ২০০৪ সালে এটি সংস্কার করা হয়। দীর্ঘ সময় সংস্কার না করায় পুরো সড়কেই মধ্যে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয় এবং কার্পেটিং উঠে কাঁচা সড়কে পরিণত হয়েছে।
জেলার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র চৌমুহনী সড়কে ফেনী-নোয়াখালী, চট্টগ্রাম-নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর-ফেনী, চট্টগ্রাম-ভোলা, বরিশাল-চট্টগ্রামের, শত শত যানবাহন চলাচল করে। এতে চৌমুহনী বাজারের সৃষ্টি হয় বিশাল যানজটের। এ যানজট নিরসনে ২০০৮ সালে চৌমুহনী পূর্ব বাজার থেকে শুরু করে বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সড়ক ফোর লেনে উন্নত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। সে লক্ষ্যে ১৬ জুন ২০০৯ এবং ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১১ মেসার্স কেএএমএসি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। তার মধ্যে প্রথমে বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা থেকে করিমপুর সড়ক এবং পরে করিমপুর সড়ক থেকে চৌমুহনী পূর্ব বাজার (ফেনী সড়ক পর্যন্ত) ১৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে উন্নয়নের কাজ দেয়া হয়। ডিসেম্বর ২০১১ সড়কটির কাজ সমাপ্ত করার কথা। কিন্তু ঠিকাদার সময় বাড়িয়ে নেন ২০১২ সাল পর্যন্ত। কিন্তু ঠিকাদার ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে নি¤œমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণ করে এবং বেশির ভাগ টাকা লুটপাটের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। ফলে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে সড়কটি বুঝিয়ে দেয়ার আগেই বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা থেকে করিমপুর রোড পর্যন্ত নির্মিত সড়কের অনেক স্পটে গর্তের সৃষ্টি হয় এবং নির্মিত সড়ক উঁচুনিচু হয়ে যায়। সড়ক ও জনপথ বিভাগকে কাজ বুঝিয়ে দেয়ার আগে সড়কের বেহাল দশা হওয়ার বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নামমাত্র চিঠি দেয় সড়ক ও জনপথ বিভাগ। অনিয়মের ব্যাপারে ঠিকারদার প্রতিষ্ঠানকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ চিঠি দেয়ার পরও তারা সড়কটি পুনর্নির্মাণ করে দেয়নি। পরে গর্ত হয়ে যাওয়া সড়কে নি¤œমানের ইট বসিয়ে রোলার দিয়ে সমান করে বিটুমিন দেয়। কিন্তু অল্প ক’দিনের মধ্যেই ইটগুলো উঠে গিয়ে খানাখন্দের সৃষ্টি হয় এবং সড়ক নিচের দিকে দেবে গিয়ে উঁচু-নিচু হয়ে যায়। গত পাঁচ বছর প্রতিদিন শত শত যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে এ সড়ক দিয়ে। নোয়াখালী-কুমিল্লা সড়কের বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা থেকে চাষির হাট পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার সড়কে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়। সড়কটির সংস্কার হয় সর্বশেষ ২০১১ সালে।
এ ছাড়া জেলা শহর মাইজদী সার্কিট হাউজ-দত্তের হাট সড়কের চার কিলোমিটার এবং দত্তবাড়ী-ওদার হাট পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার, নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল সড়ক, মাইজদী বাজার-জেলখানা সড়ক, মাইজদী বাজার-নোয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় সড়কসহ প্রায় প্রতিটি সড়কের বর্তমানে বেহাল অবস্থা। হাতিয়া উপজেলার তমরুদ্দি থেকে ২০ কিলোমিটার, উসখালী থেকে কাজিরহাট আট কিমি. সড়ক জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। অপর দিকে নলছিরা থেকে জাহাজমারা পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার সড়কে বেশ কিছু স্পটে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
