স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী: বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশর উল্লম্ফন

আলাউদ্দিন মল্লিক :

বাংলাদেশ এ বৎসর তার স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করছে।  স্বাধীনতার সংগ্রাম ও সশস্র যুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল – আওয়ামী লীগ এবং নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে অভাবনীয় উন্নযন তার উপর ভর করে দেশটির এই উৎযাপন নতুন করে দেশটিকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করাবে।

এই ৫০ বৎসরে দেশটি অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের জন্য ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থান যেভাবে পরিচিতি পেয়েছে, এর ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য তেমনটা আলোচিত নয়। এই পরিবর্তন দক্ষিন এশিয়ার অর্থনৈতিক ভারকেন্দ্র পূর্ব দিকে স্থানান্তর করেছে।  এটি বিশ্বের সাথে দেশটির সকল ধরণের বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটাবে –  এই অঞ্চলে এবং এর বাইরেও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করার সুযোগ করে  দেবে।  ঢাকাকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও সামুদ্রিক সম্ভাবনার নতুন নতুন দুয়ার উম্মোচন  করবে।

স্বাধিনতার পরের কয়েক দশক ধরে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র, দুর্ভিক্ষ-পীড়িত, বঞ্চনা এবং রোগের সমার্থক হিসেবে পরিচিত পাওয়া বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে অর্থনীতিতে টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করে বিশ্বের কাছে একটি রোলমডেল।  আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলি দারিদ্র্য হ্রাস, আয়ু বৃদ্ধি, সাক্ষরতার হার বৃদ্ধিতে এবং নারীর ক্ষমতায়নে  ঢাকার সাফল্যের প্রশংসা করেছে। । দেশটি ২০২৬ সালের মধ্যে মধ্য-উন্নত দেশের ক্যাটাগরিতে উন্নীত  হতে যাচ্ছে  এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ২৫ তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে।

এই  অর্থনৈতিক রূপান্তরকে  ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যের সাথে কেউ সম্পর্কিত করে দেখেননি । প্রচলিত ধারণায়, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে ভারত ও পাকিস্তান কেন্দ্রিক । দেশদুটির স্থাপনা, মিডিয়া ভাষ্য,  থিঙ্ক-ট্যাঙ্কদের বিশ্লেষণ, শিল্প, সংস্কৃতি, সিনেমা, গান,  কাশ্মীর ইস্যু , পারমাণবিক অস্ত্র, সন্ত্রাসবাদ এবং আফগানিস্তান নিয়ে নয়াদিল্লি এবং ইসলামাবাদের মধ্যে বাদানুবাদ ইত্যাদি ছিল এই  ভূ-রাজনীতির মূল উপজীব্য। কিন্তু সময়ের সাথে অন্যান্য দেশগুলির গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত মহাসাগরের  শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপ –  ভারত, চীন, জাপান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ প্রধান সামুদ্রিক শক্তিগুলির কাছে অত্যন্ত আগ্রহের বিষযয়ে পরিণত হয়েছে। হিমালয়ে অবস্থিত নেপাল এবং ভুটান – চীন ও ভারতের মধ্যে একটি দীর্ঘ কর্ডন হিসাবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য যতটা তার আয়তনের জন্য, তার চেয়ে বেশি বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম জনসংখ্যা আর অবস্থানের জন্য। এর জনসংখ্যা প্রায় ১৭০ মিলিয়ন যার প্রায় ১৫% প্রবাসী,  বর্তমানে প্রায় ১২০ মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। উপসাগরীয় আরব দেশ সমূহে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি, ইংরেজি-ভাষী বিশ্বেও প্রবাসীরা দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশের উত্তরে নেপাল ও ভুটান, উত্তর-পূর্বে চীন এবং দক্ষিণ-পূর্বে বার্মার ভৌগলিক নৈকট্য এটিকে তাদের সবার কাছে আকর্ষণীয় অংশীদার করে তোলে।  সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ উপমহাদেশে ভারতের কৌশলগত, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যমে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অঞ্চলের বাইরেও, ঢাকা আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষার জন্য বাহিনীর একটি বড় অংশীদার।

