অভিশপ্ত আগস্ট কেড়ে নিয়েছিল মানবতার দূতকে

মোহাম্মদ হানিফ হোসেন :

আগস্ট, বাঙালির শোকে ভারাক্রান্ত এক উদ্বেলিত মাস। হৃদয় ভারাক্রান্ত করে তোলার মাস। বাঙালির আবেগ আর শপথের মাস। বাঙালির শোককে শক্তিতে পরিণত করার মাস। অভিশপ্ত আগস্ট কেড়ে নিয়েছিল মানবতার দূত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে রাজধানী ঢাকায় সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের এই কলঙ্কিত অধ্যায়। ৪৬ বছর আগে এই দিনে জাতির পিতাকে সপরিবারে নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে ঘাতকচক্র। এদিন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, বাঙালির মহানায়ককে হত্যা করেছিল ক্ষমতালোভী নরপিশাচ কুচক্রী মহল। দিনটি আমাদের জাতীয় শোক দিবস। এই দিবসটি বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের কাছে শোক ও শক্তি সঞ্চয়ের একটি দিন। এটি ইতিহাসের সব নির্মম হত্যাকান্ডের বর্বরতাকে ম্লান করে দিয়ে জঘন্যতম হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্ত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যা কেবল একজন ব্যক্তির খুন নয়। এই হত্যাকান্ড একটি দেশ ও জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে দেয়ার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ। এখানে তিন পক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এই তিন পক্ষ হচ্ছে পরিকল্পনাকারী, হত্যাকারী এবং বেনিফিশিয়ারি। এদের পারস্পরিক যোগসাজশে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনাকারী, হত্যাকারী এবং বেনিফিশিয়ারিরা শেষপর্যন্ত সফল হয়নি। তারা মানুষ বঙ্গবন্ধুকে খুন করতে পারলেও বাঙালি জাতির চেতনার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারেনি, পারেনি জাতির ইতিহাস থেকে মুছে দিতে। পারেনি বাঙালি জাতির সংগ্রাম ও সাফল্যের ইতিহাসকে ম্লান করতে। কারণ, এই জাতিসত্তার প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে বঙ্গবন্ধু বিশ্বের মানচিত্রে একদিকে যেমন একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সৃষ্টি করেন, তেমনই মানবজাতির ইতিহাসে স্বাধীন বাঙালি জাতির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গবন্ধু ধনসম্পত্তির মালিক হতে চাননি। রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর পদের প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহও ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন বাঙালি জাতি যেন বিশ্বে মাথা তুলে মর্যাদার সঙ্গে লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বীরের জাতি হিসাবে টিকে থাকে। সেই স্বপ্ন আজ সত্যের দোরগোড়ায়। আজকের বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সমগ্র বিশ্বে এখন বাংলাদেশ একটি মর্যাদার নাম। এই দেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়। অপার সম্ভাবনার ক্ষেত্র। যতই দিন যাচ্ছে, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় ততই গতি বাড়ছে। গোটা বিশ্বের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু এখন অনুকরণীয় নাম। ক্ষণজন্মা বঙ্গবন্ধু যে জাতির হাজার বছরের লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, শোষণ ও পীড়িত জ্বালা মিটিয়ে শৃঙ্খলমুক্তির মধুর সাধ পাইয়ে দিয়েছিলেন। মানবতাবাদী মহলে যে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আদর্শ, ত্যাগ, মুক্তি, মানবতা, মহত্ত, ভালোবাসা, ক্ষমা ও বিদ্বেষহীন মহামানবতুল্য অনুপ্রেরণার এক দিকনিদর্শন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের বিচার হয়েছে। এটা স্বস্তির কথা হলেওÑ এখনও যারা বিদেশে পালিয়ে রয়েছে, তাদের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার সম্পন্ন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। শুধু তাই নয়, আজ দেশে-বিদেশে সর্বমহলে দাবি উঠেছে ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডের অন্তরালের চক্রান্তকারী ও যড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করে তাদেরও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক। গত বছর সেন্টার ফর রিচার্স অ্যান্ড ইনফর্মেশন (সিআরআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ১৯৭৫: সেটিং দ্য ক্লক ব্যাক’ শীর্ষক ওয়েবিনার-এ অংশ নিয়ে মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং যোগাযোগ নিয়ে তদন্ত হওয়া দরকার। তার মতে, হত্যাকান্ডে তাদের কী সংযোগ ছিল তা বাংলাদেশ ও মার্কিন জনগণের সামনে স্পষ্ট করা দরকার।

উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালে ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউয়ের দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধি ছিলেন লিফশুলজ। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড নিয়ে অনুসন্ধান করেছিলেন তিনি। নানা কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জিয়ার সম্পৃক্ততার বিষয়টি আজ স্পষ্ট। খুনি ফারুক-রশিদ বিবিসিতে যে ইন্টারভিউ দিয়েছে তাতে বলেছে, জিয়াউর রহমান উপ-সামরিক প্রধান ছিল, তার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ছিল, সম্পর্কও ছিল; সফল হতে পারলে তাদের সমর্থন দেবে, সঙ্গে থাকবে। মোশতাক-জিয়ার যে সখ্য ও সম্পর্ক এটা তো পরিষ্কার।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৩ আগস্ট ১৯৭৫ পূর্ব-সপ্তাহে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে জিয়ার দু’বার সাক্ষাত। ১৫ আগস্ট সকালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে জিয়া খুনী ডালিমকে বলেছিলেন,ণড়ঁ যধাব ফড়হব ধ ড়িহফবৎভঁষ লড়ন, শরংং সব, পড়সব ঃড় সু পধৎ. ১৫ আগস্ট দুপুরে জিয়াকে বঙ্গভবনে দেখা গেছে মোশতাকের সঙ্গে পরামর্শ এবং মন্ত্রিসভার সদস্য তালিকা প্রণয়নে স্বঘোষিত খুনীদের সাহায্য করতে।  ২৪ আগস্ট ৭৫ খুনী মোশতাক তাকে সেনাপ্রধান নিয়োগ করেন।  ১৫ আগস্ট থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত খুনী ফারুক-রশিদ গংয়ের নির্দেশে খুনী মোশতাক রাষ্ট্রপতির অভিনয় করেছেন আর ক্যান্টনমেন্টেও তাঁদের নির্দেশ মতো জিয়া চলেছেন। জেলহত্যার জন্য জিয়া-ফারুক-রশিদকে নির্দেশ দেন এবং তারা মোশতাককে ঢাকা জেলে ফোন করতে বাধ্য করে। জেনারেল জিয়া ১৯৭৬ সালের ৮ জুন বঙ্গবন্ধু ও জেল হত্যাকারী ১২ জনকে কূটনৈতিক মিশনের চাকরিতে নিয়োগ করেন। ব্যাংককে এক সাক্ষাৎকারে এবং ১৯৭৬ সালের ২ আগস্ট লন্ডন টেলিভিশনে এ্যান্থনি মাসকারেনহাস কর্তৃক গৃহীত খুনী ফারুক রশিদের সচিত্র সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়।

এতে তারা বলেছেন, ‘১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় জেনারেল জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত করে তারা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার অভিপ্রায় জানালে জিয়া বলেন, তোমরা জুনিয়র অফিসাররা আগ্রহী হলে এগিয়ে যেতে পার’। জিয়া সে সময় এবং পরবর্তী ৫ বছর বেঁচে ছিলেন; কিন্তু জিয়া এই বক্তব্যের প্রতিবাদ করেননি। এসব নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। কিন্তু একটা প্রশ্নের মীমাংসা বোধ হয় আজও হয়নি। সেটি হচ্ছে ২ থেকে ৭ নভেম্বর ৭৫ পর্যন্ত জিয়া কি আদৌ বন্দী ছিলেন? ফারুক-রশিদ কিন্তু তখনও বঙ্গভবন তথা ক্যান্টনমেন্টের হর্তাকর্তা। তাদের পালাতে সুযোগ দেয়া হয় ৬ নভেম্বর ৭৫। তাহলে সহজেই অনুমেয় ১৫ আগস্ট এবং ৩ নবেম্বর হত্যাকা-ে জেনারেল জিয়ার ভূমিকা কি ছিল?

