আমাদের পথচলা থামবে না

মু. আবিদুর রহমান : মহান আল্লাহ তা‘য়ালা মানুষকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এই পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। দুনিয়ায় মানুষের জীবন যাপনের জন্য আল্লাহ তা‘য়ালা যে পথ ও পন্থা নবী রাসূলদের মাধ্যমে নির্ধারন করে দিয়েছেন সেই পথ ও পন্থা অনুসরণ ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মানুষ আপ্রান চেষ্টা করবে।

মানুষের জীবনে ও আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আল্লাহর নির্দেশে নবী রাসূলদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়েছে। সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পর্যন্ত সব নবীর আন্দোলনের সূচনা হয়েছে দাওয়াতের মাধ্যমে। সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরামের দাওয়াতের মূল সূর, মূল আবেদন এক ও অভিন্ন। আম্বিয়ায়ে কেরামের এই দাওয়াতের মেজাজ প্রকৃতি গভীর ভাবে অনুধাবন ও অনুশীলনের চেষ্টা করলে যে কেউ বুঝতে সক্ষম হবে।

এই দাওয়াত ছিল যার যার সময়ে সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের একটা আপোষহীন বিপ্লবী ঘোষনা। এই জন্যেই প্রতিষ্ঠিত সমাজ ব্যবস্থার পৃষ্ট পোষক, ধারক বাহক ও সুবিধাভোগীদের সাথে তাদের সংঘাত ছিল অনিবার্য। ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার আহবান নিয়ে কেউ ময়দানে নামলেই তারা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তাকে প্রতিহত করতে রুখে দাঁড়ায়।

যুগে যুগে যারাই মানুষকে আল্লাহর দাসত্ব গ্রহনের দিকে আহবান করেছেন সেই সময়ে তাদের উপর শুরু হলো জুলুম-নির্যাতন, নিষ্পেষন আর নিপীড়নের এক নির্মম ইতিহাস। এই নির্যাতন ভোগ করেন আন্দোলনের শীর্ষনেতা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)। দাওয়াতের শুরু থেকেই নির্মম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে মক্কার জীবন অতিবাহিত হল। মক্কার জনপদে দাওয়াত প্রত্যাখান ও নির্যাতন নবীজি (সাঃ) কে হতাশ করেছিল। তাই একটি গোলাম কে সাথে নিয়ে পায়ে হেঁটে হেঁটে ষাট মাইল দূরে নবীজি (সাঃ) দাওয়াতের মিশন বুক ভরা আশা নিয়ে গেলেন তায়েফের জনপদে। তায়েফবাসীদের আচরন ও নির্মমতা ছিল হৃদয় বিদারক। নবীজি (সাঃ) সেখানে কয়েক দিন অবস্থান করে সকলের দুয়ারে দুয়ারে দাওয়াত পৌছে দিলেও তারা দাওয়াত কবুল না করে তাকে বের করে দেওয়ার জন্যে একদল উশৃঙ্খল যুবক লেলিয়ে দিল । তারা নবীজি (সাঃ) এর উপর পাথর বর্ষন করতে লাগল। পাথরের আঘাতে নবীজি (সাঃ) ক্ষত বিক্ষত হয়ে পড়লেন। তার পবিত্র রক্ত জামা রঞ্জিত করে শরীর সিক্ত হয়ে উঠে। গোটা নবুয়তের জীবনে রাসূল (সাঃ) সবচেয়ে বেশী নির্যাতিত হয়েছেন তায়েফের মাঠে। হযরত আয়েশা (রাঃ) জিজ্ঞাস করেছিলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নবুয়তের ময়দানে সবচেয়ে কঠিন দিন কোনটি? নবীজি (সাঃ) বলেন, তায়েফের ময়দান।

মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করার কাজটাই সর্বোত্তম কাজ। আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, আর সে ব্যক্তির কথার চেয়ে উত্তম কথা আর কারও হতে পারে কি যে, আল্লাহর দিকে আহবান জানায় এবং ঘোষনা করে যে, আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত – সূরা হা-মীম আস সাজদাহ :৩৩। দাওয়াতী কাজ বাদ দিয়ে অন্যান্য যাবতীয় নেক কাজ করলেও নবীরই রিসালাতের দায়িত্ব পালন হয় না বলে ঘোষনা করেছেন। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কাজই হচ্ছে দ্বীনের দাওয়াত সঠিক ভাবে মানুষের নিকট পেশ করা। মানুষ আল্লাহর গোলাম এই পরিচয় লাভ করার পর একজন গোলাম চুপ করে বসে থাকতে পারে না। বস্তুত: চুপ করে বসে থাকার অনুমতি আল্লাহ তা‘য়ালা তাকে দেন নি। তাকে পৌছতে হবে অন্যান্য মানুষের কাছে। তাদেরকে আল্লাহর দাসত্ব গ্রহনের আহবান জানাতে হবে।

দাওয়াতের নির্দেশনা দিয়ে আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, ডাক! তোমার রবের পথের দিকে- সূরা আন নাহল : ১২৫। হে মানব জাতি! তোমরা ঘোষনা কর আল্লাহ ছাড়া সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী আর কেউ নেই, তাহলে তোমরা সফল হবে – আল হাদিস। আল্লাহ তা‘য়ালা দাওয়াত দান কারীদের সফলকাম তথা জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাসূল (সাঃ) বিদায় হজ্জের ভাষনে বলেন, হে উপস্থিত জনমন্ডলী,তোমরা আমার অনুপস্থিত উম্মতের নিকট আমার পয়গাম পৌছে দেবে, হতে পারে উপস্থিতদের কাছ হতে দাওয়াত গ্রহনকারী কিছু মানুষ আমলে দায়ীদের চেয়ে বেশী অগ্রসর হবে। রাসূল (সাঃ) এর নির্দেশনাকে লালন করে সাহাবায়ে কেরাম দাওয়াতে হকের এ দায়িত্ব ইসলামকে আজ পৃথিবীর প্রতিটি মানব জনপদে পৌছে দিয়েছে। কেয়ামত পর্যন্ত ইসলাম জীবিত থাকবে পরস্পরের নিকট ইসলামী দাওয়াতকে পৌছে দেয়ার এ দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে।

দাওয়াতে এই পথ মোটেই ফুল বিছানো নয়। আল্লাহ তা‘য়ালা ঈমানদারদের উপর কঠিন দায়িত্ব অর্পন করেছেন। এই কঠিন দায়িত্ব পালনে সফলতা অর্জন করতে পারলে আল্লাহ তাদের জন্য নির্ধারিত রেখেছেন সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামাত জান্নাত। ঈমানদারদেরকে জান্নাতের মতো মূল্যবান স্থানে উন্নীত করার আগে আল্লাহ তাদের উপযুক্ততা প্রমানের জন্য পরিক্ষার সম্মুখীন করবেন এটাই স্বাভাবিক। এই উপযুক্ততা প্রমানের ক্ষেত্র হচ্ছে আল্লাহর পথে মানুষকে আহবান করা। মহান আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন, তোমরা কি ভেবেছো যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ আল্লাহ এই বিষয়ে এখনো দেখেন নি যে, তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদে আত্মনিয়োগ করে এবং সবর অবলম্বন করে – সূরা আল ইমরান : ১৪২। আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বপ্নবাদ দিয়ে পরিপূর্ণ আত্মত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে কেবলমাত্র আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর মধ্যেই জান্নাত।