বাংলাদেশ একটি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে – প্রধানত তার টেক্সটাইল শিল্প, যা ২০১৯ সালে ৩০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করে। চীনের পরে দেশটি তৈরি পোশাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রস্তুতকারক এবং ১৫০ টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলাম ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। দেশের ধর্মীয় মধ্যপন্থা অবলম্বন আর হাই প্রোফাইল সন্ত্রাসী হামলার পর দেশীয় ইসলামি আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে সাফল্য- পশ্চিমা বিশ্বের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মিত্রে পরিণত করেছে।

অর্থনৈতিক সাফল্যই বাংলাদেশকে দক্ষিন এশিয়ায়  বিশেষ অবস্থানে  নিয়ে এসেছে। বিগত বৎসরগুলিতে পাকিস্তান ও ভারতের তুলনায়  বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অভাবনীয় – ২০১৯ সালে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে।  বাংলাদেশ কোভিড-১৯ মহামারীর মাধ্যমে তার বৃদ্ধির গতি বজায় রাখছে এবং পাকিস্তান তার অর্থনৈতিক স্থিরতা হবজায় রাখতে লড়াই করছে।

শশী থারুর -ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ভারতীয় কেন্দ্রীয় সাংসদ – তিরুবনন্তপুরম), ২৩টি বইয়ের লেখক ও চেয়ারম্যান (AIPC), প্রাক্তন প্রতিমন্ত্রী, ভারত সরকার, সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল, জাতিসংঘ। ২০২১ সালের ২রা জুন সকাল ১১:৫২ টায় টুইটার ওয়েব অ্যাপে টুইট করেছেন: “গত বছরের তুলনায় বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৯% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মার্কিন ডলারে  ২২২৭, ভারতের ১৯৪৭, আর পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ১৫৪৩। ১৯৭১ সালে, পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে ৭০% ধনী ছিল; আজ বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে ৪৫% বেশি ধনী।” আমরা বিশ্ব ব্যাঙ্ক, আই.এম.এফ. ও অন্যান্য আর্ন্তজাতিক সংস্থার তথ্যেও এর প্রতিফলন দেখি।

যেহেতু বাংলাদেশ পাকিস্তানের চেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পাচ্ছে, শিক্ষার মান বাড়াচ্ছে এবং তার একসময়ের দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করছে- যা  এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভার-কেন্দ্রকে পূর্ব দিকে  ঝুঁকতে বাধ্য করেছে। ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত করতে পাকিস্তানের অনিচ্ছার কারণে সার্ক অকার্যকর রয়েছে। ফলে ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান এবং নেপালের মধ্যে উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের সাথে আন্তঃআঞ্চলিক সহযোগিতার দিকে মনোনিবেশ করতে সাহায্য করেছে।  উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য দেশভাগের পরের বছরগুলিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরনো রেল, রাস্তা এবং জলের সংযোগগুলি এখন পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে।
পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ তাদের ভৌগলিক অবস্থান আর  জন-সম্পদকে ভিন্ন ভাবে ব্যবহার করছে। পাকিস্তানের থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ভূ-রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এর অনন্য অবস্থান কল্পনা করার প্রবণতা রেখেছে; বিপরীতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য তার ভূগোলকে কাজে লাগানোর দিকে মনোনিবেশ করেছে। পাকিস্তান সচেতনভাবে ভারতের দেওয়া বিশাল বাজারের সাথে অর্থনৈতিক অসহযোগিতা বেছে নিয়েছে। পাকিস্তান  নিজের ক্ষতির করেও,ভারতের সাথে বাণিজ্যিক সংযোগের জন্য কাশ্মীর সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরণের সহযোগিতায় আগ্রহী নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ ভারতের সাথে তার দীর্ঘ সীমান্তকে অর্থনৈতিক সুযোগের উৎসে পরিণত করেছে। একই সময়ে,  নয়াদিল্লির সাথে বিতর্কিত দ্বিপাক্ষিক সমস্যা সমাধানে অগ্রগতিও করেছে।

