আইনের কঠোর প্রয়োগ জরুরি

মো. জিল্লুর রহমান  : শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে সব ধরনের খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিপণনের ক্ষেত্রে ভয়াবহ বিষের ব্যবহার চলছে। কীটনাশকের অবাধ ও অতি ব্যবহারে শিশুর করুণ মৃত্যু ঘটছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে জাতি পঙ্গুত্বের দিকে ধাবিত হবে। বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্য আইন বাস্তবায়নের দাবি করেছেন পরিবেশবাদীরা। বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে আইনটি প্রণীত হলেও এর বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। বিষমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্য আইন বাস্তবায়ন করা জরুরি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, আমরা ভেজাল খাবার খেতে খেতে আসল খাবারের স্বাদ হারিয়ে ফেলেছি। প্রতিনিয়ত মনে হয় যেন, আমরা জেনেশুনে বিষ খাচ্ছি। কী ফলমূল, আর কী মাছ-মাংস কিংবা শিশু খাদ্য, সবকিছুতেই ভেজাল।

Haque Milk Chocolate Digestive Biscuit

পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে খাবারে স্বজ্ঞানে-স্বেচ্ছায় ভেজাল মেশানোর কোনো ব্যবস্থা আছে কি না জানি না, তবে আমাদের দেশে এটা হরহামেশাই ঘটছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মনে হয়, কে কত ভেজাল মিশাতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ভেজাল মেশানোর পদ্ধতি উদ্ঘাটিত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে কিছু কিছু দুষ্ট ব্যবসায়ীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা এবং বড়জোর দু-এক সপ্তাহ করে কারাদণ্ড দিতে দেখি; কিন্তু এর বিপরীতে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন বা যারা ভেজাল মেশায় তাদের কোনো অনুশোচনা দেখতে পাই না। তাদের এ ভেজাল বা বিষপ্রক্রিয়ার ফলে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ লোক বিভিন্ন মরণঘাতী রোগ-ক্যানসার, আলসার, হার্ট অ্যাটাক, ব্রেন স্ট্রোক, রক্তে বিষক্রিয়া ইত্যাদি নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

আসলে খাদ্যে ভেজাল একটি জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমস্যাটি কেবল নিরাপদ খাবারের জন্য মানুষের অধিকারকে অগ্রাহ্য করছে তা নয়, বরং অসংখ্য জীবনঘাতী ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের জন্য জনস্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করছে। আমাদের ভবিষ্য

 প্রজন্ম খাদ্যে ভেজাল দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শারীরিক ও মানসিক প্রবৃদ্ধিতে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। ইস্যুটি মানব স্বাস্থ্যের ওপর ভেজাল খাবার গ্রহণের প্রভাব এবং এটি কীভাবে নির্মূল করা যায় সে সম্পর্কিত কর্তৃপক্ষের যথাযথ ভূমিকা উল্লেখ করে সর্বত্র প্রচার করা দরকার।

