টাকার বান্ডিলে স্ট্যাপলার কেন?

টাকার বান্ডিলে স্ট্যাপলার পিন ব্যবহার করে ছিদ্র করায় দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে নোট। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইস্যু করা টাকায় ছিদ্রের কারণে সময়ের আগে বাতিল করতে হয় এসব নোট। স্ট্যাপলার পিন ব্যবহৃত টাকার বান্ডিল থেকে টাকা আলাদা করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ছিঁড়ে যায়। এর জন্য ভোগান্তির শিকার হন গ্রাহকরা। পৃথিবীর কোথাও কাগজের মুদ্রার বান্ডিলে স্ট্যাপলার ব্যবহার করা না হলেও বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম।

প্রতিটি ব্যাংকের শাখা থেকে টাকা উত্তোলন করতে গেলে দেখা যায় বেশির ভাগ বান্ডিল স্ট্যাপলার পিন দিয়ে আটকানো। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্ট্যাপলার পিন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পরও কোনো কাজ হয়নি। এখনো বেশির ভাগ ব্যাংক নোটের বান্ডিলে ছিদ্র করে পিন ব্যবহার করছে। তবে টাকার বান্ডিলে পিন ব্যবহার শুধু ব্যাংক নয়, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও ব্যবহার করা হয়। এসব নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নজরদারি নেই।

জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রচলিত টাকার নোটের বান্ডিলে স্ট্যাপলার পিন লাগানোর কারণে দ্রুত অনেক নোট নষ্ট হয়ে অপ্রচলনযোগ্য হয়ে পড়ছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংক বলছে তারা এ পিন ব্যবহার করছে না এবং ব্যাংকগুলোকেও কোনো ধরনের পিন ব্যবহার না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তফসিলি ব্যাংক তাদের পুরো ব্যাংকিং কার্যক্রমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা কার্যকর করছে না। অনেক সময় টাকার বান্ডিলে পিন দেখা যাচ্ছে বা পিনের কারণে টাকায় ছিদ্র দেখা যাচ্ছে। বাজারে প্রচলিত বাংলাদেশি ব্যাংক/কারেন্সি নোটগুলোর ওপর সংখ্যা লিখন, সিল, স্বাক্ষর প্রদান ও বারবার স্ট্যাপলিং করার কারণে সেগুলো অপেক্ষাকৃত কম সময়ে অপ্রচলনযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ব্যাংক ও টাকার ওপর লাল, নীল, কালোসহ বিভিন্ন কালিতে লিখনের মাত্রা বাড়ছে। এ ছাড়া লেখালেখিতে ব্যাংকারদের ভূমিকাই মুখ্য। এ ছাড়া সব মূল্যমানের পুনঃ প্রচলনযোগ্য নোট ময়লা ও অচল হয়ে যাচ্ছে। স্ট্যাপলিংয়ের কারণে কমে যাচ্ছে নোটের স্থায়িত্ব। দ্রুত টাকা নষ্ট হওয়ার কারণে ফের টাকা ছাপাতে হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে। এই নতুন নোট ছাপাতে সরকারকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়। প্রতি বছর এ খরচ বাড়ছে। টাকা তৈরির কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। টাকার কাগজ, রং, নির্দেশক সুতাসহ বিভিন্ন উপাদান সবই ইউরোপ থেকে আমদানি করে টাকশাল।

জানা গেছে, পিন ব্যবহারের কারণে টাকার নোট দ্রুত অপ্রচলনযোগ্য হয়ে পড়ায় এটি বন্ধ করা উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে পিন ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নির্বাহী প্রধানদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক তখন বলেছিল, তফসিলি ব্যাংক কোনো মূল্যমানের নতুন ও পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোটের প্যাকেট স্ট্যাপল করা যাবে না। এক হাজার টাকার নোটের ক্ষেত্রে ২০১৬ সালের আরেকটি নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। সেই নির্দেশনায় পিন ব্যবহারের সুযোগ রেখে ৫০০ ও এক হাজার টাকার নোটের কোথায় ও কত দূরে পিন লাগানো যাবে সে সম্পর্কিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ওই নির্দেশনায় বলা হয়, নোটের স্থায়িত্ব ও স্বকীয়তা বজায় রাখতে এবং গ্রাহকদের সুবিধার্থে পলিমার ব্যবহার করতে হবে।

২০১৯ সালের নির্দেশনায় আরও বলা হয়, সব নতুন ও পুনঃপ্রচলনযোগ্য নোট প্যাকেট ২৫ মিলিমিটার থেকে ৩০ মিলিমিটার প্রশস্ত পলিমার টেপ অথবা পলিমারযুক্ত পুরো কাগজের টেপ দিয়ে মোড়াতে হবে। তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের নোটের নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্বের অন্যান্য দেশে ব্যাংক নোট মোড়ানোতে ব্যবহৃত উন্নত প্রযুক্তির অনুসরণ করতে পারে। ওই নির্দেশনা এখনো কাগজে-কলমেই রয়েছে। ব্যাংকগুলো তাদের দৈনন্দিন লেনদেন বড় আকারের শক্ত স্ট্যাপলার পিন ব্যবহার করছে। এসব নোট সহজে আলাদা করা যায় না। এমনকি পিন থেকে ছাড়াতে হলে অনেক সময় টাকা ছিঁড়ে যায়।

একাধিক ব্যাংকারের সঙ্গে কথা বললে তারা স্বীকার করেন, বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর কোথাও টাকা এ ধরনের পিন ব্যবহার করা হয় না। পার্শ্ববর্তী ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, এমনকি মিয়ানমারেও টাকার বান্ডিলে কোনো ধরনের পিন ব্যবহার করা হয় না। মিয়ানমারের মুদ্রার মান কম হওয়ায় তাদের অনেক বেশি পরিমাণ নোট বহন করতে হয়। বেশি পরিমাণ নোট বহন করার পরও কোনো ধরনের পিনের ব্যবহার নেই। অথচ বাংলাদেশ চিত্রটি পুরোপুরি আলাদা। এখানে ছিদ্র ছাড়া কোনো বান্ডিল পাওয়া যায় না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘পিন ব্যবহারের কারণে টাকা দ্রুত নষ্ট হয়। আমরা সবগুলো ব্যাংককে কোনো ধরনের পিন ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছি। বাংলাদেশ ব্যাংকে ব্যাংকগুলো যে টাকা জমা দেয়, কখনো কোনো পিন ব্যবহার করা হয় না। এমনটি হওয়ার সুযোগ নেই। তবে বাইরে নিজেদের লেনদেনে এখনো কেউ পিন ব্যবহার করছে কি না তা আমরা সব সময় নজরে রাখছি। কোনো অভিযোগ পেলে, কোন শাখায় পিন ব্যবহার করছে এমনটি পেলে আমরা পদক্ষেপ নেব।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক যখন টাকা ইস্যু করে, কোনো বান্ডিলেই পিন ব্যবহার করা হয় না। তবে বিষয়টির ওপর আমরা নজরদারি করছি।’

বেসরকারি ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমরানুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পৃথিবীর কোথাও মুদ্রার বান্ডিলে স্ট্যাপলার পিন ব্যবহার করা হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা আছে টাকার নোট কীভাবে বান্ডিল করতে হবে। পলিমার বা রাবার ব্যবহার করতে হবে। তবে সচেতনতার অভাবে হয়তো কিছু শাখা এখনো পিন ব্যবহার করছে। এটা বন্ধ হওয়া উচিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তারা কাজের সুবিধার্থে হয়তো পিন ব্যবহার করেন। এটা অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত।

Print Friendly, PDF & Email