সব মানুষের জয় হোক এটাই তো আমরা চাই

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

প্রতিদিন মানুষ তার বিবেকের কাছে হারছে। তবুও জেতার অভিনয় করে যাচ্ছে। কেউ হারতে চায় না। এতটুকু ছাড় দিতে চায় না। সবাই জিততে চায়। জুয়ার নেশার মতো জেতার নেশা মানুষকে আঁকড়ে ধরেছে। জয়-পরাজয় একসময় খেলার মাঠে ছিল। অথচ এখন তা গড়াতে গড়াতে মানুষের জীবনের ভিতর প্রবেশ করেছে।

জাপানের নাগাসাকিতে ১৯৪৫ সালে নিউক্লিয়ার বোমা বিষ্ফোরণের পর একটা মর্মস্পর্শী ছবি তোলা হয়। অনেক আগের ছবি, ছবিটা এখন ইতিহাস। কারণ ইতিহাস জয় পরাজয় চিনেনা, ইতিহাস মানুষকে চিনে। মানুষের ভিতর বদলে যাওয়া মানুষকে চিনে, যাচাই করে তারপর পিরামিডের ভিতর রেখে দেয়।

ফটোগ্রাফার জো ও’ডোনেল তার ডাইরিতে ছবিটার ইতিহাস লিখে গেছেন। সংগৃহীত লেখাটা এমন ছিল, “দশ বছরের একটি বাচ্চাকে আমি হেঁটে আসতে দেখলাম। ছেলেটার পিঠে একটি বাচ্চা ছিলো। তখন আমাদের কাছে এসব খুবই সাধারণ ছিলো কারণ বাচ্চারা তাদের ছোট ভাই-বোনদের পিঠে বেঁধে খেলা করতো। তবে এই ছেলেটি অন্যসব বাচ্চাদের থেকে আলাদা ছিলো। খুব দরকারি কাজে ছেলেটি এখানে এসেছে আমি সেটা বুঝতে পারলাম। ওর পায়ে কোনো জুতো ছিলো না। মুখ ছিলো অনুভূতিহীন ও গম্ভীর। ওর পিঠের বাচ্চাটি এতটাই ঘুমে ছিলো যে মাথাটা পিছনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে ছিলো। ছেলেটা ভাইকে নিয়ে সেখানে পাঁচ কি দশ মিনিট দাঁড়িয়েছিলো। সাদা মাস্ক পরা কিছু লোক ছেলেটির কাছে এলো আর ছেলেটি শান্তভাবে দঁড়িটি খুলে বাচ্চাটিকে তাদের হাতে দিয়ে দিলো। ঠিক তখন আমি প্রথম বুঝতে পারলাম ছেলেটির পিঠের বাচ্চাটি মৃত ছিলো। সাদা মাস্কপরুয়াদের একজন শুধু বাচ্চাটির হাত ও পা ধরলো তারপর ছোট শরীরটাকে আগুনের উপর দিলো। ছেলেটা সেখানে দাঁড়িয়েছিলো কোনো নড়াচড়া না করে, ওর চোখ ছিলো আগুনের দিকে। সে নিচের ঠোঁট এত জোরেই কামড়ে ধরেছিলো যে ঠোঁট থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছিলো। সূর্যাস্তের মত করেই একটা সময় আগুনের তাপ কমে গেল। ছেলেটি আগুনের থেকে চোখ সরিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো তারপর চুপ করে হেঁটে চলে গেলো।”

ভাবা যায় কতটা নির্মম ছিল সে ঘটনা। অথচ মানুষ সে নির্মম ও মানবিক ঘটনাগুলোর কথা কখনো ভাবেনি। এখনো ভাবে না | মানুষ ভাবে কে জিতেছে, কে হেরেছে। কে বেশি ক্ষমতাধর, কে বেশি প্রভাবশালী, কার শক্তির রশিটা কত শক্তিশালী। কার কতটা অস্ত্র আছে, কার কতটা মরণাস্ত্র আছে। কারণ মানুষ সব সময় ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তির দাসত্ব করতে ভালোবাসে। দালালি করতে ভালোবাসে। ক্ষমতার বাইরে যে একটা মানবিক পৃথিবী থাকে মানুষ তা কখনো ভাবতে পারে না। সবাই জিতে, জয়ের আনন্দে মেতে উঠে অথচ সেখানে মানবতার মতো সূক্ষ্ম ও অনুভূতিশীল শক্তির যে পরাজয় ঘটে তা কখনো কেউ বোঝার চেষ্টা করে না। মানুষ লাল নীল তারাবাতির ঝলমলে আলো দেখে প্রলুব্ধ হয়। কিন্তু প্রাদ-প্রদীবের নিচে অযত্নে পরে থাকা বিন্দু বিন্দু আলোর অন্ধকারের সাথে লড়াইটা দেখে না। মাটিতে নুয়ে পরা মানবতার ক্ষয়ে ক্ষয়ে মৃতপ্রায় ঝুলন্ত শরীরটা দেখে না। যে চোখে মরিচা পরে, সে চোখ দেখতে পায় না। যে মনে স্বার্থের দাগ পরে, সে মন অনুভব করতে পারে না। মনস্তত্ত্ব তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ।

