অন্ধকার আছে বলেই আলো দীপ্তিময়

মু. আবিদুর রহমান : জীবনের ক্ষুদ্র এই সময়ে কঠিন এক বাস্তবতা হলো সুখ এবং দুঃখের আবর্তন। এই দু’য়ের মাঝে জীবনকে উপভোগ করতে হয়। আমারা বিশ্বাস করি সুখ কিংবা দুঃখ দুটোই আপেক্ষিক স্থায়ী নয়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সংগঠনসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি কাজে সফলতা চাই। সফল ব্যক্তিদের জীবনি অধ্যয়ন করি। সফল ব্যক্তিদের নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করি। কিন্তু কখনো সফল ব্যক্তিদের সফলতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা হাজারো ব্যর্থতার গল্প উপলব্ধি করতে ব্যর্থ। দুনিয়ার ক্ষুদ্র এই জীবনে এমন মানুষই পাওয়া খুবই কষ্টকর যারা দুঃখ-কষ্টের মাঝে পতিত হয় নাই। তবুও আঘাতে জর্জরিত এই জীবন সর্বদা সুখই চাই। প্রতিটি সময় সুখের আশায় কাটিয়ে দেই। কোন কষ্ট সহ্য করতে চাই না। আহার করার পর পুনরায় ক্ষুধা লাগে। পানি পান করার পর পুনরায় পিপাসা জাগে। অসুস্থতার পর সুস্থতা আসে। কান্নার পর হাসি। রাতের পর দিন আসবে এটাই পৃথিবীর নিয়ম। তেমনি দুঃখের পর সুখ আসবেই। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই আছে সুখ -সূরা ইনশিরাহ :০৬।

সুখ-দুঃখ জীবনেরই একটা অংশ। সুখ পেতে হলে অবশ্যই কষ্ট করতে হবে। কষ্ট বা আঘাত না পেলে সুখ কি জিনিস সেই উপলব্ধি কখনো অন্তরে জাগ্রত হয় না। সুখের অনুপস্থিতি আমাদের মাঝে সুখের আকাঙ্খা বাড়িয়ে দেয়। জীবনের মাঝে কষ্টের উপস্থিতি আছে বলেই সুখের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। জীবনে যদি কষ্ট না থাকতো তাহলে সুখের কোন মূল্যই থাকতো না। যেমন অন্ধকার না থাকলে আলোর মূল্য নেই। রাতের আধাঁরতো একটুকরো ভোরের আশায়। রাত যতই কালো আর ভয়ানক হোক না কেনো সে কখনোই দিনের আলোকে ঢেকে রাখতে পারবে না। আলোর প্রতি আকর্ষণ যতখানি, অন্ধকারের প্রতি ততখানিই অনাগ্রহ। তাই অন্ধকার আছে বলেই আলো অত দীপ্তিময়।

জীবনের একটি অংশে এমন সময়গুলো আসবে যখন পাহাড়সম কষ্ট সহ্য করতে হবে। আর এই সময়টার উপস্থিতি খুবই জরুরী। কেননা মহান আল্লাহর তা’য়ালার নেয়ামতসমূহের পূর্ণ শুকরিয়া আদায়ের জন্য কষ্ট ও বিপদ আশীর্বাদ সরূপ। কষ্টের এই সময়গুলো মানুষকে মহান আল্লাহ তা’য়ালার সান্নিধ্যে পৌঁছতে সহায়তা করে। মানুষ স্বভাবগত ভাবে অকৃজ্ঞ। এই অকৃজ্ঞতার কথা স্মরন করে দিয়ে মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং দিয়েছেন কর্ন ,চক্ষু ,ও অন্তর। তোমরা অল্পই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো -সূরা আল মুলক:২৩। মানুষের এই অকৃজ্ঞতা সুখ বা আনন্দের সময়গুলোতে অনেক বেড়ে যায়। তখন সে আল্লাহর প্রদত্ত নেয়ামতের কথা ভুলে যায়। মানব জীবনে বাস্তবতা হলো কষ্টের সময়গুলোতে আল্লাহর স্মরন বেশী করা হয়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, মানুষের অবস্থা হচ্ছে এমন যখন সে কোন কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়, তখন সে দাঁড়িয়ে ,বসে ও শায়িত অবস্থায় আমাকে ডাকে। কিন্তু যখন আমি তার বিপদ হটিয়ে দেই তখন সে এমন ভাবে চলতে থাকে যেন সে কখনো নিজের কোন খারাপ সময়ে আমাকে ডাকেইনি। ঠিক তেমনিভাবে সীমা অতিক্রমকারীদের জন্য তাদের কার্যক্রমকে সুশোভন করে দেয়া হয়েছে -সূরা ইউনুস:১২।

