দাদা শিয়াল বাড়ি নেই

এক জঙ্গলে বাস করত একাকী এক শিয়াল, বয়স তার ভারী হয়ে গেছে। মানুষের বাড়িতে রাতের আঁধারে মুরগি চুরি করতে আগের মতো আর সাহস পায় না। কি করবে শিয়াল পন্ডিত? বুড়ো হয়ে গেলেও তো বুদ্ধি বুড়ো হয়নি। তাই রাতের আঁধারে না গিয়ে দিনের আলোতেই বাড়রি পাশে ঝোপে আশ্রয় নিল। দেখে একটা মুরগি তার বেশ কয়েকটি ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে ঘুরছে। একবার লোভে পেয়েছিল কাছাকাছি পেয়ে, কিন্তু ছোট বাচ্চা দেখে তার মনে মায়া লাগল। কিন্তু একটা বুদ্ধি বের করে ফেলল। খুব নরম সুরে সেই মুরগিকে ডাকল, কিন্তু মুরগি দিনের বেলায় শিয়ালের কণ্ঠ শুনেই ভয় পেয়ে গেল। সে চিৎকার দিয়ে উঠল, বাচ্চাগুলো একটা ঝোপে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। মুরগির চিৎকার শুনে ছুটে এলো কুকুর আর শিয়াল পন্ডিত, সেই ঝোপ থেকে পাশের ঝোপে চুপিচাপি আশ্রয় নিল। কুকুর এসে কাউকে না পেয়ে সে ফিরে গেল। কিন্তু শিয়াল যে ঝোপে আশ্রয় নিয়েছে, সে ঝোপেই মুরগির বাচ্চাগুলো রয়েছে। এখন মুরগি আর কি করবে নিজের বাচ্চাদের বাঁচানোর জন্য, শিয়াল পন্ডিতের কাছে গেল। শিয়াল পন্ডিত বুদ্ধি করে বলল, বন্ধু আমি তোমাকে খাব না, তুমি আমার বন্ধু। আর আমি আগের মতো খেতে পারি না বয়স হয়ে গেছে না। যাও তোমার বাচ্চাদের নিয়ে যাও। মুরগি তো মহাখুশি যার ভয়ে এত দিন পালিয়েছে, সে বলেছে বন্ধু। এবার মুরগি তার বাচ্চাদের নিয়ে বাড়িতে ফিরে এলো। কিন্তু শিয়ালের আশা সেদিন আর পূরণ হলো না। খিদেও লেগেছে প্রচুর কি করবে, সেদিনের রাতটি না খেয়ে কাটাতে হলো তার, সকাল হতেই ছুটল সেই জঙ্গলের দিকে। গিয়ে দেখাও হয়ে গেল মুরগির সঙ্গে দুই বন্ধু মিলে গল্প শুরু করে দিল। শিয়াল বলছে, বন্ধু এখন আর জঙ্গলে একা একা ভালো লাগে না, ভয় লাগে, যদি…! যদি কি বন্ধু? তোমাদের বাড়িতে কি কোথাও জায়গা হবে আমার থাকার মতো? কি যে বল, বন্ধু আমি যেখানে থাকি তার পাশেই একটা অনেক পুরনো ভাঙা ঘর আছে সেখানে কেউ যায় না। তুমি আরামেই থাকতে পারবে। কিন্তু বন্ধু তোমার খাবার পাবে কোথায়? আরে বন্ধু আমি এখন না খেয়েই সপ্তাহখানেক থাকতে পারি। আগে তো অনেক পাপ করেছি, এখন রোজা রেখে সেই পাপগুলো একটু কমানোর চেষ্টা করছি। তুমি যদি আশ্রয় দাও, আমি তোমার কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। রাজি হয়ে গেল মুরগি, বলল সন্ধ্যায় এসে তোমাকে নিয়ে যাব। যেই কথা সেই কাজ সন্ধ্যায় এসে শিয়ালকে বাড়ির কাছে নিয়ে গিয়ে ঘরটা ইশারা দিয়ে দেখিয়ে দিল। আর অন্ধকার হতে শিয়াল সে ভাঙা ঘরে আশ্রয় নিল। চোরের নেশা চুরি করার, মালিক কতক্ষণ জেগে থাকবে। শিয়াল মনে মনে ঠিক করল আজ পাশের বাড়ি থেকে রাতের খাবার খেয়ে নিব, আর তাই করল পাশের বাুড় মনার তিনটা মুরগি খেয়ে ফেলল। আর খুব আরাম করে ঘুমিয়ে পড়ল, সকাল হতেই মুরগি শুনতে পেল তার প্রতিবেশী তিনটা মুরগি রাতের আঁধারে নিখোঁজ। সে চুপিচুপি গেল সেই ভাঙা ঘরের কাছে, গিয়ে দেখে শিয়াল বন্ধু বিভোর ঘুমে, খুব আস্তে করে ডাকল বন্ধু ও বন্ধু… মুরগির ডাক শুনে শিয়াল চোখ খুলল, সকাল কখন হলো বুঝতেই পারিনি। জানো বন্ধু কত দিন পর যে এমন আরাম করে ঘুমালাম তোমাকে বলে বুঝাতে পারব না।

-শুনো বন্ধু, আজ আমার প্রতিবেশী তিনজন নিখোঁজ, তাই মালিক একটু রাগান্বিত, তুমি একটু সাবধানে থেকো!

-বন্ধু তাহলে আমি এখনি জঙ্গলে চলে যাব।

-কেন?

