আরও উদ্বাস্তু, অনাহার, মানব-বিপর্যয়ে নিমজ্জিত আফগানিস্তান

মাত্র দশ দিনে একটা গোটা দেশ দখল। প্রেসিডেন্ট পলাতক। হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া। আফগানিস্তানে এত দ্রুত পরিবর্তনেরই কি কথা ছিল? কুড়ি বছরের প্রচেষ্টা, ২ ট্রিলিয়ন আমেরিকান ডলার অর্থব্যয়, ২৫০০ আমেরিকান সৈন্যের মৃত্যু, বা ৭০,০০০ নিরপরাধ আফগান মানুষকে হারানোর পরে এটাই প্রত্যাশিত?

মাত্র দশ দিনে একটা গোটা দেশ দখল। প্রেসিডেন্ট পলাতক। হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া। আফগানিস্তানে এত দ্রুত পরিবর্তনেরই কি কথা ছিল? কুড়ি বছরের প্রচেষ্টা, ২ ট্রিলিয়ন আমেরিকান ডলার অর্থব্যয়, ২৫০০ আমেরিকান সৈন্যের মৃত্যু, বা ৭০,০০০ নিরপরাধ আফগান মানুষকে হারানোর পরে এটাই প্রত্যাশিত?

৮৮ বিলিয়ন ডলার তো আমেরিকা খরচ করেছে শুধু প্রেসিডেন্ট আশরফ গনির সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করে, প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে সমর্থ করে তুলতে। তাই অনেক বিশেষজ্ঞই দাবি করেছিলেন, কাবুল দখলে তালিবানদের কমপক্ষে মাস তিনেক লাগার কথা। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বাইডেনও প্রত্যয়ী ছিলেন যে, তালিবানদের আনুমানিক ৭৫,০০০ যোদ্ধা কোনও ভাবেই আফগানিস্তানের তিন লক্ষেরও বেশি প্রশিক্ষিত সৈন্যের সঙ্গে তুলনীয় নয়। অথচ, এই রবিবারে যে ভাবে আমেরিকান কূটনীতিবিদ ও অন্য সরকারি কর্মীদের কাবুলে সে দেশের দূতাবাস থেকে হেলিকপ্টারে উদ্ধার করা হয়, তা অনায়াসে ১৯৭৫ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সায়গন শহরের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। সে দিনই বাইডেন বলেছিলেন, এমন তুলনা বাতুলতা। দূতাবাসের ছাদে হেলিকপ্টার নামিয়ে কর্মীদের উদ্ধার করার মতো ঘটনা আফগানিস্তানে ঘটবে না। বাস্তব এর পুরো বিপরীত।

সন্ত্রাসের লড়াইতে জয়ী হয়ে আফগানিস্তানে উদার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য নিয়ে দুই দশক আগে আমেরিকা ও নেটোর অন্তর্ভুক্ত পশ্চিমি দেশগুলি তাদের অভিযান শুরু করেছিল, সেই অভিযান যে অচিরেই পায়ের বেড়ি হয়ে দাঁড়াবে, ওয়াশিংটন দুঃস্বপ্নেও তা ভাবেনি। আমেরিকা-প্রশিক্ষিত বাহিনীর হতাশা এতটাই তীব্র, মনোবল এতটাই হীন, তা ছিল কল্পনাতীত। বস্তুত, সশস্ত্র, প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা বাহিনীর এই সদস্যেরা হয় বিনা প্রতিরোধে তালিবান জঙ্গিদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন, অথবা প্রাণের ভয়ে দেশান্তরি হয়েছেন।

