লক্ষ্মীপুরে বাতাস হলেই বিদ্যুৎ নাই!

নিজস্ব প্রতিবেদক :

গ্রাহক সেবার দৈন্যদশা, অব্যবস্থাপনা, অসম্পূর্ণ কারিগরি সক্ষমতা, লাইনম্যান সংকট ও প্রায় ৬ কোটি টাকা বকেয়া। এর মধ্য দিয়েই চলছে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে শতভাগ বিদ্যুতায়িত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

নানা মানুষের প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত শতভাগ বিদ্যুতায়িত অঞ্চলের গ্রাহকরা যেন প্রকৃত অর্থেই শতভাগ মানসম্মত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পায়। বিদ্যমান অবস্থার উন্নতি ছাড়া কোনোভাবেই ভোগান্তি মুক্ত বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয় বলে গ্রাহকরা মনে করছেন।

২০২০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টায় লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন সম্মেলনকক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ উপজেলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে শতভাগ বিদ্যুতায়িত হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দেওয়া তথ্যমতে, রায়পুর জোনাল অফিসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ উপজেলায় দশটি ইউনিয়ন ও প্রথম শ্রেণির পৌরসভাসহ মোট গ্রাহক ৯৫ হাজার ৮৫৬ জন। মোট এক হাজার ৩১৮ কিলোমিটারে আবাসিক ৭৯ হাজার ৯২২ এবং বাণিজ্যিক গ্রাহক সাত হাজার ৬৩৯ জন। কর্মকর্তা ও কর্মচারী ৯৫ জন। রায়পুর শহর, সোনাপুর ইউপির  রাখালিয়া, চরআবাবিল ইউপির হায়দরগঞ্জ ও চরবংশি ইউপির আখনবাজারে স্থাপিত চারটি অভিযোগ কেন্দ্রের মাধ্যমে গ্রাহকসেবা চলছে। ১২টি ফিডের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে সঞ্চালন লাইন। ৩০ জন লাইনম্যান প্রতিদিন গ্রাহকদের বিভিন্ন অভিযোগের সমাধান করতে মাঠে রয়েছে।

পল্লী বিদ্যুতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শতভাগ বিদ্যুৎ ও সংযুক্ত গ্রাহকদের মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবার কার্যক্রম নিয়ে চলছে কার্যক্রম। শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় এ উপজেলা হলেও নানান কারিগরি ত্রুটির জন্য সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না তাদের চাহিদা মাফিক বিদ্যুৎ।

রায়পুর পৌর এলাকায় ওজোপাডিকোর বিদ্যুৎ গ্রাহকদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকলেও গ্রামের পল্লী বিদ্যুৎ গ্রাহকদের দুর্ভোগের শেষ নেই।

এখানকার পল্লী বিদ্যুতের বাস্তবতা হলো মাঝে মধ্যে বিদ্যুৎ আসে। বিদ্যুৎ না থাকাটাই এখানে স্বাভাবিক ঘটনা এমনটিই অভিযোগ তাদের। বিদ্যুতের আশায় অপেক্ষা করতে গিয়ে অসুস্থ বৃদ্ধ-শিশু এবং ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখা লাটে ওঠার মতো অবস্থা। এখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রধান বাঁধা সুপারিগাছ। এ গাছটি এখন বিদ্যুৎকর্মীদের কাছে আতঙ্কের নাম। কখন, কোথায় সুপারিগাছ উপড়ে পড়ে লাইন বিচ্ছিন্ন হয়। এ নিয়েই তারা দিনভর ব্যস্ত থাকতে হয়। এ ছাড়া নারিকেল, কড়ইসহ অন্যান্য গাছের ডালা ও পাতা পড়ে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সিহাব হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে আমরা ঠিকমতো লেখাপড়া করতে পারি না।

অসুস্থ বৃদ্ধ সেতারা বেগম বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে মনে হয় আজাব শুরু হয়েছে ঘরে। আমরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাই।

চরমোহনা ইউনিয়নের বাঁশতলা গ্রামের গ্রাহক শহিদ হোসেন বলেন, কিছু দিন আগে কয়েকটি স্থানে গাছ পড়লে আমাদের গ্রামে দুদিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ লাইন সচল হয়নি। তাই আমরা চাই— হয় লাইনের পাশ থেকে নিয়ম অনুযায়ী গাছকাটা হোক, নয়তো গাছের কাছ থেকে সঞ্চালন লাইন ধীরে ধীরে সরিয়ে ফেলা হোক। আমরা স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সেবা পেতে চাই।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, রায়পুর ১৯ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমিতে সুপারি বাগান রয়েছে। বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বেচা কেনা হয়। এমন কোনো বাড়ি পাওয়া যাবে না যেখানে ছোট-বড় সুপারি বাগান নেই।

অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুতের লাইনের দুই পাশে ১০ ফুট করে মোট ২০ ফুটের মধ্যে কোনো গাছ থাকতে পারবে না। কিন্তু অধিকাংশ সঞ্চালন লাইনের তার ব্যক্তি মালিকানা জমির ওপর দিয়ে যাওয়ায় কখনই এ নিয়ম প্রতিপালন করতে পারেনি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। তারা শুধু তার সংলগ্ন গাছ কেটেই লাইন চালু রাখছে। এ কারণে বাগানের লম্বা সুপারি গাছ একটু বাতাসেই বা বয়সের ভারে ২৫-৩০ হাত দূর থেকেই যখন-তখন হেলে পড়ছে লাইনের ওপর। এ কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিড লাইন বন্ধ রেখে মেরামতকাজ চালাতে হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগকে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুতের দুজন লাইনম্যান বলেন, বাতাস বাড়তে দেখলেই আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। এখন গড়ে প্রতিদিন ১০-১৫টি অভিযোগ সমাধান করলেও তখন তা বেড়ে ৭০-৯০টির মতো দাঁড়ায়। কখনো কখনো দিন-রাত কাজ করে লাইন চালু করতে হয়। জোনাল অফিসে আরো ১০-১৫ জন লাইনম্যান পদায়ন করলে এ দূর্ভোগ কিছুটা হলেও কমে যেতে।

লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির রায়পুর জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) আলী হাসান মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, তিনটি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে এ আমাদেরকে এক হাজার ৩১৮ কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন পরিচালনা করতে হয়। প্রতিদিন এখানে ২৪ মেঘাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ওই পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। এর পরও জাতীয় চাহিদা সমন্বয় করতে গিয়ে মাঝে মধ্যেই আমাদের ২-৪ মেঘাওয়াট বিদ্যুৎ কম দেওয়ায় লোডশেডিং করতে হয়। এখানে গ্রাহকের কাছে মোট প্রায় ৬ কোটি টাকা বিল বকেয়া রয়েছে। তার পরও আমরা বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কাজ করে যাচ্ছি।

ডিজিএম আরও বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রধান বাঁধা গাছ। বিশেষ করে সুপারিগাছের কারণে আমাদের ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। প্রায়ই লাইনের ওপর সুপারিগাছ পড়ে তার ছিঁড়ে যাচ্ছে। বাতাস বাড়লে এ ভোগান্তির সীমা থাকে না। কেউ কেউ না জানিয়ে গাছ কাটতে গিয়ে লাইন ছিঁড়ে ফেলে রাখছেন। এখানে গাছ পড়ে এত বেশি পরিমাণ তার ছিঁড়ে যায় যে-তা মেরামত করতে গিয়ে চরম হিমসিম খেতে হচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email