-যদি আমায় সন্দেহ করে এখানে খুঁজতে এসে পেয়ে যায়, তাহলে তো আমাকে হাড়ভাঙা পিটুনি দিবে। আমি বুড়ো বয়সে আমি সহ্য করতে পারব না।

-তুমি আমার বন্ধু না তুমি তো আর এই কাজ করতে পার না। আর এখানে কেউ মনে হয় আসবে না। আর তুমি চলে গেলে কিন্তু আর কোনো দিন তোমার সঙ্গে কথা বলব না।

-আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে বন্ধু তোমার অনুরোধ রক্ষা করার চেষ্টা করব।

এভাবে প্রায় এক মাস কেটে যায় শিয়ালের ওই ভাঙা ঘরে কিন্তু প্রতিদিন ভোর হলেই শোনা যায় আজ অমুকের মুরগি নেই, কাল তমুকের মুরগি নেই। তবে খাচ্ছে এসব মুরগি? প্রশ্ন জাগে, আরে আমার বন্ধুতো সারা রাত দিন ঘুমের মাঝেই কাটিয়ে দেয়। আমার বন্ধুতো আর করতে পারে না!

ঠিক ওইদিন সন্ধ্যায় অন্য জঙ্গলের শিয়াল যাচ্ছিল, যাওয়ার পথে শুনতে পেল এক গৃহস্থ খুব গালমন্দ করছে সব শিয়ালের বাপ মা তুলে, কথাটা সেই শিয়ালের গায়ে লেগে যায়, তখন সে চিন্তা করে আমি তো আর এই মুরগিগুলো চুরি করিনি, আর এই আশেপাশে পাশের জঙ্গলের দাদা শিয়াল ছাড়া তো কেউ নেই, তবে এগুলো চুরি করছে কে? তাহলে তো দাদা শিয়ালের খবর নিতে হয়! সে সময়ি চলে গেল পাশের জঙ্গলে দাদা শিয়ালের আস্তানায়। কিন্তু গিয়ে দেখে তার আস্তানাটি পরিত্যক্ত অবস্থায়, মনে হয় অনেক দিন এখানে যাওয়া আসা নেই। তাহলে দাদা শিয়াল গেল কোথায়? দেখা হয়ে যায় খোরগোশের সঙ্গে, তারে জিজ্ঞেস করে দাদা শিয়ালের কথা, আর খোরগোশ উত্তরে বলে, দাদা শিয়াল তো অনেক দিন উনার আস্তানায় আসে না, তবে মাস দুই আগে এক দিন বিকাল বেলায় দেখালাম উনি খুব হাসছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, দাদা আপনাকে খুব খুশিখুশি মনে হচ্ছে, কোথাও যাচ্ছেন নাকি?

তিনি বললেন হ্যাঁ যাচ্ছি, এখানে তো আর আগের মতো খাবার নেই, আর যেখানে যাচ্ছি সেখানে খাবারের অভাব নেই। থাকার জায়গাটাও চমৎকার। খুব আরামেই থাকতে পারব…।

কই যাচ্ছেন দাদা?

আরে আমার মুরগি বন্ধুর বাড়ি, সেই তো তার গৃহস্তের ভাঙা বাড়িতে থাকার জায়গা করে দিয়েছে। সেখানে কেউ যায় না খুব নিরাপদ জায়গা। আরে, তোকে এসব কথা বলছি কেন? সন্ধ্যা হয়ে গেল তাড়াতাড়ি যেতে হবে।

এই বলে যে দাদা শিয়াল গেল আর ফিরে আসেনি। তখন আর ছোট শিয়ালের বুঝতে বাকি রইল না। শালার দাদা শিয়াল তুমি গৃহস্তের বাড়িতে লুকিয়ে থেকে মুরগি চুরি করছো আর আমি জঙ্গলে থেকে বকা শুনছি, এবার মজা দেখাচ্ছি।

পরদিন ভোর বেলায় ছোট শিয়াল গ্রামের রাস্তায় হাঁটা শুরু করল, প্রথমেই দেখা হয়ে গেল আজ রাতে যার মুরগি চুরি হয়েছে, সেই গৃহস্তের সঙ্গে। গৃহস্ত তো রেগে আগুন লাঠি হাতে তাড়া করল আর শিয়াল শিয়াল বলে চিৎকার শুরু করল, আর গ্রামের লোকজন সবাই বেরিয়ে পিছন থেকে তাড়া। দাদা শিয়াল আরাম করে ঘুমাচ্ছে আর ছোট শিয়াল দৌড়াচ্ছে, দৌড়াতে দৌড়াতে এক সময় সেই ভাঙা ঘরে ভাঙা ফোঁটা দিয়ে ঢুকে পড়ে, আর অন্য পাশের ভাঙা ফোটায় বেরিয়ে যায় ছোট শিয়াল। কিন্তু দাদা শিয়াল ততক্ষণেও ঘুমে। গ্রামের লোকজন বলাবলি করে এই ঘরেই শিয়াল আছে, তাই তারা ভাঙা ঘরটি চারদিক ঘিরে ফেলে। মানুষের হইচই শুনে ঘুম ভেঙে যায় দাদা শিয়ালের। কিন্তু ততক্ষণে দাদা শিয়াল বন্দিদশায়। তবুও নিজের জীবন বাঁচাতে একদিকে দৌড় দেয়, কিন্তু তার মাথায় একজন লাঠি দিয়ে আঘাত করে, আর দাদা শিয়াল মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, তখনি শুরু উপর্যুপরি লাঠির আঘাত, সেখানে প্রাণ হারালো দাদা শিয়াল, আর ছোট শিয়াল হলো দুই জঙ্গলের শিয়াল রাজা।

Print Friendly, PDF & Email