রায়পুরে ৯ মাসে পানিতে ডুবে ২২ শিশুর মৃত্যু

রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি :

দেড় বছরের আবদুল্লাহ। মা রান্না ঘরে কাজ করছিলেন- বাবা সকালেই দিনমজুরের কাজে বাড়ী থেকে বের হয়েছেন। বসতঘরের পাশের পুকুরে অন্য শিশুদের হাত-পা ধৌত করতে দেখে শিশু আবদুল্লাহও পুকুরের ঘাটে নেমে আর ফিরে আসলো না। পুকুরের পানিতে ডুবেই মৃত্যু হলো অবুঝ আবদুল্লাহর। ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর চরপাতা ইউপির গাজিনগর গ্রামে। সে ওই গ্রামের দিনমজুর হোসেনের ছেলে। তুলতুলে সুন্দর শিশুকে হারিয়ে মা-বাবাসহ প্রতিবেশিরা নির্বাক হয়ে পড়েছিলেন।

সচেতন না হওয়ায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার বেড়েই চলেছে রায়পুরে । কিন্তু-এটি ‘নীরব মহামারি’ রূপ ধারণ করে থাকলেও সচেতনমহল বলছেন, সরকারি বা বেসরকারি যেসব উদ্যোগ রয়েছে তা এর প্রতিকার ও প্রতিরোধে যথেষ্ট নয়।

শুক্রবার (১০ সেপ্টেম্বর)-সকালে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সুুত্রে জানাযায়, চলতি বছরের গত ৯ মাসে ২২ শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। আর প্রায় ২০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। গত বছরের ১০ মাসে পুকুরে ডুবে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৩৩ শিশু। তার মধ্য ৪৫ জন মারা যান।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাক্তার বাহারুল আলম বলেন, ২/৪ দিন পর পরপর মারা যারা যাওয়া শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসছে। অভিভাবকদের অ-সচেতনতাই এর জন্য দায়ি। তাদেরকে আরো বেশি সতর্ক থাকার অনুরোধ জানান ডাক্তারগন।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২ নভেম্বর রায়পুর পৌরসভার নতুনবাজারের খাজুরতলা নামক স্থানে দিনমজুর শাহজাহানের ছেলে মোঃ আহাদ (২), ৪ নভেম্বর চরমোহনা গ্রামের কৃষক তৈয়ব আলীর ছেলে আমির হোসেন (৪), ১৬ সেপ্টেম্বর চরকাচিয়া গ্রমের কৃষক আইয়ুব আলীর ছেলে মোঃ হাসান (৪),,১৪ অক্টোবর শাহচর গ্রামের দিনমজুর শাহজাহানের মেয়ে সুমাইয়া (৫) তার চাচাত বোন কামাল হোসেনের মেয়ে সুমী (৪) এক সঙ্গে এবং ১৯ অক্টোবর চরবংশী ইউপির চর ঘাসিয়া গ্রামের দিনমজুর জাকির হোসেনের ছেলে সিফাত (২) পুকুরে ডুবে মারা যায়। গত ১০ মাসে ১৩৩ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তির পর ৪৫ শিশু মারা যায়।

রায়পুরের আলোচিত মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে-গত বছরের ৩০ অক্টোবর পৌরসভার দেনায়েতপুর এলাকায় নানার বাড়ীতে বেড়াতে এসে দুই বোনের দুই ছেলে পুকুরে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে নিহত শিহাব (১৮ মাস) ও আবদুল্লাহ (২) দুই খালাত ভাই। তাদের নানা আবদুল কাদের বলেন, “আমার দুই নাতি সাঁতার না জানায় পুকুরে ডুবে মারা গেছে। তারা বলেছিল সাঁতার শেখাতে। সেটা করলে আজ হয়ত আমার সন্তানেরা বেঁচে থাকত।” এবং ২৬ জুন হায়দরগঞ্জ শহরের সাইয়্যেদ মন্জিলের ভিতরে পুকুরে শিশু ছেলে আরিয়া (৬) ও তার চাচাতো ভাই ফায়সালের ছেলে ফাইয়াজ হোসেন (৭) সাঁতার না জানার কারনে বাড়ীর ভেতরে পুকুরে এক সঙ্গে-ডুবে মারা যায়।

হায়দরগঞ্জ উপশহরের বিশিষ্ট আলেম ও সমাজ সেবক আলহ্বাজ মোঃ তাহের ইজ্জদ্দিন বলেন, আমাদের অভিভাবকদের খুব সচেতন হবে। তবেই পুকুরে পড়া থেকে শিশুদের রক্ষা কর সম্ভব। আমাদের প্রিয সন্তানকে একসঙ্গে হারিয়ে নীজেদের অপরাধি ও অসহায় বোধ করছি।

এছাড়াও অভিভাবকদের অসচেতনতার কারনে উপজেলার উত্তর চরবংশী, দক্ষিন চরবংশী, উত্তর চরআবাবিল, দক্ষিন চরআবাবিল, চরমোহনা ও বামনী ইউপিতে বেশি পরিবারের শিশুরা পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে বলে হাসপাতাল ও জনপ্রতিনিধিদের সুত্রে জানাযায়।

রায়পুর এলএম পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, “সন্তানকে সাঁতার শেখাতে ব্যক্তি উদ্যোগের কোনও বিকল্প নেই। ”অভিভাবকের উধাসিনতার কারনে শিশুরা পুকুরে ডুবে মারা যাচ্ছে। সামাজিক অবস্থায় ছেলেদের ‍উন্মুক্ত পরিবেশে সাঁতার শেখানো গেলেও মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয় বলেও জানান।”

উল্লেখ্য-শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু ঠেকাতে ২০১৫ সালের এপ্রিলে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সাঁতার প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনের ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছিলো সরকার।
একইসঙ্গে সব এলাকায় জলাশয়কে স্বাস্থ্যসম্মত ও সাঁতার উপযোগী করে তুলতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের সেই উদ্যোগ পরিপত্র জারির মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে আছে।

Print Friendly, PDF & Email