ছাগল পালন করে কোটিপতি রায়পুরের রাসেল

তাবারক হোসেন আজাদ, লক্ষ্মীপুর: :

মনের ভেতরে ব্যাংকার হওয়ার ইচ্ছা থাকলেও ছাত্রজীবনে বাবার কারনে মেডিকেলে পড়তে হয়েছে। সে সময় থেকে তিনি বাবার কাছ থেকে ১০-২০ করে টাকা করে জমিয়ে ২০ হাজায় টাকায় একটি ছাগল কেনেন। ওই ছাগল থেকে ৩ টি বাচ্চা হয়। বাচ্ছা বিক্রি করেন এক লাখ টাকা।

সেখান থেকে আরো কিছু জমানো থেকে ২ লাখ টাকা দিয়ে একটি শংকর জাতের গাভী কেনেন ও দুটি ছাগল কেনেন তিনি। সেই থেকে গরু ও ছাগল পালনের যাত্রা শুরু তার।

১২ বছরে আগের শখ থেকে নেশা, নেশা থেকে জয় করে বর্তমানে তিনি কোটি টাকা মূল্যের ৫০টি ছাগল ও ২৫টি গরুর মালিক। তার খামারের নাম ‘রাসেল ডেইরি ফার্ম। গরু পালন, দুধ বিক্রি, গোবর, বায়োগ্যাস প্লান্ট, কেঁচো দিয়ে জৈবসার প্রস্তুত করে আজ তিনি প্রতিষ্ঠিত খামারি। ঢাকায় একটি প্যাথলজিতে টেকনেশিয়ান চাকুরি করেন। প্রতি শুক্রবার ও শনিবার বাড়ীতে এসে পরিবারের সদস্যের নিয়ে খামারটির পরিচর্যা করেন।

শুক্রবার (২১ মে) লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার মেঘনা নদী অধ্যুষিত চরাঞ্চল এলাকা, উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের চরবংশী গ্রামের রাসেল ডেইরি ফার্ম ঘুরে এতথ্য জানা যায়।

উত্তর-চরবংশী গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান যুবক রাসেলের গরু ও ছাগল পালন দেখে অনেকেই উদ্বুদ্ধ। তার পরামর্শ নিয়ে ওই গ্রামের অর্ধশতাধিক বেকার এখন খামার করার প্রক্রিয়া।

সরেজমিন গিয়ে রাসেলের ডেইরি ফার্মে দেখা যায়, প্রায় ৪০ শতাংশ জমির উপরে খামার গড়ে তুলেছেন রাসেল। সারি সারি বাঁধা রয়েছে বকনা গরু ও ছাগল। একটি গাভী ও একটি ছাগল থেকে বংশবৃদ্ধি। সেই ২০১০ সালে ফিজিয়ান জাতের একটি গাভী থেকেই প্রজনন সম্প্রসারণ শুরু। বর্তমানে খামারে ২টি ষাঁড়, ১৫টি গাভি ও ১০টি বাছুর সর্বমোট ২৫টি গরু। এখানে একই জাতের গরু, অন্য কোনো জাত নেই। বর্তমানে দুধ দিচ্ছে ১৫টি গাভী। প্রতিদিন ১০০ লিটার দুধ দেয় তারা। গাভীর বাছুরগুলোকে যত্নে রাখা হয়েছে যেন কোনো রোগবালাই না হয়। তার ফার্মে ১০ হাজার টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা মুল্যের ছাগল রয়েছে।

নিজ বাড়িতে তিনি দেশীয় জাতের ব্লাক ব্যাঙ্গল ছাগল, মোরগ-মুরগি, কবুতর পালনও শুরু করছে। আরো বড় পরিসরে খামার বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন রাসেল। সবকিছুই বেশ পরিপাটি।

গরু ও ছাগলের সফল খামারি রাসেল ঢালি তার অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, ইচ্ছে ছিল ব্যাংকার হবো। কিন্তু মেডিকেল লাইনে পড়তে গিয়ে স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। আজ খামারের পরিধি বেড়েছে অনেক। খামারে গাভীন গরুর সংখ্যা বেশি। বর্তমানে ১৫টি গাভী থেকে ১শ লিটার দুধ বিক্রি করা হয় ১৫ হাজার টাকা। খামারের বাছুরই হলো লাভের অংশ। বছর শেষে ৪০টি বাচ্চা হয় সাধারণত। বাছুর থেকে আয় হয় প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। বর্তমানে সর্বসাকুল্য তার দেড় কোটি টাকার গরু ও ছাগল রয়েছে। তার খামারে বোয়ার, তোতাপুরি, হারিয়ানা, বিটল, শিরহি ও যমুনাপারি নামের জাতের ছাগল রয়েছে। তার খামারে পিতা, মাতা, স্ত্রী, ভাইসহ ৫ জন কর্মচারি সহযোগিতা করে । তার সাথে সরকারি সহযোগিতা পেলে খামারটা বড় করতে পারবেন।

