তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভারতীয় সহযোগিতা

হাসান ইবনে হামিদ

শ্রমনির্ভর থেকে জ্ঞাননির্ভর জাতিতে পরিণত হবার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পৃথিবীতে যে বিশাল জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে, বাংলাদেশ তার অংশীদার হতে চায়। নতুন ধরনের এই অর্থনীতিতে প্রবেশের মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সরকার সারা দেশে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। ই-গভার্ন্যান্স পদ্ধতি চালু, স্কুল-কলেজে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং আইটি পার্ক গড়ে তোলাসহ সরকারের নানামুখী কর্মযজ্ঞ দেশব্যাপী চলমান। নানা ধাপে এই ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের কার্যক্রম সরকার এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের প্রতিটি জেলায় আইটি পার্ক গড়ে তোলার ঘোষণা ইতোমধ্যে সরকার দিয়েছে।

বর্তমানে দেশের ৩৯টি জেলায় আইটি পার্ক নির্মাণাধীন। বর্তমানে সাতটি হাইটেক পার্ক বিনিয়োগের উপযুক্ত অবস্থায় আছে। এগুলো হচ্ছে কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি, ঢাকায় জনতা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, যশোরে শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, সিলেটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাইটেক পার্ক, চট্টগ্রামে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক, নাটোরে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার, রাজশাহীতে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার। দেশের বিভিন্ন পার্কে এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

এই হাইটেক পার্কগুলো সরাসরি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটাবে। এদিকে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ আইটি সেক্টরের উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি বিভাগ ও জেলায় হাইটেক পার্ক স্থাপন করার উদ্যোগ নিয়েছে। তার মানে বৃহৎ জনগোষ্ঠী যে এই হাইটেক পার্ক নির্মাণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের আওতায় আসবে তা পরিস্কার।

ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতে ভারত এবার হাইটেক পার্ক নির্মাণে বাংলাদেশকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে দেশের ১২টি জেলায় হাই-টেক পার্ক স্থাপন প্রকল্পে ভারত সরকার অর্থায়ন করছে। সম্প্রতি আইসিটি প্রতিমন্ত্রী ভারতের সাথে এক ভার্চুয়াল আলোচনাসভায় এসব তথ্য দিয়েছেন। গত ২৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ‘বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল সার্ভিস অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট ট্রেনিং সেন্টার (বিডিসেট)’ নামক একটি প্রকল্প স্থাপনে ভারতীয় অনুদানের লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

এই সমঝোতার আওতায় ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ ও আইসিটি শিল্পের বিকাশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ২৫ কোটি টাকা ভারতীয় অনুদান দেয়া হবে। এই প্রকল্পে মোট ৬১.০২৫৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে যার বাকী অংশ (৩৬.০২৫৯ কোটি টাকা) বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থায়ন করা হবে। এখান থেকে আগামী দুই বছরে প্রায় আড়াই হাজার প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবে। ইন্টারনেট অব থিংস, মেশিন লার্নিং, রোবোটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, এক্সটেনডেড রিয়ালিটি এবং অন্যান্য উচ্চতর বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। এ ছাড়াও ৩০ জনকে ৬ মাসের জন্য ভারতে আইসিটির উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য প্রেরণ করা হবে।

বাংলাদেশের বেকারত্ব নিরসনে ভারত সরকার যেভাবে এগিয়ে এসেছে তা নিঃসন্দেহে ধন্যবাদ ও প্রশংসা পাবার দাবি রাখে। কেননা হাইটেক পার্ক নির্মাণের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণের পথে হাঁটতে চাইছে বাংলাদেশ। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপ দিয়ে বাংলাদেশকে উন্নত দেশের তালিকায় নিয়ে যেতে চাইছে বাংলাদেশ সরকার। আর সেই পথে আমাদের বন্ধুর ন্যায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আমাদের জন্মবন্ধু ভারত। হাইটেক পার্ক শুধু যে স্কিলড কর্মীদের চাকরির নিশ্চয়তা দেবে তা কিন্তু না বরং প্রতিটি জেলায় এই পার্ককে কেন্দ্র করে যে কর্মযজ্ঞ শুরু হবে তাতে লাখো মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কালিয়াকৈরের হাইটেক পার্কের কথা, যেখানে প্রশাসনিক ভবন, হাসপাতাল, কাস্টম হাউস, স্কুল-কলেজ, ব্যাংক, শপিং মল, আবাসিক এলাকা, শিল্প এলাকা, কনভেনশন সেন্টার তৈরি করা হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে কালিয়াকৈর পার্কের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করতে একটি রেলস্টেশন স্থাপন ও শাটল ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। তার মানে এই পুরো অঞ্চলে লাখো মানুষকে ব্যবসার সুযোগও তৈরি করে দিচ্ছে এই হাইটেক পার্ক। বেকারত্ব নিরসনে বন্ধু দেশ ভারত আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে যা দুই দেশের আদি বন্ধুত্বের এক উদাহরণ।