অথচ কেমন করে যেন মানুষের মনস্তত্ব বদলে গেছে। সে মনস্তত্ত্বে ভালো মন্দের বিচার নেই। জয় পরাজয় বোঝার শক্তি নেই। আলো অন্ধকার চেনার চোখ নেই। যে মানুষটা ঘুষ দিয়ে তার কাজটা আদায় করে নেয় সে মানুষটা নিজেকে বিজয়ী ভাবতে শুরু করে। যদিও সে জানে তার আত্মার মৃত্যু ঘটেছে। জেতার মতো করে অভিনয়ের ভাব হয়তো তার থাকে তবে সে জানে এটা তার অভিনয়, লোক দেখানো ভ্রান্তি বিলাস। একসময় অভিনয়টা বাড়তে বাড়তে তার দেহের ভিতর ঢুকে পড়ে, ভর করে, আত্মমগ্ন করে। তখন সে যে অভিনয় করছে সে বোধটুকু তার থাকে না। মানুষ থেকে সে অভিনেতা হয়ে যায়। ঘুনেধরা সমাজ লোকটাকে বুদ্ধিমানের মর্যাদা দেয়। অথচ যে লোকটা নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে ঘুষ দিতে পারেনি, একটার পর একটা লাল ফিতার পিছনে ছুটে ছুটে যার প্রাচীন দেহটা ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে। সে জানে সে সত্যের পথে আছে। সে বুঝে মিথ্যার পথে জেতাটা যত সহজ সত্যের পথে জেতাটা তত কঠিন। তারপরও তার কঠিন পিচঢালা রাজপথের যাত্রাটা থেমে থাকে না। বাজারের সস্তায় কেনা তার  পায়ের জুতোয় পচন ধরলেও তার মনটাতে তা পচন ধরাতে পারে না। সমাজ সে লোকটাকে বোকা ভাবে, উপহাস করে, অবহেলা করে। অথচ সে যে অভিনেতা নয়, সে যে মানুষ সেটা কেউ বুঝতে পারে না। জয় পরাজয়টা বুঝি এভাবেই বদলে যায়। জয় হয় পরাজয়, পরাজয় হয় জয়। যে মানুষটা ঘুষ খায় সে মানুষটা ঘুষ খাওয়াকে তার অধিকার মনে করে। যতই ঘুষের টাকায় তার পকেট ভারী হতে থাকে ততই সে নিজেকে নায়ক ভাবতে শুরু করে। সমাজ তাকে বিজয়ীর মর্যাদা দেয়। সমাজে তার কদরও বাড়তে থাকে। অথচ যে মানুষটা ঘুষ খাওয়াকে অপরাধ বলে মনে করে সবাই থাকে বোকা ভাবতে আনন্দবোধ করে। সমাজে তার কদর থাকে না। আমাদের সমাজে একটা ঘুষখোর মানুষ যতটা মর্যাদাবান হয় একটা সৎ মানুষ ততটাই অবহেলিত হয়। খুব অদ্ভুত এক বৈপরীত্যের মেরুকরণ। যেখানে অসতেরা বিজয়ী হয়, সতেরা পরাজিত হয়। মানুষের নির্বোধ বিচারে, ঘুনে ধরা দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতায়। মানুষ যতই মুখে বলুক না কেন সে ভালোত্বকে মর্যাদা দেয়, সেটা হয়তো মানুষের অভিনয়, বলার জন্য বলা একটা কথামাত্র। সেটা হয়তো তার মুখের উপরের মুখোশ। কারণ মানুষ সব সময় মন্দত্বকে প্রশ্রয় দিয়েছে, ভালোত্বকে লাঞ্চিত করেছে। মন্দত্বকে মাথায় তুলেছে  ভালোত্বকে বিসর্জন দিয়েছে। এটা অনেকটা নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি মানুষের আকর্ষণের মতো। ফেসবুকে একটা লেখা পেলাম। লেখাটা অনেকটা এমন :

সেখানে একটা প্রশ্ন ছিল, বর্তমান সময়ে শতকরা কতজন অফিসার সৎ, দক্ষ এবং চরিত্রবান আছে?

