বিয়ে কেমন হলো, জানতে ফোন দিবো…

লাকী আক্তার

আজকে রিকশায় চড়ার পর রিকশাওয়ালা বললো আপা সন্ধ্যা ৬টা থেকে এখন কয় ঘণ্টা হয়। আমি দেখলাম ১১টা বাজে। মানে ১৭ ঘণ্টা।

বললাম ভাই: ১৭ ঘণ্টা
উত্তরে সে বললো, আপা জীবনে একটানা কখনও এই রকম রিকশাচালাই নাই। আজকেই চালাইলাম।
আমি বললাম, আপনার বাড়ি কোথায়?
তিনি বললেন, আপা পাবনা, চাটমোহর।
আপা আপনি ঐদিকে গিয়েছিলেন কখনও।
আমি বললাম, হ্যাঁ, সাথিয়াতেও গিয়েছিলাম।

নিজেই বললো, আপা আমার খুব বেশি আর্থিক সংকট নাই। বাড়িতে জমি আছে এক বিঘা। সেখানেই নিজেই আবাদ করি। ঢাকায় ১৫ দিন রিকশা চালাই, আর বাকি দিন বাড়িতে চাষাবাদ। এভাবেই চলে। আর আমাদের  বাজারের সাথে লাগোয়া বাড়ি। সেখানে আমাদের একটা দোকান আছে সেটা ভাড়া দিয়েছি। সেখান থেকে ৭ হাজার টাকা আয় হয়।

তো আমি বললাম, তাহলে এতো কষ্ট করতেছেন কেন?
উত্তরে যা বললো, আমি অবাক হয়ে গেলাম।
বললো আপা, আমাদের সঙ্গে এক ভাই রিকশা চালাতেন। তার নাম হাসান। যদিও ১৯৯৫ সালের দিকে তিনি হিন্দু থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে প্রদীপ থেকে হাসান হয়ে গিয়েছিলেন। সে লোকটা একটা অদ্ভুত ধরনের ভালো মানুষ ছিলেন। দুটা ছেলে-মেয়ে। মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি তাদের সৈয়দপুর। সেই হাসান ভাই রিকশাওয়ালাদের মধ্যে খুব শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন।

তো গত সপ্তাহে তিনি হুট করে মারা যান। তারপর মেয়েটার বিয়ে নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তো তিনিসহ ১৪ জন রিকশা ড্রাইভার ভাবলেন তাদের কিছু করতে হবে। তারা মহল্লা থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা তুলেছেন।

আর বাকি টাকা তারা ১৪ জন রিকশা ড্রাইভার বহন করবেন বলে পণ করেছেন। তাই তারা গতরাতে একযোগে সারারাত রিকশা চালিয়েছেন। আজকে তারা একেক জন ১৫০০ করে দিবেন। তো আমি জিজ্ঞাস করলাম আজকে কত টাকা হয়েছে। তার হাসির ঝিলিক ১৪৩০ টাকা। তো আমার ভাড়া ৫০ ছিল আমি তাকে ৭০ টাকা দিয়ে বললাম তাহলে আপনার ১৫০০ কোটা ফিলাপ।

তিনি বললো, আপা এখন জমা তুলতে হবে তো। এর মধ্যেই আরেক রিকশা ড্রাইভার, তাকে বললো,
কিরে যাবি না এখন গ্যারেজে? সে বললো, আর দুটো খ্যাপ।

তারপর সে রিকশা চলে গেল। তার চেহারায়ও ক্লান্তি। আমাকে বললো আপা উনিও ১৪ জনের একজন।
বললো আপা, আজকে দিনে ঘুমায়া বিকালে বাজার করবো। আর কিছু টাকা শর্ট থাকলে আবারও এই রকম ১৭ ঘণ্টার খ্যাপ মারবো।

জিজ্ঞেস করলাম, কি নাম ভাই আপনার?
বললো, মিজানুর রহমান।
বললো দোয়া করবেন আপা। যেন গায়ে গতরে খাটতে পারি।
বললাম চা খাবেন?
বললো না আপা, ভাত খাইয়া ঘুমাবো!

আমি বললাম নাম্বারটা দেন। বিয়ে কেমন হলো, জানতে ফোন দিবো।
সে নাম্বার দিল। আমি নাম্বার নিয়ে হাঁটা দিলাম। পিছন ফিরে দেখলাম, মিজানুর রহমান দ্রুতবেগে রিকশা চালিয়ে চলে যাচ্ছেন।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

Print Friendly, PDF & Email