সেনবাগ উপজেলার চন্দেরহাট-সেনবাগ-সোনাইমুড়ী ৩০ কিলোমিটার, ফেনী-সোনাইমুড়ী সড়কের ৩৫ কিলোমিটার, কানকিরহাট-নাঙ্গলকোট আট কিলোমিটার ও নবীপুর-ছমির মুন্সীর হাট-লেমুয়া ২০ কিলোমিটারÑ এ সড়কগুলোতে সৃষ্ট গর্তে কয়েক দিন পরপর সড়ক ও জনপথ বিভাগের লোকজন নি¤œমানের ইট দিয়ে তার ওপর বিটুমিন ফেলে রোলার দিয়ে সমান করে দেয়। কিন্তু কয়েক দিন যান চলাচল করতে না করতেই ফের গর্তের সৃষ্টি হয়।
জানা গেছে, সড়ক সংস্কার ও মেরামতের নামে কিছু দিন পরপর নামমাত্র মেরামত কিংবা সংস্কার করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
সড়কগুলোর বেহাল অবস্থার ব্যাপারে নোয়াখালী আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও বেগমগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আ: রহিম বলেন, বেগমগঞ্জ লক্ষ্মীপুর সড়কের চন্দ্রগঞ্জ পর্যন্ত এবং বেগমগঞ্জ উপজেলার সামনে চৌরাস্তা চৌমুহনী ও সোনাইমুড়ী লাকসাম সড়কসহ অনেক সড়ক যান চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, এসব সড়ক দিয়ে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে যান চলাচল করছে। জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার না করলে অচিরে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সোনাইমুড়ী পৌরমেয়র মোতাহার হোসেন মানিক বলেন, সোনাইমুড়ী থেকে লালমাই সড়কসহ বেশ কিছু মহাসড়ক এবং বেশ কিছু শাখা সড়ক দীর্ঘ দিন সংস্কার না করায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কার্যত চরম আকার ধারণ করেছে। তিনি বলেন, জরুরি ভিক্তিতে এসব সড়ক সংস্কারের প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বিনয় কুমার পাল বলেন, বেগমগঞ্জ-চন্দ্রগঞ্জ সড়ক ও চৌমুহনী চৌরাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর সংস্কারের কাজ চলছে। এ ছাড়া কুমিল্লা পদুয়া-নোয়াখালী সড়কের ফোর লেনের কাজ ছয় মাসের মধ্যে শুরু হতে পারে।
কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের ৫৯ কিলোমিটারের বেশির ভাগই এখন ভাঙা। কুমিল্লার টমসম ব্রিজ থেকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ পর্যন্ত আছে শত শত গর্ত। ভাঙা ও গর্তের এই সড়ক অনেকটাই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কুমিল্লা পদুয়ার বাজারের পর থেকে ভাঙা শুরু। সেখানে গাড়িগুলোও চলে অনেকটা হেলেদুলে। গাড়িগুলো চলাচলের সময় দেখলে মনে হয় যেন নাচানাচি করছে। ভাঙা সড়কে গাড়ি চালাতে গিয়ে সময় নষ্ট, যানজট আর গাড়ি বিকল হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা। এসব সমস্যায় দুর্ভোগের অন্ত নেই ওই সড়কে চলাচল করা লাখো যাত্রীর।
গত এক বছরের বেশি সময় ধরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কে এই বেহাল অবস্থা বিরাজ করলেও স্থায়ী সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। এই আঞ্চলিক মহাসড়কটি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক। এ সড়ক দিয়ে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুরসহ দক্ষিণ আঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করে থাকেন।
সরেজমিনে ওই আঞ্চলিক মহাসড়কে গিয়ে দেখা গেছে পিচ ঢালাই উঠে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্তের। বেশির ভাগ রাস্তাই ভাঙা। গাড়িগুলো চলাচলের সময় দেখলে মনে হয় যেন নাচানাচি করছে। কুমিল্লা পদুয়ার বাজারের পর থেকে ভাঙা শুরু। সেখানে কিছু ইট-সুড়কি দিয়ে সংস্কার করা হচ্ছে। সেখানে গাড়িগুলোও চলে অনেকটা হেলেদুলে।