এ বছরের ১৪ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট বাইডেন স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যেই সমস্ত আমেরিকান সৈন্য আফগানিস্তান ছেড়ে যাবে। সেই ঘোষণা অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হচ্ছিল। এই যুদ্ধ জয় যে অসম্ভব, ওয়াশিংটন তা উপলব্ধি করতে শুরু করে। যুদ্ধের কারণে অবিরত মৃত্যুমিছিল, অর্থনীতির উপরে ক্রমবর্ধমান চাপ, এবং গত বছর থেকে কোভিড অতিমারি আমেরিকার আফগান নীতিতে আরও দ্রুত রূপান্তর ঘটাতে শুরু করেছিল। তালিবানকে অগ্রাহ্য করে সসম্মানে আফগানিস্তান থেকে প্রস্থান অসম্ভব উপলব্ধি করেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে কাতারের রাজধানী দোহাতে আমেরিকা তালিবান নেতৃত্বের একাংশের সঙ্গে আলোচনা ও সমঝোতা শুরু করে। তবে, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির দাপটে প্রস্থান পর্ব ক্রমশই অগোছালো ও চটজলদি সিদ্ধান্তের শিকার হতে থাকে। প্রেসিডেন্ট বাইডেনও এই প্রস্থানকে গুছিয়ে তুলতে পারেননি, অথবা চাননি। ইঙ্গিত স্পষ্ট যে, মসৃণ প্রস্থান অসম্ভব মেনে দ্রুত অবশিষ্ট মান-মর্যাদা নিয়ে সরে পড়াই বিধেয় বলে মনে করা হয়েছে।

আমেরিকা ও পশ্চিমি নেতৃত্বের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় আফগানিস্তানের মানুষের স্থান সম্ভবত কখনওই ছিল না। ছিল নির্বিচারে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিকে সে দেশের মানুষের উপরে চাপিয়ে পরিত্রাতা সাজার এবং বিশ্ব সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ-সহ আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে সপক্ষে রাখা। চিনের ক্রমোত্থান এই নীতিকে আরও শক্তিশালী করে। আমেরিকার পূর্বতন সঙ্গী পাকিস্তান যে ভাবে ইদানীং ওয়াশিংটন-বিরোধী অবস্থান নিয়ে বেজিং-ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকার ঝটিকা প্রস্থানের কর্মসূচি তালিবান নেতৃত্বের নীতি বদল করেছে। চার দশকের অভিজ্ঞতায় পোড়-খাওয়া নেতারা আমেরিকাকে আলোচনার জটে আটকে রেখে, আফগানিস্তানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সুনিশ্চিত করার ছক কষেছে।

১৯৮৯-তে সোভিয়েট প্রস্থানের পরে মস্কো-ঘনিষ্ঠ আফগান সরকার অন্তত কয়েক বছর তালিবান-বিরোধী লড়াই চালিয়ে গিয়েছিল। পক্ষান্তরে আশরফ গনির সরকার যে নিছকই আমেরিকার পুতুল সরকার হয়ে উঠেছিল, তা আজ কঠোর বাস্তব। অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট পালানোর সময় বিমান-বোঝাই টাকা নিয়ে গিয়েছেন। উল্লেখ্য, তালিবানে ভক্তি না থাকলেও রাজনৈতিক ও সেনা নেতৃত্বের চরম দুর্নীতি সদ্য-প্রাক্তন আফগান সরকারের প্রতি দেশবাসীর ক্ষোভ বাড়িয়েছিল।

কারণ যা-ই হোক, তালিবানের আফগানিস্তান দখল সে দেশের মানুষের জন্য নতুন বিপর্যয়ের সূচক। পাঁচ দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের বলি হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। তালিবান শাসনে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা। নারী ও শিশুদের পরিস্থিতি আরও খারাপ। এই বছরের প্রথম সাত মাসেই আফগানিস্তানে যে চার লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হয়েছেন, তাঁদের আশি শতাংশই মহিলা ও শিশু। এঁদের বিপর্যয় বহুগুণ বাড়ারই আশঙ্কা। পশ্চিমের যে দেশগুলি এ দেশের মেয়েদের আধুনিক জীবন, কর্মসংস্থান ও আত্মমর্যাদার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তা ধূলিসাৎ। সোভিয়েত-পরবর্তী আফগানিস্তানে অন্তত নর্দার্ন অ্যালায়েন্স ও অন্য ছোট ছোট প্রতিরোধ তালিবানের প্রতিস্পর্ধী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এ বারে তেমন শক্তির অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া দুরূহ।

