মধ্যপন্থাই সেরা পন্থা

সর্বজনবিদিত একটি প্রবাদ excess of anything is bad অর্থাৎ কোনো কিছুর বাড়াবাড়িই খারাপ। মাত্রা অতিক্রম করলে অনেক ভালো জিনিস মন্দ রূপ বা আকার ধারণ করতে পারে। যেমন মাত্রা অতিক্রম করলেই সাহস হঠকারিতায়, আত্মোৎসর্গ আত্মহত্যায়, প্রতিযোগিতা হিংসায়, ধর্মভীরুতা ধর্মান্ধতায় পরিণত হতে পারে। অবস্থাবিশেষ সমালোচনা পরচর্চায়, প্রশংসা চাটুবাদে, তেজ ক্রোধে, দেশপ্রেম দেশদ্রোহিতার স্তরে নেমে আসতে পারে। সব দেশ সমাজ সংসারে, রাজনীতি সমাজনীতি অর্থনীতির অবকাঠামোয় এটি প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়।

নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রা যেমন সবার পছন্দ তেমনি সুরের মধ্যে পঞ্চম-স্বরই মিষ্ট এবং শ্রেষ্ঠ। আল কোরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বারবার বলেছেন তোমরা কোনো কিছুতেই সীমালঙ্ঘন কোর না। আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে ভালোবাসেন না। লোকমান হাকিম তাঁর ছেলেকে উপদেশাচ্ছলে বলেছেন, ‘মাটিতে হাঁটবে মধ্যম মেজাজে আর তোমার স্বর হওয়া উচিত মোলায়েম, স্বরের মধ্যে গাধার স্বরই নিকৃষ্ট।’

করোনাকালে এ শিক্ষা সবাই পেয়েছে যে স্বাস্থ্যবিধি মানা মানে খাওয়া-দাওয়া, চলাচলে, চাওয়া-পাওয়ায়, মেলামেশা, আগ্রহ-আকাক্সক্ষার ক্ষেত্রে একটা পরিমিতি বোধ মেনে চলা। ক্যানভাসের রং ও তুলির সুষম সমন্বয়ে শিল্পের সার্থকতা ফুটে ওঠে। পারিপার্শ্বিক সবকিছুর পরিমিত অবস্থান ও শৃঙ্খলা শোভিত উপস্থাপনার মধ্যেই সৌন্দর্যের যথার্থ বিকাশ। নিয়মনিষ্ঠা পালন ও সহনশীলতা প্রকাশ যে কোনো বিশৃঙ্খল পরিবেশে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। অধিক ভোজনই অধিকাংশ রোগবালাইয়ের কারণ। মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা সরবরাহে সমস্যা সৃষ্টি করে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। অধিক পরিশ্রমে মন ও শরীর ভেঙে পড়ে। অতিকথনে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। অতিরিক্ত সবকিছু খারাপ। অতিভক্তি চোরের লক্ষণ- এর চাইতে সত্য বাক্য আর নেই।

বাড়াবাড়ি কখনই সুখকর হয় না। অতি উত্তেজিত ব্যক্তির হার্ট বিট ও রক্তের চাপ বাড়ে। অতিদ্রুত চলাচলকারী গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সমূহ বিপদের কারণ ঘটাতে পারে। চলনে আচার ব্যবহারে মধ্যম পন্থা অবলম্বনই সেরা অভ্যাস বলে বিবেচিত। আনন্দ সর্বনাশের অধিক উচ্ছ্বাস কিংবা অতিশোকে কাতর হতে নেই। আনন্দের পর বিষাদ আসছে আর বিষাদের পর আনন্দ আসবেই এ বোধ ও বিশ্বাসে সকল পর্যায়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা বা রাখার উপকারিতা অস্বীকার করা যায় না। ভগবদ্গীতার (অধ্যায়-২ শ্লোক-১৫) যেমন বলা হয়েছে-  o best (Arjuna), the person who is not disturbed by happiness and distress and is steadz in both is certainly eligible for liberation.

প্রত্যেকেরই চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে, আশা-আকাক্সক্ষা ও প্রয়াস প্রচেষ্টার মধ্যে পরিমিতি বোধ থাকা চাই। আমি বা আমরা যা পারি বা আমাদের প্রাপ্য তার বেশি করতে যাওয়া বা পাওয়ার আকাক্সক্ষা বা চেষ্টায় নানান বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। আহারের ক্ষেত্রে কথাটা আরও বেশি খাটে। অধিক আহার শরীরকে দুর্বল করে দেয়। যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু আহার করা উচিত। অতি শ্লথ গতির গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছাতে যেমন বিলম্ব করে তেমনি অতিদ্রুত গতির গাড়ি গন্তব্যে হয়তো আদৌ না পৌঁছাতে পারে। অতিদ্রুতগামী সেই খরগোশের কাহিনি আমরা জানি। কচ্ছপের ধীর ও পরিমিত গতির কাছে তার পরাজয় ছিল নিশ্চিত। অতিবর্ষণে বন্যা হয়, অধিক শীতে কাতর হয়, অতি গরমে হাঁসফাঁস করে সবাই। সবার স্বপ্ন থাকে বসন্তের বাতাস, নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশ, পরিমিত বর্ষা আর মধ্যম বা পঞ্চম সুরের গান।