যারা রাজাকার-আলবদর ছিল, বঙ্গবন্ধুর হত্যার স্বীকৃত খুনি ছিল, জিয়াউর রহমান কথিত বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে তাদের পুনর্বাসিত করেছেন। জেনারেল জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার যাতে না হয় সেজন্য ‘ইনডেমনিটি’ আইন পাস করেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দেশ-বিদেশে চাকরিও দিয়েছেন। পরে বেগম জিয়া তাদের সংসদ সদস্যও বানিয়েছেন। এমন কি ‘৯৬ সালের ১৫ ফেরুয়ারি নির্বাচনে বিরোধী দলের নেতা বানান। জিয়া এমন এক ব্যক্তি ছিলেন, যিনি সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের হত্যা করেছেন। সামরিক শাসন চাপিয়ে দিয়ে দেশ শাসন করেছেন।

খুনিরা নিজেই সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছে যে, জিয়াউর রহমানের মদদেই তারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। শুধু জিয়াই নয়, তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও খুনিদের মদদ দেয়াসহ একই কাজ করেছে। আর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধী, তারাই কিন্তু ক্ষমতাটা দখল করে। জিয়া এই খুনিদের পুনর্বাসনে সহযোগিতা করেছে। তারই পথ ধরে জেনারেল এরশাদও খুনিদের রাজনীতি করার অধিকার দিয়েছিলেন। আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া। ’৯৬ সালে আমরা যখন প্রথমবার ক্ষমতায় আসি তখন এই বিচারের রায়ের দিন খালেদা জিয়া হরতাল দেন। যাতে বিচারক আদালতে আসতে না পারেন। ২০০১-এ খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে এই খুনিদের আবারও পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এখন সময় এসেছে ইতিহাসের ১৫ আগস্ট হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা। তাহলেই ইতিহাসের নির্মম এই হত্যাকান্ডের পূর্ণাঙ্গ বিচার সম্পন্ন হবে এবং ইতিহাসের দায়মুক্তি থেকে বাঙালি জাতি কৌলষমুক্ত হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চিরঞ্জীব, তার চেতনা অবিনশ্বর। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে শেখ মুজিবুর রহমানের অবিনাশী চেতনা ও আদর্শ চির প্রবহমান থাকবে। জাতির পিতা চেয়েছিলেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যকে জয় করে বিশ্বসভায় একটি উন্নয়নশীল, মর্যাদাবান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ। এর পেছনেরও একটা ইতিহাস আছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য বাংলাদেশের জনগণের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতার হত্যাকা-ের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশকে ফিরিয়ে আনার জন্য বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

 ১৯৭৫-এর পর বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের হত্যা এবং আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মীদের ওপর নির্মম দমননীতির মাধ্যমে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে দুর্বল করে ফেলা হয়। শেখ হাসিনার দূরদর্শী, সাহসী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্রুত পুনর্গঠিত হয়। জনগণ ফিরে পায় ভোটাধিকার। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন এই অধিকার প্রয়োগ করে ক্ষমতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে আওয়ামী লীগকে। পাকিস্তানি ধারার পরিবর্তে দেশ পুনরায় এগিয়ে চলে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ধারায়। অর্থনীতি ফিরে পায় গতিশীলতা। তলাবিহীন ঝুড়ি দেশের অপবাদ ঘুঁচিয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বুকে উন্নয়নের রোল মডেল।

বঙ্গবন্ধুর উত্তরসুরি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। তাকে শক্র-মিত্র চিনতে হবে তাকে। কেউ যেন বঙ্গবন্ধুর নাম ভাঙিয়ে সুবিধা আদায় না করতে পারে এ দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি সম্মানার্থে কর্মীদের উচিত তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো নিপুণভাবে সম্পন্ন করা। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে এখনও অনেক চড়াইউৎরাই পার হতে হবে। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে কাজ করে যেতে হবে। এদেশকে একবিংশ শতাব্দীর যোগ্য করে গড়ে তুলে ধরতে হবে।

বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির চেতনায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু আলোকবর্তিকা, চেতনা ও শক্তি। এই শক্তিই আমাদের এগিয়ে চলার সোপান। জাতীয় শোক দিবসে জাতির পিতার আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক : রাজনৈতিক কর্মী

Print Friendly, PDF & Email