স্কুল তো বন্ধ! হেল্লাই রিশকা চালাই

নিজস্ব প্রতিবেদক :

‘আব্বা ও মা’রে লই আন্ডা (আমরা) দুই বইন (বোন) ও তিন ভাই। আব্বা ডাব বেচে (বিক্রি করে)। মা ঘরের কাম (কাজ) করে। এক বছর ধরি (যাবত) স্কুল তো বন্ধ। লেয়া-হড়া (লেখা-পড়া) বাল (ভালো) লাগে না। হেল্লাই রিশকা (রিকশা) চালাই। আন্ডা গরিব মানুষ। আন্নেরা বালা আছেন। সরকাররে কন না (বলেন) স্কুল খুলি (খুলে) দিতো। তাইলে (তাহলে) আর আন্ডা (আমরা) তিন বন্ধু রিশকা (রিকশা) চালামু (চালাব) না।’

শনিবার দুপুরে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর সরকারি হাসপাতালের সামনে আসে শিশু আনোয়ার হোসেন (১১)। সে উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী আখনবাজার এলাকার গাজিবাড়ির সিরাজ গাজির চতুর্থ ছেলে ও স্থানীয় চরলক্ষ্মী জনতা উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণি ছাত্র।

শিশু আনোয়ারে মতো আরেক শিশু অন্তর হোসেন। স্কুল বন্ধ থাকায় সে বাবা সেলিম মোতাইলের সঙ্গে নদীতে মাছ ধরে। এখন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় একই এলাকার আনোয়ারের সঙ্গে রিকশা চালানো শিখে। সে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। তারা তিন ভাই ও এক বোন।

একই এলাকার আরেক শিশু মো. রিপন (১২)। সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। বাবা কৃষক শাহ আলী খাঁ ও মা গৃহিণী কহিনুর বেগম। স্কুল বন্ধ থাকায় রায়পুর সরকারি হাসপাতালের সামনে খাবার হোটেলে কাজ করে। তারা দুই ভাই ও এক বোন। এদের মতোই আরও অনেক শিশু পেটের দায়ে শ্রম দিচ্ছে।

রিকশাচালক শিশু আনোয়ার জানায়, এক বছর ধরি (যাবত) স্কুল বন্ধ। লেয়া-হড়া (লেখা-পড়া) বাল (ভালো) লাগে না। ডেলি (প্রতিদিন) ৫০০-৬০০ টেয়া (টাকা) ভাড়া হাই (পাই)। আব্বা-আম্মা না করে রিশকা (রিকশা) চালাইতো না। আঁর তোন বালা লাগে না। স্কুলে যাইলে (গেলে) হত্তেগদিন (প্রতিদিন) আব্বা ১০ টেয়া (টাকা) করি দিতো। এহন দেয় না। হেল্লাই রিশকা চালাই। যেডা হাই (যা ভাড়া পাই) হেত্তোন (সেখান থেকে) আব্বা ও আম্মারে কিছু দেই। মইদ্দে মইদ্দে (মাঝে-মাঝে) হিডা লাগাই দেয় (মারধর করে)। আন্ডা (আমরা) গরিব মানুষ। আন্নেরা (আপনারা) তো বালা (ভালো) আছেন। সরকাররে কন না (বলেন) স্কুল খুলি (খুলে) দিতো। কত্ত (অনেক) মজা করতাম।

রায়পুর এলএম পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্তের পর ২০২০ সালের ১৭ মার্চ সরকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে। পর্যায়ক্রমে সবকিছু খুলে দিলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়টি বারবার পিছিয়েছে। আবারো স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে ৩০ জুন করা হয়েছে। এমনিতেই শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার খুব বেশি। করেনাকালে ঝরে পড়ার হার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে শিশুশ্রমের মাত্রাও ভয়াবহ হারে বেড়ে যাচ্ছে। কম বয়সে শিশুরা নানান অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে কিশোর অপরাধ, কিশোর গ্যাংসহ সামাজিক অবক্ষয় সৃষ্টি হচ্ছে।

আবদুল মান্নান নামের এক অভিভাবক বলেন, দীর্ঘ এক বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ফলে শিক্ষার্থীদের সামাজিকভাবে গড়ে না ওঠার ক্ষতি এবং মানসিক ক্ষতি বিবেচনায় এনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্তই মনে হয় যুক্তিযুক্ত। শিক্ষকদের যেহেতু করোনা টিকার আওতায় আনা হয়েছে এবং বেশির ভাগ শিক্ষকই ইতোমধ্যে টিকা গ্রহণ করেছেন, তাই স্কুল ও কলেজ খোলার বিষয়ে একটি বড় বাধা অপসারিত হয়েছে। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা কোনোক্রমেই আর গ্রহণযোগ্য নয়।

উল্লেখ্য, রায়পুর উপজেলায় ১৬৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৯৩টি কেজি স্কুল, ৫৩টি মাধ্যমিক ও ৭টি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। তার মধ্যে দুটি কেজি স্কুল গত ৮ বছর পরিচালনার পর করোনার সময় আর্থিক ক্ষতির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। তাই এসব শিক্ষার্থীরা কেউ বিদেশ, কেউ দিনমজুরি, কেউ হোটেলে, কেউ অলস সময় পার করছে। কেউ বখাটে হয়ে গেছে।

Print Friendly, PDF & Email