মধ্যপন্থা অবলম্বনে বিপদের ঝুঁকি কম। মধ্যম অবস্থানে থাকলে উঁচু মাত্রায় উঠতে যেমন সুবিধা হয়, নিচু মাত্রায় নামার ক্ষেত্রেও অসুবিধা হয় না। অথচ অতিনিম্ন মাত্রায় থাকলে তাকে মধ্যপন্থা পেরিয়ে উচ্চপন্থায় যেতে বেশ বেগ পেতে হয়। আবার উচ্চপন্থা থেকে মধ্যপন্থা হয়ে নিম্নপন্থায় নামতেও বেশ বিব্রতকর হতে হয়। বিশ্বাস ও বয়ানে মধ্যপন্থা নিরাপদ ও সুশ্রাব্য। কোকিলের স্বর পঞ্চম ও মধ্যমানের তাই এত মিষ্ট। পক্ষান্তরে কাকের স্বর সপ্তম, কর্কশ। সুশ্রাব্য নয়। মধ্যপন্থার সুর বা স্বর সহজে অন্যের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম হয়। পক্ষান্তরে উচ্চগ্রামের গান বা কথাবার্তা অশ্রাব্য ও ঝগড়া, বাদানুবাদের ভাষা। চরম অবস্থান গ্রহণে সহজে সমঝোতা হয় না। সমাধান খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হয়। মিষ্টি সুরের গান বা কথা সব সময়ই মোলায়েম ও কোমল প্রশান্তির পরিচয় তুলে ধরে আনন্দ ও উপভোগের সুযোগ সৃষ্টি করে।

জীবনযাত্রায় সকল পর্যায়ে মধ্যপন্থা অবলম্বনের আবশ্যকতা রয়েছে। সম্পদ সসীম বা সীমিত অথচ চাহিদা অসীম বা অবারিত। সীমিত সম্পদ দিয়ে অসীম চাহিদা মেটাতে সবাইকে পরিমিতিবোধ মেনে চলতেই হয়। সময় সীমাবদ্ধ। করণীয় অনেক কিছু। স্বল্প সময়ের সদ্ব্যবহার করতে গিয়ে বিচক্ষণতার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে অতি ধীরে কিংবা অতি দ্রুততার সঙ্গে কোনো কিছু চাওয়া বা করতে যাওয়ায় সমস্যা হয়েই থাকে। যারা প্রকৃত বুদ্ধিমান তারা আজকের ঘটনা নিয়ে আজ ভাবেন না। এটি তারা ভেবেছিলেন বেশ কিছুদিন আগে এবং আজ যা ভাবছেন, তা আজকের জন্য নয়, ভাবছেন বেশ কিছুদিন পরের জন্য। যারা তাৎক্ষণিক ঘটনায় আপ্লুত, বিমোহিত, বিমর্ষ কিংবা উৎফুল্ল হন, তাঁরা অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খুব একটা স্বচ্ছ ধারণা পোষণ করতে সক্ষম বলে মনে হয় না। সময় যেহেতু দ্রুত পরিবর্তনশীল, সেহেতু তাৎক্ষণিক বলে কিছু নেই। এবং তাৎক্ষণিকের ঘটনায় চূড়ান্ত সবকিছু ভাবাও সঠিক নয়। তবে তাৎক্ষণিকের ঘটনা কিন্তু তাৎক্ষণিক নয়, এটি সময়ের ধারাবাহিকতারই একটি অংশ। সে কারণেও তাৎক্ষণিকই চূড়ান্ত নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বর্তমানের কার্যকরণকে এবং ভবিষ্যতের প্রতি দৃষ্টিক্ষেপে প্রভাব ফেলতে বাধ্য। সুতরাং বর্তমানের ঘটনাকে সতর্ক, সংহত ও সংযমের সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত। পরে কী ঘটে তার জন্য অপেক্ষা করা প্রয়োজন। এটা করতে পারলে উত্তেজনা পরিহার করা সম্ভব।

ভোগবাদীরা অবশ্য বলেন, কাল কী হবে সে চিন্তা পরে হবে, আজকেরটা উদযাপন বা উপভোগ করে নাও। এটা তারা বলেন উপভোগ বা আনন্দের জন্য। দুঃখভোগের বেলায় নয়। আনন্দ উপভোগের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের উৎকণ্ঠার বাদ সাধা উচিত নয় কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতার প্রশ্নে তা একটা বিভ্রান্তিবিশেষ। সংশয়বাদীরা তাই তাৎক্ষণিকতাকে উপভোগ করতে পারে না।

সংশয় আর সংযম-সুস্থিরতা এক কথা নয়। সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হলো মধ্যপন্থা। সুতরাং যে কোনো ব্যাপারে ও বিষয়ে তা সে আনন্দের হোক আর দুঃখের, সেখানে তাৎক্ষণিকতায় বিভোর ও বিমর্ষ কোনোটাই কাম্য নয়। সংযত সংহত অবয়বে, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রহিত উপায়ে তা গ্রহণ করা উচিত। মধ্যপন্থা অবলম্বনই শ্রেষ্ঠ উপায়।

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান।

Print Friendly, PDF & Email