এই প্রশ্নের উত্তর যিনি দিয়েছেন তিনি বলছেন, “এই প্রশ্নের প্রকৃত ও গানিতিকভাবে সঠিক কোন উত্তর পাওয়া যাবে না। কারণ সততা পরিমাপের কোন সর্বজনগ্রাহ্য মানদণ্ড নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক বিশ্বিবদ্যালয়ের পুস্তক কেন্দ্রে এ সংক্রান্ত একটি বই কিনেছিলাম ২০১৭ সালের মে মাসে। বইটি এ মুহুর্তে হাতের কাছে নেই তবে সেখানে শতকরা কতজন মানুষ সৎ এ বিষয়ে একটি জরীপের কথা জানা যায়। সে তথ্য সহভাগ করার প্রয়াস:

জরীপ বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে প্রতি ১০০ জন মানুষের মধ্যে অন্তত একজন পাওয়া যাবে যিনি শত প্রতিকূলতায়ও সৎ থাকবেন। অন্তত একজন পাওয়া যাবে যিনি হাড়ে হাড়ে বজ্জাত অর্থাৎ অসৎ। বাকী ৯৮ জন পরিস্থিতিগত সৎ (Situational Honest)।”

আমরা এমনটার পরিবর্তন দেখতে চাই, যেখানে ১% মানুষ সৎ থাকবেনা, বরং ১০০% সৎ থাকবে। পরিস্থিতিগত কারণে সৎ থাকাটা প্রকৃত সৎ মানুষের পরিচয় বহন করে না। সমাজে এই পরিস্থিতিগত সৎ মানুষেরা বাকি ১% অসৎ মানুষের সাথে মিলে ৯৯% এ পরিণত হয়। তখন সমাজে বাকি ১% সৎ মানুষদের টিকে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ যদি সততাকে ধারণ করার মতো মানবিক আচরণ দ্বারা তাড়িত হয় তখন মানুষ পরিস্থিতিগত কারণে সৎ এটা আর বলা যাবে না। বরং উল্টোভাবে বলা যাবে, পরিস্থিতি যতই মানুষকে অসততার সুযোগ সৃষ্টি করে দিক না কেন মানুষ তাতে প্রভাবিত হবেনা বরং অসততাকে সততায় পরিবর্তন করবে। কারণ মানুষ যখন নিজের আত্মাকে জয় করতে পারে তখন কোনো নেতিবাচকতা মানুষকে জাপটে ধরতে পারে না।

আমি সমাজতত্ত্বের কথা বলছি না। তবে শ্রেণি বৈষম্যের কথা বলছি। এখানে উচ্চ বিত্তের শোষণের কারণে মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্তের শোষণের কারণের নিম্নবিত্তের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে শ্রেণিগত জয় পরাজয়ের একধরণের মানবিক সংকট তৈরী করা হয়েছে। যেটা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। তবে সে গবেষণার প্রকৃত ফলাফল যাতে জয় পরাজয়ের লড়াইয়ে হারিয়ে না যায়, বরং তা সমস্যা সমাধানের মূল উপাদান হিসেবে কাজ করে। সেটা যাতে আমরা চোখ দিয়ে দেখতে পারি।

তারপরও এমন জয় পরাজয়ের কতটা আমরা দেখতে পারি। মানুষ সবটা দেখতে পায়না। যতটুকু দেখে সেটার অনেকটাই অদেখা থেকে যায়। একটা অদৃশ্য খেলা সুতোর পর সুতোর টান দিতে দিতে কোথায় যে গিয়ে পৌঁছায় তা বোধ হয় বোঝাটা খুব কঠিন।  কিন্তু বুঝতে তো হবেই, জয় যেন জয় হয়, পরাজয় যেন পরাজয় হয়। ঝুলন্ত পেন্ডুলামের মতো জয় পরাজয় ঝুলছে একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে। সেটা যেদিকে ঝুলে থাকলে মানুষের ভালো হয় সেদিকেই ঝুলে থাক। কারণ সব মানুষের জয় হোক এটাই তো আমরা চাই।

Print Friendly, PDF & Email