অতএব, আরও উদ্বাস্তু, আরও অনাহার, আরও মানব-বিপর্যয় আসন্ন। তালিবান নেতৃত্ব ইদানীং বিশ্বের কাছে নিজেদের অনেক নরমপন্থী ও বাস্তববাদী বলে তুলে ধরতে চেষ্টা করলেও কট্টর পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতায় প্রত্যাবর্তন আফগানিস্তানের পক্ষে অবশ্যম্ভাবী। মুখে সকলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নতুন সরকার গড়ার কথা তালিবান নেতারা বললেও, অতীত যদি দিশারি হয়, তেমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। পরমত-অসহিষ্ণু মনোভাবই ভবিষ্যৎ। এই পরিস্থিতিতে জনপরিসর থেকে মেয়েদের অস্তিত্ব মুছে যাওয়ারই আশঙ্কা, আইনের শাসনের বদলে কট্টর ধর্মীয় অনুশাসনই ভবিতব্য।

পরিবর্তিত এই পরিস্থিতিতে চিন-পাকিস্তান সমীকরণ তাৎপর্যপূর্ণ। বেজিং জানিয়েছে, আফগান মানুষের মতকেই তারা প্রাধান্য দেবে। রাশিয়াও তালিবানদের সঙ্গে দৌত্যে উৎসাহী। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা, আফগানিস্তানের মানুষ দীর্ঘ দিনের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেলেন। ইমরান খান জানেন, আমেরিকার প্রশ্রয়ে যে ভাবে ইসলামাবাদ খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ থেকে ওয়াশিংটনের জঙ্গি-বিরোধী ড্রোন আক্রমণের অনুমতি দিয়েছিল, তা বুমেরাং হয়ে যেতে পারে, যদি আফগানিস্তানের তালিবান আজ তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানকে মদত দেয়। তালিবান-ঘোষিত আফগান ইসলামি আমিরশাহির পরে পাকিস্তানেও তা প্রসারিত হওয়ার আশঙ্কা তো আছেই। পাক সেনা ও মোল্লাতন্ত্রের বলেই তো তাঁর সরকার।

উদ্বেগ ভারতেরও। আফগানিস্তানে নদীবাঁধ নির্মাণ, কাবুলে আধুনিক পার্লামেন্ট বিল্ডিং নির্মাণ বা জ়ারাঞ্জ-দেলারাম মহাসড়ক নির্মাণ-সহ সে দেশের সামর্থ্য সৃজনের নানা প্রচেষ্টায় দিল্লি ছিল পুরোভাগে। তা সত্ত্বেও আমেরিকা ও রুশ উদ্যোগে তালিবানদের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় কখনও ভারত ডাক পায়নি। ভারতের কিছু অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিবিদ ঘুরপথে আলোচনায় অংশীদার হতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই সবই এখন করুণ অতীত। বহু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আমেরিকা-নির্ভরতা এই অঞ্চলে দিল্লিকে ইদানীং কোণঠাসা করেছে। কূটনীতির প্রথম নিদান, সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখা সমীচীন নয়। সেই সারসত্যটি অনুধাবন করা অত্যন্ত জরুরি। যার উপরে আস্থা রাখা কঠিন, তেমন পরাক্রমশালী দেশের থেকে দুর্বল নির্ভরযোগ্য দেশের সঙ্গে জোট বাঁধা ভাল। আত্মম্ভরিতা নয়, বাস্তববাদিতাই ভবিষ্যতের দিশা।

লেখক: সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়।

Print Friendly, PDF & Email