লক্ষ্মীপুর-২ আসন : প্রবাসী পাপুল আউট, এডভোকেট নয়ন ইন

নজরুল ইসলাম জয় :

রাজনীতি একটি বহুমুখী শব্দ। যার মাধ্যমে দলীয় বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে ক্ষমতা বিষয়ক কর্মকাণ্ডের সমষ্টিকে বুঝায়। আর এই রাজনীতিতে উত্থান-পতন থাকবে এটি স্বাভাবিক। কিন্তু লক্ষ্মীপুরে প্রবাসী কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুলের উত্থান-পতনের গল্পটা ছিল একটু ভিন্ন। প্রবাস থেকে দানবির সেজে এসে হলেন স্থানীয় এমপি। এরপরই ছেড়েছেন নির্বাচনী এলাকা। অত:পর এমপির সাথে সাথে হারালেন খ্যাতি! দানবির থেকে হয়ে গেলেন ভিলেন। নির্বাচনী এলাকা থেকে “আউট” হয়ে মানব ও অর্থপাচারের দায়ে সেই প্রবাসেই এখন তাঁর কারাবাস।

স্থানীয়দের মতে, “আউট” হয়েছেন পাপুল, তাঁর আসনে “ইন” হয়েছে তৃণমুল থেকে উঠে আসা জনপ্রিয় নেতা লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এডভোটকেট নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন। কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপুর্ণ ভোটে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ৯৮ ভাগ ভোট বেশি পেয়ে পাপুলের আসনের নবনির্বাচিত এমপি এখন নয়ন।

পাপুলের উত্থান : গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, কাজী শহিদ ইসলাম ওরফে পাপুলকে ২০১৬ সালের ঈদুল আজহার আগে গ্রামের মানুষ চিনতেন না। গ্রামের বাড়ির সামনে মায়ের নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান করতে গিয়ে এলাকাবাসীর নজরে আসেন তিনি। দুই হাতে দেদার বিলিয়েছেন টাকা। এরপর স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সাংসদ নির্বাচিত হন। শহিদ একা নন, স্বামী–স্ত্রী দুজনই সাংসদ হয়েছেন। তিনি নির্বাচিত আর তাঁর স্ত্রী সেলিনা ইসলাম সংরক্ষিত আসনের সাংসদ। দুজনই সাংসদ হওয়ার পেছনে আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতার ভূমিকা ছিল। অথচ ৩০-৩২ বছর আগে গ্রাম ছাড়েন শহিদ। তখন তাঁর আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। বিদেশে গিয়ে আদম ব্যবসা শুরু করার পর হঠাৎ তাঁর উত্থান হয়েছে। গ্রামবাসীর কাছে তিনি দানবীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

এলাকার লোকজন জানান, ১৯৮৯ সালে একটি প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার (শ্রমিকদের তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে চাকরি নিয়ে কুয়েত যান তিনি। তখন তিনি ছিলেন অনেকটা নিঃস্ব। ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত দখলের কারণে তিনি দেশে ফিরে আসেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কাজী শহিদ আবার কুয়েতে যান। এ ক্ষেত্রে তাঁকে সহযোগিতা করেন বড় ভাই কাজী মঞ্জুরুল আলম। মঞ্জুরুল কুয়েত বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। এরপর থেকে কুয়েতের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আদম ব্যবসায় নামেন তিনি। লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত মানুষকে চাকরি দেবেন বলে কুয়েতে পাঠানো শুরু করেন কাজী শহিদ। মারাফি কুয়েতিয়া গ্রুপ অব কোম্পানির নামে তিনি জনশক্তি রপ্তানি শুরু করেন। অথচ একসময় এই প্রতিষ্ঠানটির কর্মী ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লক্ষ্মীপুর-২ আসনটি জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ নোমানকে ছেড়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ভোটের ৯ দিন আগে তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। তখন জোট নেতাদের নির্দেশে স্থানীয় নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী কাজী শহিদ ইসলামের জন্য কাজ করে। এমপি হওয়ার জন্য এই নেতাকর্মীদের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করে পাপুল।

পাপুলের পতন : কাজী শহিদুল ইসলাম পাপুল গত বছরের (৬ জুন) কুয়েতে মানব ও অর্থপাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হন। চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি ঘুষ কেলেংকারি ঘটনায় কুয়েতে পাপুলের ৪ বছর সাজা ও অর্থদণ্ড হয়। পরবর্তীতে পাপুলের ৪ বছর থেকে সাজা বাড়িয়ে ৭ বছর করেছেন আদালত। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ ফেব্রুয়ারি শূন্য হয় আসনটি। (৩ মার্চ) তফসিল ঘোষণা করে (১১ এপ্রিল) নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। করোনা পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় (১ এপ্রিল) নির্বাচন স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে আবারও (২১ জুন) নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। ওইদিন সকাল থেকে রায়পুর উপজেলার পৌরসভাসহ ১০ ইউনিয়নের ৭৩ কেন্দ্র ও সদর উপজেলার ৯ টি ইউনিয়নে ৬৩ কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট সম্পর্ণ হয়। ভোটে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পাটি। এদিকে আসনটিতে ঘাঁটি হলেও নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। এতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এডভোকেট নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন (নৌকা প্রতীক) ১ লাখ ২২ হাজার ৫শ’ ৪৭ ভোট পেয়ে নিরবে জয় লাভ করে। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ মোহাম্মদ ফায়েজ উল্যা শিপন (লাঙ্গল প্রতীক) পায় মাত্র ১৮শ’ ৮৬ ভোট। এখন পাপুল “আউট” হয়ে আসনটির নতুন সাংসদ হিসেবে “ইন” হয়েছে অ্যাডভোকেট নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন।

Print Friendly, PDF & Email