খাদ্য শুধু মানুষের জন্য নয়, বরং সব প্রাণীর শক্তির প্রধান উৎস। খাবারগুলো বিভিন্ন রুটে শরীরে গৃহীত হয় যা শক্তি আকারে বা টিস্যুগুলোর গঠনে পুষ্টি সরবরাহ করে। অন্যদিকে ভেজাল খাদ্য মানুষের হজম প্রক্রিয়াকে অচল করে তোলে। বাজারের মৌলিক খাদ্যসামগ্রী, যেমন মাংস, মাছ, ফলমূল, তেল, শাকসবজি, মসলা, বেকারি আইটেম এবং মিষ্টিজাতীয় সব খাবারের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক মিশিয়ে খাদ্য ভেজাল করা হচ্ছে। এই খাদ্য আইটেমগুলোর বিষাক্ত অবশিষ্টাংশগুলো শুধু শিশুদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করার পাশাপাশি লিভার, কিডনি এবং হূৎপিণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানব অঙ্গগুলোর ক্ষতি করে না; একইসাথে ক্যানসার, হেপাটাইটিস বি’র মতো মারাত্মক রোগও সৃষ্টি করে। অবাক করার বিষয় হচ্ছে, এটা কেবল খাদ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে নয়, জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল মেশানো হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্যের জন্য বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত খাবারের ভেজাল মহামারীতে পৌঁছেছে। ভোক্তা এবং খাদ্য বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এখন আমাদের খাদ্য তালিকায় ভেজালমুক্ত একটি নিরাপদ খাদ্য খুঁজে পাওয়া শুধু কঠিনই নয়, বরং দুর্লভ ও দুষ্করও বটে। কাঁচা শাকসবজি এবং ফলমূলসহ দুধ, দুধজাত পণ্য থেকে শুরু করে মাছ, মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার—প্রতিটি খাদ্যদ্রব্য দূষিত ও ভেজালযুক্ত এবং জীবনের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। খবরের কাগজে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের খাবারে ভেজাল দেওয়ার নতুন ফর্মুলা ও নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হতে দেখি। কার্বহাইড্রেড, ফরমালিন, ভারী ধাতু, রাসায়নিক, টেক্সটাইল রং, কৃত্রিম মিষ্টি, ইউরিয়া ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্যে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহূত হচ্ছে। বিষাক্ত রাসায়নিকের সঙ্গে খাবারগুলো দূষিত করা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির সৃষ্টি করছে, বিশেষত বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে সচেতনতার স্তর খুব কম এবং এই জাতীয় খাবারগুলো গ্রহণের তাৎক্ষণিক প্রভাবে ডায়রিয়ার মতো প্রাণঘাতী মারাত্মক রূপ (খাবারের বিষ) নিতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যের এই রাসায়নিকগুলো লিভার এবং কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে, ফলে অঙ্গহানি বা ক্যানসার তৈরি হয় এবং এভাবে অকাল মৃত্যুও হতে পারে। চরম সত্যটি হচ্ছে, সর্বস্তরের মানুষ বিষাক্ত রাসায়নিকের সঙ্গে ভেজালযুক্ত খাবার গ্রহণের বিপদ সম্পর্কে সচেতন ও জ্ঞাত, তবে এই জ্ঞানটি বাস্তবে প্রয়োগ ও অনুশীলন হয় না বললেই চলে। বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল দেওয়ার জন্য আইন ও বিধিবিধানের কোনো অভাব নেই। যেমন জাল লাইসেন্স, খাদ্যের নিম্নমান, নিম্নমানের অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের অভাব, খাদ্যে ভেজাল, খাদ্য অপরিষ্কার, খাদ্য প্যাকেজের বিষয়ে ভুল তথ্য, যে পণ্যগুলোর তারিখের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে সেগুলো বািক্র ইত্যাদি নানা দূষণ ও ভেজাল সহায়ক উপকরণ।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মতে, আমাদের জনসংখ্যার ষাট শতাংশ কিডনি রোগী। এ ছাড়া দেশে ৪৫ লক্ষাধিক লোক প্রতিনিয়ত ভেজাল ও দূষিত খাবার গ্রহণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত ৬৬ কোটির বেশি মানুষ ভেজাল খাবার গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছে এবং প্রতিদিন ৪ লক্ষাধিক এভাবে মানুষ ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছে। বেশ কিছুদিন আগে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা উৎপাদন আন্দোলন নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আয়োজিত মানববন্ধনের সময় এ ভয়ংকর তথ্যটি প্রকাশিত হয়েছিল। এ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা তৈরি করে এবং মানুষের মধ্যে কীভাবে নৈতিকতা এবং নৈতিকতার মান তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে।

এটির মতো আরো বিভিন্ন সংস্থা খাদ্য ভেজালের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি এবং ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় কাজ করছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, ফ্রেশ ফুড ফর অল (এফএফএ), কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর মতো অলাভজনক সংস্থাগুলো এর মধ্যে কয়েকটি। খাদ্যে ভেজাল রোধে সরকার বিভিন্ন আইন করেছে। এর মধ্যে আছে—ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, নিরাপদ খাদ্য সুরক্ষা আইন, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য এবং এসব আইনে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