আইসিটি খাতে ভারত সরকারের সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও পারস্পরিক সম্পর্ক আগের যেকোন সময়ের চেয়ে এখন অনেক উন্নত। আইসিটি খাতে ভারতীয় কোম্পানি বিশ্ব বাজারে জায়গা করে নিলেও বাংলাদেশ থেকে আইটি খাতের দশ লাখের বেশি দক্ষ জনবল নিয়ে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের মধ্যে আইসিটি খাতে ৫ বিলিয়ন ডলারের উপর রপ্তানি আয় করার আশা করছে বাংলাদেশ। এই খাতে বাংলাদেশ ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দ্বিপাক্ষিক ব্যবসায়িক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেলে তা উভয় দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আইসিটি খাতে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ সম্প্রাসারণে ভারতীয় হাইকমিশন, বাংলাদেশ সরকার এবং দু’দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়িক সংগঠন যদি একত্রিত হয়ে কাজ করতে পারে তবে দক্ষিণ এশিয়াতেই আইসিটি খাতে এক বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

সে লক্ষ্যেই এবারের ২৭ জুলাইয়ের ভার্চুয়াল সম্মেলনে ই-কমার্স, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আইটির ব্যবহার, সাইবার নিরাপত্তা, রোবটিক অটোমেশন প্রক্রিয়া, পর্যটন খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমাত্রা ও ব্লকচেইনের ব্যবহার, বড় তথ্য বিশ্লেষণ, সংযুক্ত ও ভার্চুয়াল বাস্তবতা, অ্যানিমেটেড ছবি নির্মাণ, সফটওয়্যার উন্নয়ন, ওয়েব ও মোবাইল অ্যাপ নির্মাণসহ প্রযুক্তি খাতের অন্যান্য ক্ষেত্রে উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা কিভাবে পারস্পরিক ব্যাবসা বৃদ্ধি করে পরস্পর লাভবান হতে পারেন সে বিষয়ে আলোচনা করেন উভয় দেশের আইসিটি খাতের ব্যবসায়ীরা। এভাবে দুই দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সামনে এগিয়ে গেলে আইসিটি খাতে উত্তরোত্তর সফলতা দ্রুতই আসবে।

হাইটেক পার্ক ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। এটা সত্যি যে, এতদিনে কমপক্ষে লাখ খানেক কর্মসংস্থান করার কথা ছিল। সেদিক থেকে আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে যেহেতু চাহিদা বেশি সেগুলোতে অগ্রাধিকার দেয়ার এখন সময়। লক্ষ্যের দিকে এগোতে হলে ফোকাস থাকতে হবে। দ্রুত ট্রেন যোগাযোগ প্রয়োজন হবে। ইন্ড্রাস্টি, একাডেমি ও সরকারের টাস্কফোর্স গঠন করে কাজ করতে হবে। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর প্রথম হাইটেক বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছিলো। যেহেতু হাইটেক পার্কের বিষয়টি শিল্পখাত ভিত্তিক তাই শিল্প ও প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

এটা করতে সময় লাগে। তাই দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে এই হাইটেক পার্ক নির্মাণ করছে সরকার যেখানে লাখ লাখ বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পাশে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত। আমাদের প্রত্যাশা, ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতে আগামী দিনগুলোতেও বাংলাদেশের হাই-টেক পার্কগুলোতে বিনিয়োগসহ আইসিটি খাতে সহযোগিতা আরও প্রসারিত করবে ভারত। ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব অমর হোক।

লেখক : রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

Print Friendly, PDF & Email