সর্বংসহা শেখ হাসিনা

শাহরিয়ার মাহমুদ প্রিন্স :

ঢাকা : বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার আবির্ভাব যতটা না আনন্দের তারও অধিক বেদনার। ১৯৭৫’র ১৫ই আগস্টের বিয়োগান্ত নিষ্ঠুর ঘটনার আবর্তে তাঁকে রাজনীতির পথে এগুতে হয়েছিল। এই পথ ও সর্বস্বান্ত একটি জাতির মুক্তির কাণ্ডারি হয়ে পাষাণে বাঁধা হৃদয়ের রক্তক্ষরণ সহ্য করতে করতেই তাঁকে স্বভূমির দায়িত্ব নিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু-কন্যা তাঁর সবচেয়ে বড়ো পরিচয়। কিন্ত যখন এই আবেগতাড়িত ব্যক্তিগত পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে তিনি অপরিহার্য হয়ে ওঠেন নেতৃত্বে-শাসনে এবং উন্নয়নের সোপানে তখন তিনি সমকালকে ছাড়িয়ে মহাকালকে স্পর্শ করেন। পিতা মুজিবের আদর্শের সত্যিকারের উত্তরাধিকার হয়ে আজ তিনি গণমানুষের অন্তরে এবং সর্বাংশে বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রধানতম কর্ণধার হিসেবে অপ্রতিরোধ্য হয়েছেন।

শেখ হাসিনা তাঁর সময়কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিকই নন শুধু, তিনি গোটা বিশ্বের কাছে বিস্ময়কর এক প্রতিভাধর রাষ্ট্রনায়ক এখন। পিতার সমগ্র ভাবনাকে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালনের মতো দুঃসাধ্য কাজের কঠিন গুরুদায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে তিনি অবিচল পরিশ্রমে সজ্জিত করছেন বাংলাদেশকে। পিতার মতোই শেখ হাসিনার কাছে অদ্বিতীয় এক আবেগের নাম বাংলাদেশ এবং বাংলার দুঃখী মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন। বাংলাদেশের সমস্ত ভাবনাকে এককভাবে বহন করে পচাত্তরে পা রাখা শেখ হাসিনা এখন একজন পোক্ত রাজনীতিবিদ, উদার এবং নির্ভীক জনদরদি প্রধানমন্ত্রী।

আমরা যারা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মতবাদের সাথে ভিন্নমতে বক্তব্য রাখি, আদর্শগত এবং নীতিগত পার্থক্যের কথা সরাসরি বলতে সংকোচ করি না, তারাও কিন্ত একথা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষের আস্থা এবং সৃজনের সর্বশেষ ভরসাস্থল বঙ্গবন্ধু-কন্যা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমাদের ভিন্নমতে বিশ্বাসীদের কতটুকু দাম আছে বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের কাছে এই হিসেবটা আমরা কোনোদিন করিনি। তত্ত্বকথা ও নীতিকথা বলে বলে নিজেদের জাহির করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছুনোর সময় এবং দায় কোনোটাই আমাদের হলো না। শত ভিন্নমত থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী কোনো মানুষ কি আজ অবধি শেখ হাসিনার কাছে গিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছেন? ভাবুন তো। বরং পীড়িত বা সব হারানো মানুষের কল্যাণে শেখ হাসিনা বারবার ছুটে গেছেন বিস্তীর্ণ গ্রামে, মফস্বলে।

১৯৭৫’র পনেরো আগস্ট ইতিহাসের কলঙ্কজনক হত্যাকাণ্ডের ছয় বছর পর অর্থাৎ ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে তিনি বিনীত, শান্ত ও শীতলভাবেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার রোধ করতে ইনডেমনিটি নামক কালো-আইন জারি করা হয়েছিল। রাষ্ট্র ক্ষমতায় দীর্ঘকাল অধিষ্ঠিত থাকতে এবং বাংলাদেশের অসম্প্রদায়িক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে পাকিস্তানি ভাবনার শাসন কায়েমের উদ্দেশ্যে এক সমরনায়কের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়াকে রোধ করা হয়েছিল। পাথর বুকে চেপে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের একুশ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব নিয়ে সেই কালো-আইন বাতিল করেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রচলিত বিধি-বিধান বা আইনের আলোকেই হয়েছে। একই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। এসব সম্ভব হয়েছে তাঁর অদম্য সাহস এবং ঐক্রান্তিক ইচ্ছার কারণে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এমন সহিষ্ণু নজির ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে বাংলাদেশের বিরতিহীন উন্নয়ন এবং সাফল্যের বহু বিবরণ উল্লেখযোগ্য হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি এসব নিয়ে সবিস্তর আলোচনার প্রয়োজন আছে। তাঁর সকল কর্মের বিস্তারিত বিবরণ সমন্বিত একটি প্রামাণ্যগ্রন্থ হওয়া উচিত। যাহোক, নিজস্ব উদ্যোগে পদ্মা সেতু নির্মাণ, রাজধানীতে মেট্রোরেল স্থাপনের কাজ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকাসহ জনবসতিপূর্ণ মহানগরীতে উড়ালপুল নির্মাণকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। বিদ্যুৎ, পানি, নৌ-পথ, সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, গ্রামীণ অবকাঠামো, কৃষি ব্যবস্থাপনা, খাদ্য উৎপাদন, মানবসম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি, নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, মৎস ও প্রাণিসম্পদ বৃদ্ধিকরণসহ সার্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থায় যে আকাশচুম্বী সফলতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সাধিত হয়েছে, এটা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে  একটি সাফল্যময় রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করেছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা কম বেশি সবাই অবগত। মোট জাতীয় আয়, মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়, রপ্তানি আয়, রেমিটেন্স আয় বিপুলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব আগ্রহে গৃহহীনদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে গৃহ বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রণোদনা দিয়ে অতিমারীর এই সময়ে অর্থনৈতিক প্রায় সকল ক্ষেত্রকে সচল রাখা হয়েছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মাটিতে নির্যাতিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অস্থায়ী আবাসন ও সেবা দিয়ে মানবিকতার অসাধারণ একটি নজির স্থাপন করেছেন। এছাড়া পার্বত্য শান্তি চুক্তির মধ্য দিয়ে তিনি পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে এনেছেন। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাংলাদেশের মানচিত্রে ছিটমহল যোগ হয়েছে তাঁরই সুযোগ্য নেতৃত্বে। এমন অসংখ্য উন্নয়ন ও সাফল্যের বিস্তারিত বিবরণ আমরা সকলেই জানি। আমাদের সেই প্রাণপ্রিয় নেত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পচাত্তরতম জন্মদিন আজ ২৮ সেপ্টেম্বর। মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসায় তিনি শতায়ু হোন। করুণাময় আমাদের প্রার্থনাকে নিশ্চয় সজীব রাখবেন। জয় বাংলা।

লেখক- সাংবাদিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী

Print Friendly, PDF & Email