বাংলাদেশ ভারতের দ্বারা স্থল-বেষ্টিত (ল্যান্ডলকড) হওয়ার বিষয়ে চিন্তিত ছিল, যার সাথে  তার স্থল সীমান্তের ৯০ শতাংশ । গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে কঠিন সম্পর্ককে একটি ফলপ্রসূ অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত করেছে। পরপর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী, মনমোহন সিং এবং নরেন্দ্র মোদির সাথে কাজ করে, তিনি একটি বড় ধরণের কষাকষিতে এই সময়ে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেন।  ভারত  সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় সহযোগিতা, ভারতের বাজারে আরও ভালো বাংলাদেশি পণ্যের  প্রবেশাধিকার, নদীর জল ভাগাভাগি, স্থল সীমান্ত নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বিচ্ছিন্ন আন্তঃসীমান্ত সংযোগ পুনরুদ্ধার বিষয়ে সংলাপের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে তৎপব হয়। ঢাকা এখন নিজেকে স্থলবেষ্টিত নয়, বরং ভারত ও এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে স্থল-সংযুক্ত এবং নদী-সংযুক্ত হিসেবে দেখে।

বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থানরত বাংলাদেশ সামুদ্রিক বিষয়ে অধিকতর আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে। গত এক দশকে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র-সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয় ঢাকা। ঢাকা যদি সঠিকভাবে তার তাস খেলে, বাংলাদেশ তার সামুদ্রিক সক্ষমতা জোরদার করতে ইন্দো-প্যাসিফিকের দ্রুত বিকশিত গতিশীলতা ব্যবহার করতে পারে। ঢাকার ইন্দো-প্যাসিফিক অভিযান যা বঙ্গোপসাগরে শুরু, সেটি  চীন, ভারত, জাপান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে  শক্তি প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার নতুন নতুন দিগন্ত উম্মোচন করবে।

বেইজিংয়ের সাথেও ঢাকার নিরাপত্তা সম্পর্ক রয়েছে এবং চীনের সাবমেরিন ও ফ্রিগেট কিনেছে। ভারত সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের সাথে তার বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততার মাত্রা বাড়াচ্ছে। কোয়াডের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে জাপান বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়নে আগ্রহী। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও বাংলাদেশের প্রতি তার ঐতিহ্যবাহী কৌশলগত অবহেলার অবসান ঘটাতে শুরু করেছে।  এটা কল্পনা করা সম্ভব যে কোয়াড দেশগুলি-অস্ট্রেলিয়া, ভারত, জাপান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশকে আকৃষ্ট করার জন্য জন্য তাদের পৃথক এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা জোরদার করবে।

বাংলাদেশ জানে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানের সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক ভারত বা চীনের উপর অত্যধিক নির্ভরতা হ্রাস করবে এবং তাদের পছন্দগুলিকে প্রশস্ত করবে। ঢাকা ভূ-রাজনৈতিক দাবা বোর্ডে খেলা এবং এর বাহ্যিক পরিবেশের সুবিধা গ্রহণে ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ব দেখিয়েছে। এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো নয়, এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে অন্ধভাবে গ্রহণ করেনি, বরং একাধিক অংশীদারকে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য,   ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জার্মানি, ফ্রান্স আর জাপান, রাশিয়া, তুরস্ক সহ মধ্যপ্রাচ্য আরব দেশগুলির সাথে যেভাবে আন্তঃ-রাষ্ট্রীয় কূটনীতি আর সম্পর্ক নিয়ে সফলতার সাথে কাজ করছেন তাতে বাংলাদেশ যে বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে একটি ক্রমবর্ধমান ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াচ্ছে – তা  অত্যন্ত পরিষ্কার। তাই স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উৎযাপন এই দেশের মানুষকে নতুন একটা মাত্রা দিচ্ছে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

লেখক : প্রধান সমন্বয়ক, আমরা ৯৯ শতাংশ (আপহোল্ড ৯৯)।

Print Friendly, PDF & Email