প্রকৃত ঈমানদারগন শাহাদাতের অমূত পান করার জন্য ছিলেন পিপাসার্ত। যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের উপর নির্যাতন, কারাগার, শারীরিক ও মানসিক অবর্ননীয় অত্যাচার। অন্যায়ের প্রতিবাদের যুদ্ধে হক্বের জন্য যাদের রক্ত প্রবাহিত হলো জমিনে, প্রতিবাদ করতে করতে যারা নির্বাক হয়ে গেল জনমের তরে। যাদেরকে আঘাতের পর আঘাত করে ক্ষত বিক্ষত করা হলো। পান করলো শাহাদাতের পেয়ালা। কুরআন তাদেরকে বলে তারা জীবিত, আল্লাহর পথে যারা জীবন দিয়েছে তাদেরকে তোমরা মূত বলো না প্রকৃত পক্ষে তারাই জীবিত। তাদের জীবন সম্পর্কে তোমাদের চেতনাই নাই – সূরা বাকারা : ১৫৪। শহীদগন মরেনি, তারা জীবন্ত, তারা চিরঞ্জীব, তারা আমাদের প্রেরনা, আমাদের রাহবার, আমাদের মশাল, আমাদেরকে নির্ভয়ে নিশ্চিন্তে তাদের পদাংক অনুসরণ করে শাহাদাতের মন্জিলে এগুতে হবে জোর কদমে। শহীদদের রক্তাক্ত, প্রাণহীন পড়ে থাকা দেহটি যেন জালেমদের অগ্রযাত্রার পথে বাধাঁর হিমালয়, যা থামিয়ে দেয় জালেমদের সামনে চলার মিছিল।

দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দেলনের জন্য ত্যাগ-কুরবানী আমাদের চলার পথে আশার সঞ্চার করে। বুকে হিম্মত নিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে মঞ্জিলে পৌছতে সাহায্য করে।আল্লাহর গোলামদের উপর ইসলামবিরোধী শক্তির নির্যাতন এমন ছিলো হযরত খাব্বার (রাঃ) ইসলামের দাওয়াত কবুল করার সাথে সাথে কুরাইশরা তাকে জ্বলন্ত আগুনের কয়লা বিছিয়ে চিত করে শুইয়ে দিত। হযরত বেল্লাল (রাঃ) কে আরবের মরুভূমির উত্তপ্ত বালুর উপর শুইয়ে দিয়ে বুকের উপর ভারী পাথর চাপা দিত। মক্কায় আম্মার ইয়াসারের কোনো স্বগোত্রীয় লোক না থাকায় তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হতো। ইসলাম গ্রহন করার অপরাধে তাকে উত্তপ্ত বালুর উপর শুইয়ে দিত, পানিতে চুবানো হতো, জ্বলন্ত কয়লার উপরও শোয়ানো হতো। আম্মারের মা সুমাইয়া (রাঃ) কে শুধু মুসলমান হওয়ার কারনে আবু জাহেল তাকে বর্শা মেরে হত্যা করে। হযরত ফুকইহা সুহালী (রাঃ) এর বুকের উপর এতো ভারী পাথর চাপা দেওয়া হতো তার জিহ্বা বেরিয়ে যেতো। আবার কখনো তাকে লোহার ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে তীব্র অগ্নিসম গরম বালুর উপুড় করে শুইয়ে দেওয়া হতো।এই ভাবে যুগে যুগে ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করার অপরাধে কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়।

আমরা পৃথিবীর চলমান দৃশ্যপট বদলে দিতে চাই। আমরা জুলুমের দীর্ঘরাতের বুক চিরে আনতে চাই ইনসাফের সুবহে সাদেক। আমরা মানুষের মনগড়া আইনের উপর প্রতিষ্ঠিত করতে চাই আল্লাহ তা‘য়ালার অবতীর্ণ আখেরী বিধান। আমরা ক্ষুধা-দারিদ্র্য, জুলুম অবিচার, খুন-রক্ত ও নেশামুক্ত পৃথিবী সৃষ্টিতে অবদান রাখতে চাই। একটি সুন্দর পৃথিবীর জন্য একটি দীর্ঘ ও কন্টকময় পথ অতিক্রম করতে হবে। পৃথিবীর এই জমিনে সুদিন ফিরিয়ে আনতে আমাদের পথচলা থামবে না। ইনশাআল্লাহ

Print Friendly, PDF & Email