বেশি ভয়াবহ অবস্থা লালমাই উপজেলার বাগমারা বাজার ও লাকসাম জংশনের উত্তর দিকের অংশে। সেখানে গর্তের গভীরতা বেশি হওয়ায় গাড়ির চাকা আটকে যায়। ভাঙার কারণে বাগমারা বাজারে প্রতিনিয়ত যানজট লেগেই থাকে। বিশেষ করে লালমাই, হরিশ্চর বাজার, আলীশ্বর বাজার, লাকসাম জংশন, লাকসাম বাইপাস, মনোহরগঞ্জের খিলা বাজার, নাথেরপেটুয়া বাজার, বিপুলাসার বাজার, নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি, চৌমুহনী, বেগমগঞ্জ থানা এলাকাসহ মাইজদীর বিভিন্ন অংশে ভাঙা এবং শত শত গর্ত রয়েছে।
সড়কে চলাচলকারী যাত্রী ও পরিবহন চালকেরা জানান, কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কে কত শত গর্ত রয়েছে তা বলে শেষ করা যাবে না। দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কটিতে কোনো ধরনের সংস্কারকাজ না হওয়ায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকি বাড়ছেই।
সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী মনোহরগঞ্জের লক্ষণপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল বাতেন মজুমদার জানান, গত কয়েক মাস ধরে এই সড়কে স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বাসে চলাচলের পর শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব হয়।
কয়েকজন কলেজশিক্ষার্থী বলেন, রাস্তার অবস্থা নাজুক হওয়ায় নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছা যাচ্ছে না। এই সড়কে বাস মালিকগণ ভালো মানের বাস দিচ্ছে না। দিচ্ছে ভাঙ্গাচোরা বাস। এসব পরিবহনে চলাচলে আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে।
কুমিল্লা থেকে নোয়াখালীর মাইজদীগামী উপকূল বাস সার্ভিসের চালক জসিম জানান, সড়কটি ভাঙা হওয়ায় ঘন ঘন গাড়ি বিকল হচ্ছে। গত এক বছর ধরে এমন বেহাল অবস্থা চললেও এটি সংস্কারে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেই। বর্তমানে এ সড়ক দিয়ে গাড়ি চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি।
নোয়াখালী থেকে ঢাকাগামী কয়েকটি বাসের অন্তত পাঁচজন চালক জানান, ওই সড়কের যেসব অংশ বেশি ভাঙা, সেসব অংশে এলে যাত্রীরা ঝাঁকুনির ভয়ে বাস থেকে নেমে যেতে চান। এ ছাড়া বড় বড় গর্তগুলোতে আটকে পড়ার কারণে অনেক সময় গাড়ি বিকল হয়ে যায়। তখন যাত্রীরা আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। দ্রুত এ সড়কটি মেরামত করা না হলে গাড়ি চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে জানান তারা।
কুমিল্লা জেলা পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি অধ্যক্ষ মো: কবির আহমেদ বলেন, গত কয়েক মাস ধরে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কটি অত্যন্ত বেহাল অবস্থায় রয়েছে। আমাদের গাড়িগুলো গর্তে পড়ে প্রতিনিয়ত বিকল হয়ে যাচ্ছে। এতে এক দিকে যানজট লাগছে, আবার অন্য দিকে যাত্রীরাও কষ্ট পাচ্ছেন। দ্রুত সড়কটি মেরামত করার দাবি জানান তিনি।
সড়ক ও জনপদ (সওজ) কুমিল্লা অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী অরুণ আলো চাকমা জানান, আমরা কিছু অংশ ইট দিয়ে সংস্কার করেছি। কুমিল্লা থেকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ পর্যন্ত ফোরলেনের কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং দরপত্র গ্রহণ করা হয়েছে। প্রক্রিয়াজনিত কারণে আরো কিছু দিন সময় লাগতে পারে। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। শিগগিরই আরো কিছু পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে তিনি জানান।