মানুষ সাধারনত প্রাপ্তিতেই তৃপ্ত হয় আর অপ্রাপ্তিতে অতৃপ্ত হয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, মানুষের অবস্থা হচ্ছে এই যে, যখন আমি তাকে নিয়ামত দান করি তখন সে গর্ব করে ও পিঠ ফিরিয়ে নেয় এবং যখন সামান্য বিপদের মুখোমুখি হয় তখন হতাশ হয়ে যেতে থাকে -সূরা বনী ইসরাঈল:৮৩। সুখ কিংবা দুঃখ এই দুই অবস্থা মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পরিক্ষা সরূপ। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, আমি ভালো ও মন্দ অবস্থার মধ্যে ফেলে তোমাদের সবাইকে পরিক্ষা করছি, শেষ পর্যন্ত তোমাদের সবাইকে আমার দিকে ফিরে আসতে হবে -সূরা আম্বিয়া:৩৫। তিনি আমাদের থেকে দুঃখের সময় ধৈর্য্যের পরিক্ষা নিয়ে থাকেন। আর সুখের সময়ে তার দেওয়া নেয়ামতের কতটুকু কৃতজ্ঞতা আদায় করে থাকি সেই পরিক্ষা নিয়ে থাকেন। দেখা যাচ্ছে যে , সুখের সময় আনন্দিত হলেও দুঃখের সময় আমরা দুর্বল এবং হতাশ হয়ে যাই।

মুমিনের কাছে দুনিয়ার এই জীবন মহাসফরের একটি মন্জিল মাত্র। দুনিয়ার এই সফরের সাময়িক সুখে মুমিন আনন্দিত হবে না। এবং সাময়িক দুঃখ-কষ্টেও মুমিন বিচলিত বা হতাশ হবেন না। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, আমরা তোমাকে সত্য সুসংবাদ দিচ্ছি, তুমি নিরাশ হয়ো না। পথভ্রষ্ট লোকেরাই তো তাদের রবের রহমত থেকে নিরাশ হয় -সূরা হিজর:৫৫-৫৬। আমাদের অন্তর যখন শত আঘাতে জর্জরিত তখন একমাত্র মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে প্রশান্ত করার ক্ষমতা রাখেন। জীবনের যে কোন পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহ তা’য়ালার এই ঘোষনা অন্তরে জাগ্রতা রাখা যে, নিশ্চয়ই আমার সাথে আছেন আমার রব, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন -সূরা আশ শুয়ারা:৬২। এই ভরসাটুকু আমাদের পথ চলার পাথেয়।

রজনী শেষে যেমন প্রভাত আসে তেমনী দুঃখের পর সুখ আসবে। যত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেই থাকুন না কেনো সর্বদা মহান আল্লাহ তা’য়ালা নিকট আবেদন পেশ করুন। কেননা তোমাদের রব বলেনঃ আমাকে ডাকো। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো –সূরা আল মুমিন:৬০। নিশ্চিত তিনি আমাদের ডাকে সাড়া দিবেন যদি আমরা যথার্থ ভাবে তাকে ডাকতে পারি। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে অধৈর্য আর হতাশ না হয়ে যদি আল্লাহর উপর ভরসা করে ধৈর্য ধারন করতে পারি তাহলেই সফলতা হাতছাঁনি দিয়ে ডাকবে। মহান আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, হে ঈমানদারগণ তোমরা সবরের পথ অবলম্বন করো এবং দৃঢ়তা দেখাও, হকের খেদমত করার জন্য উঠে পড়ে লাগো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে -সূরা আল ইমরান:২০০। আল্লাহর সাহায্য কষ্ট অনুপাতেই আকাশ হতে অবতীর্ণ হয়। হতাশ হয়ে ভেঙ্গে না পড়ে , চিন্তায় হারিয়ে না গিয়ে মালিকের উপর বিশ্বাস রাখুন। বিপদে যত অস্থির হয়ে যান না কেনো মহান আল্লাহ তা’য়ালা এর সুন্দর সমাধান রেখেছেন।

  • হতাশা যখন মানুষের অন্তর দখল করে নেয়। বুক যখন প্রশস্ততা সত্ত্বেও সংকীর্ণ হয়ে যায়। বিপদ এসে বাসা বেধেঁ কিংকর্তব্য বিমূঢ় অবস্থা সৃষ্টি করে। সেই সময় বান্দার উপর করুনাময় মহান আল্লাহর অনুগ্রেহর দৃষ্টি পড়ে যায়। তখন এমন ভাবে মহান আল্লাহ তার বান্দার বিপদ দূর করে দেন যেনো কোন বিপদই ইতিপৃর্বে তাকে স্পর্স করে নাই। মানুষ সর্বদা আলোর প্রত্যাশায় জেগে থাকে। সকল আধাঁর কেটে ধরনির বুকে নেমে আসবে সুদিন। অধঃপতনের হতাশাময় জীবনের মাঝে উথানের আনন্দঘন মুহুর্তের তুলনাই হয় না। জীবনের প্রতিটি ক্ষণে হতাশ না হয়ে মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে, সাহস নিয়ে মন্জিলে পথে হও আগোয়ান। সফলতা আসবেই- ইনশাআল্লাহ।
Print Friendly, PDF & Email