কলকাতা পৌর নির্বাচন : শেষ সময়ের হিসেব-নিকেশ

ঢাকা : ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে গণতান্ত্রিক সায়ত্ত্বশাসিত সংস্থা হিসেবে কলকাতা শহরের ২০৬.৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকার পৌর পরিষেবা প্রদানের জন্য ১৯২২ সালে কলকাতা পৌরসংস্থা (কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন) প্রতিষ্ঠিত হয়। সরকারি বিধিবদ্ধ এই পৌরসংস্থাটি পরিচালিত হয়ে থাকে ১৯৮০ সালের সংশোধিত পৌর আইনের ভিত্তিতে। এ আইন অনুসারে কলকাতা পৌর-প্রশাসন দ্বারা কলকাতা পৌরসংস্থা, মেয়র-ইন-কাউন্সিল ও মেয়র বা মহানাগরিক- এই তিনটি অংশ পরিচালিত হয়। পৌরসভার নাগরিকদের ভোটে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত ১৪৪ জন পারিষদ বা কাউন্সিলরগণই এই পৌরসংস্থা বা কর্পোরেশনের সদস্য। এর সভা পরিচালনার জন্য কাউন্সিলরগণের মধ্যে থেকে একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করা হয়; যার ভূমিকা আইনসভার স্পিকারের মতোই। অপরদিকে মেয়র, ডেপুটি মেয়র এবং নির্বাচিত অনধিক ১০ জন কাউন্সিলর নিয়ে গঠিত মেয়র-পারিষদ বা মেয়র-ইন-কাউন্সিলের কাজ অনেকটা কেন্দ্রীয় বা রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্যদের মতোই। নির্বাচিত সদস্যরা পৌরসংস্থার প্রথম অধিবেশনে তাদের মধ্যে থেকে একজনকে পাঁচ বছরের জন্য মহানাগরিক বা মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করেন; যার কাজ উপ-মহানাগরিক বা ডেপুটি মেয়র নির্বাচন, মেয়র-পারিষদের দপ্তর ও ক্ষমতা বণ্টনসহ পৌর প্রশাসনের যাবতীয় কাজ পরিচালনা করা।

বিধানসভা নির্বাচনের পরে কলকাতা পৌরসভার নির্বাচনকেই পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। আগামী ১৯ ডিসেম্বর (রোববার) অনুষ্ঠিতব্য কলকাতা পৌরসভা নির্বাচনের পরে এর ফলাফল ২০২২ সালের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শহর ও জেলা পর্যায়ের পৌরসভার আসন্ন নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে। গত পাঁচটি পৌর নির্বাচনের মধ্যে তিনটিতে বাজিমাত করায় এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রেখে ধারণা করাই যায় যে, এ নির্বাচনেও সিংহভাগ ওয়ার্ডেই ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের জয়জয়কার থাকবে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল সবচেয়ে ভালো ফল করেছিল ২০১৫ সালে কলকাতার পৌর নির্বাচনে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার ক্ষমতায় আসেন। নির্বাচনী ফলাফলে তৃণমূলের আধিপত্য অনেকটা নিশ্চিত জেনেও মূলত কয়েকটি কারণেই এবারের এই নির্বাচনের দিকে বিশ্লেষকদের চোখ।

২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে অনুষ্ঠিত ২০১৫ সালের পৌরসভা নির্বাচন সব দলের কাছে ছিল এসিড টেস্ট; যদিও ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদী ঝড়ের মধ্যেও এ রাজ্য ঘাসফুলের দখলেই ছিল। বিগত নির্বাচনে তৃণমূল ১৪৪টি ওয়ার্ডের ১১৪টিতে জয়ী হয়েছিল। বামফ্রন্টের দখলে গিয়েছিল ১৫টি, বিজেপির দখলে ৭টি, কংগ্রেসের দখলে ৫টি এবং অন্যান্য ৩টি। তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছিল প্রায় ৫১% এবং বিজেপি পেয়েছিল ১৫% ভোট। তৎকালীন বিধানসভায় রাজ্য বিজেপির কোনো আসন ছিল না এবং ভোটের হার ছিল মাত্র ৪%। বর্তমান বিধানসভায় বিজেপি ৭০টি আসন এবং ৩৮% ভোটপুষ্ট একটি দল। তবে এবারের নির্বাচনে সর্বোচ্চ ওয়ার্ড ও ভোট প্রাপ্তির হারে বিজেপি না কংগ্রেস এগিয়ে থাকবে- সেটি দেখার বিষয়।

এদিকে ২০১৫ সালে পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে সিপিআইএম বা কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সিস্ট)-সহ বামফ্রন্ট ২৪.৫% ভোট পেয়েছিল। রাজ্য বিধানসভা ও কলকাতা পৌরসভার সে সময়কার প্রধান বিরোধী এই বামপন্থীদের এখন বিধানসভায় আসন সংখ্যা শুন্য এবং ভোটের হারও মাত্র ৫.৬%। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি ‘বাম-কংগ্রেস জোট অতীত’ বললেও বামফ্রন্টের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়- কলকাতার সবকটি ওয়ার্ডে তারা প্রার্থীই দিতে পারেনি। একই অবস্থা কংগ্রেসের। তারাও ১৯টি ওয়ার্ডে প্রার্থী না দিয়ে তালিকা প্রকাশ করেছে। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস উভয়েই বেশ কিছু ওয়ার্ডে গত পৌর নির্বাচনে তাদের জয়ী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রার্থী না দিয়ে ইতোমধ্যেই অদৃশ্য জোটের বার্তা দিয়েছে। এমন ৩৩টি ওয়ার্ড আছে যেখানে উভয় পক্ষের অদৃশ্য জোট রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যেখানে বাম কিংবা কংগ্রেসের প্রার্থী নেই, সেখানে তৃণমূল ও বিজেপির বিরুদ্ধে অন্য কোনো পক্ষের উল্লেখযোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন করার বিষয়ে একই সুরে কথা বলেছেন বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের নেতারা। দুটো পক্ষই কলকাতা পৌরসভার দুর্বল আসনগুলোর পরিবর্তে বাছাইকৃত ওর্য়াডগুলোতে প্রার্থী দিয়ে দলের পক্ষ থেকে সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করতে চাইছে; পাশাপাশি চাইছে সামগ্রিক আসনের বিচারে প্রাপ্ত ভোটের হার বৃদ্ধি করতে।

২০২১ সালের কলকাতা পৌরসভা নির্বাচনেকে কত শতাংশ ভোট পেয়ে এবং কত ওয়ার্ডে জয়লাভ করে এ রাজ্যে ঘাসফুলের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে সেটিই মূলত এখন সবাই দেখার অপেক্ষায়।

Print Friendly, PDF & Email