তবে নির্ভরযোগ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সমস্যাটি সঠিক এবং যথাযথ প্রয়োগের মধ্যে যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বেশ কয়েক বছর আগে খাদ্য দূষণ ও ভেজাল প্রতিরোধে বাংলাদেশ জাতীয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। তবে তাদের দৃশ্যমান ও নির্ভরযোগ্য কার্যক্রম এখনো মাঠপর্যায়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আসলে এসব নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ সর্বদা মাঠপর্যায়ে সক্রিয় অবস্থায় থাকবে এবং বিক্রেতা বা উৎপাদনকারীদের দূষিত পণ্য বা খাবার বিক্রির জন্য দণ্ডিত করার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবে, এটাই সবার ধারণা ও বিশ্বাস। এ ছাড়া সবসময় এরা মাঠেঘাটে ঘোরাফেরা করবে এবং যেখানেই অনিয়ম দেখবে সেখানেই ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ভোক্তাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিস্তর ফারাক লক্ষ করা যাচ্ছে।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকা এমন একটি প্রধান শহর, যেখানে বিভিন্ন ভেজাল ও দূষণকারীদের সবচেয়ে বেশি অংশ বাস করে, বলা যায় দূষণ বা ভেজালকারীদের স্বর্গরাজ্য। এ দূষণ কখনো মানবসৃষ্ট, আবার কখনো শিল্পের নিঃসরণ বা বিষাক্ত পানির মিশ্রণ ইত্যাদি দ্বারা সম্পন্ন হয়। বাংলাদেশ সরকার এই দূষণ রোধে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলেও দোষীদের গ্রেপ্তারের জন্য যথাযথভাবে গুরুত্ব দে য়া হয় না। এজন্যই দূষণ ও ভেজালকারীরা দিনকে দিন প্রশ্রয় পাচ্ছে।

এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি হাইকোর্ট বেঞ্চ দুর্নীতি দমন কমিশনকে ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে দুধ, দই এবং গবাদি পশুর ভেজাল সম্পর্কে তদন্তপূর্বক দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে ভেজালজাত পণ্য এবং গবাদি পশুদের খাদ্যে সিসা, অ্যান্টিবায়োটিক, ব্যাকটেরিয়া, কীটনাশক বা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকারক অন্যান্য উপাদান আছে কি না তা খুঁজে বের করার জন্য। আদেশটি এই জাতীয় ভেজালের ক্ষেত্রে খুব প্রাসঙ্গিক বিষয় ছিল এবং এটি মূলত মানুষের স্বাস্থ্য এবং জীবনের ক্ষতির জন্য দায়ী। কিন্তু বিষয়টি কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে তা ভোক্তাদের কাছে খুবই দুর্লভ।

আসলে চরম সত্যটি হচ্ছে, আমরা দূষিত বা ভেজাল খাবার খেতে খেতে আসল খাবারের স্বাদটি হারাতে বসেছি। বিষাক্ত রাসায়নিকের সাথে খাবারের মিশ্রণ একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ এবং এই অপরাধীরা ভোক্তাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এই অসাধু অপরাধীদের কোনো অনুভূতিও নেই এবং তাদের কারো প্রতি দয়া দেখানো উচিত নয়। তারা প্রকৃতপক্ষে ঠাণ্ডা মাথার খুনি এবং বিষাক্ত, দূষিত ও ভেজাল খাবারের মাধ্যমে হাজার হাজার ভোক্তার জীবনকে বিষিয়ে তাদের নীরবে-নিবৃত্তে হত্যা করছে।

আসলে বিষমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা সবকিছুর ওপরে প্রথম প্রাধান্য হওয়া উচিত। কেননা এটি প্রতিটি জীবনের জন্য সর্বাধিক মৌলিক প্রয়োজন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের সংক্ষিপ্ত শাস্তি বা সচেতনতামূলক কর্মসূচি এই দোষীদের পক্ষে যথেষ্ট নয়, বরং যারা ইচ্ছাকৃতভাবে খাবারে বিষ মিশায় কিংবা ভেজাল পণ্য বাজারজাত করে, তারা মূলত মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। সুতরাং তাদের মৃত্যুদণ্ড বা প্রকাশ্যে ফাঁসির মতো কঠোর শাস্তির বিধান করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা উচিত। পাশাপাশি ভেজাল খাদ্যের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগসহ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে জনসচেতনতাও খুব জরুরি। আর এ কাজটি সরকারকেই করতে হবে জনগণের স্বাস্থ্য অধিকার রক্ষায়।

লেখক : ব্যাংকার

Print Friendly, PDF & Email