বর্তমান আগ্রহী তরুণ গরু খামারিদের উদ্দ্যেশে রাসেল বলেন, গরুর বা ছাগলের মালিকের ভবিষ্যৎ হলো বাছুর। যে মালিক বাছুরকে দুধ খাওয়ালো না, সে সম্পূর্ণই আয় থেকে বাদ পড়লো। যে বাছুরকে দুধ খেতে দিলো, গাভী মালিকের লাভ একটু যদি কমও হয় তবুও তার ইনভেস্ট হলো। আর যদি কেউ আমার মত সফল খামারি হতে চায়, খামারের পরিসর বাড়াতে চায় অবশ্যই যে বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে, তা হলো- যদি দুটি করে গরু বাড়ে তাহলে দুটি করে গরুর থাকার ঘরের ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে। গরুর দুধের দাম কম, খাদ্যের দাম বেশি তাই খরচ কমাতে খাদ্যের জন্য একটু প্রযুক্তি নির্ভর হতেই হবে। কাঁচা ঘাসের কোনো বিকল্প নাই। খরচ সাশ্রয় হলে কৃষক লাভবান হবেন।।
যুক্তরাজ্য ফেরত হবে*

রায়পুর শহরের বাসিন্দা যুক্তরাজ্য ফেরত কামরুল আল মামুন বলেন, রাসেল-একজন সফল খামারি। মূলতঃ রায়পুর শহরের মানুষের কাছে মানসম্পন্ন খাঁটি দুধ এবং দুগ্ধজাত পন্য পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই ‘গোয়ালাস ডেইরিজ’ নাম দিয়ে রাসেলের কাছ থেকে দুধ নেয়া শুরু করি। বাজার মূল্যে এরকম খাঁটি দুধ পাওয়াতে ভোক্তাদের কাছেও এ দুধের জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়াও আমাদের নিজস্ব কারখানায় এ দুধের তৈরী সর দই এর ব্যাপক চাহিদা তৈরী হচ্ছে। আমি এবং আমার ব্যাংকার বন্ধুও এরকম একটি গরু ও ছাগলের খামার দেয়ার পরিকল্পনা করেছি,যাতে করে আরো বেশি মানুষের কাছে খাঁটি দুধ পৌঁছে দেয়া যায়।

রায়পুর উপজেলার চরবংশী ও চরআবাবিল ইউনিয়নে এখন কম-বেশি একটি করে ছোট্ট খামার সবারই বাড়িতে রয়েছে। রাসেলকে দেখে সবাই উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। রাসেল ঢালি ব্যাংকার হতে চেয়েছিলেন? মেডিকেলে ভর্তির কারনে তা পারেননি। একমাত্র ছেলেকে উচ্চশিক্ষিত করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবেন। কেউ দূধ বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন, আবার কারো বছর শেষে গরু বিক্রি করেও আয় হচ্ছে লাখ টাকা। কেউ পরিবারে ছোট ভাই-বোনদের পড়াশোনার খরচ যোগাচ্ছেন। নিজের গ্রামে বেকার যুবকদের উদ্বুদ্ধ কর রাসেল। হাতে কলমে ট্রেনিং নিয়ে আজ স্বাবলম্বী কিছুটা।

রায়পুর উপজেলার মেঘনা নদীর চরাঞ্চল খ্যাত উত্তর চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের সফল চেয়ারম্যান (ইউপি) হোসেন আহাম্মদ জানান, বর্তমান কৃষিতে সাফল্য অর্জন করেছেন অনেকে। তাই সরকারের কাছে প্রত্যাশা চরবংশীতে এখন যে পরিমাণ দুধ উৎপাদন হয়, সে পরিমাণে দুধ বিক্রির করার জায়গা নেই। যদি সরকারিভাবে এই অঞ্চলে একটি দুগ্ধ শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেত। দুধ থেকে সাধারণত যে সব খাদ্য তৈরি হয় তা ক্রয় করতে এই চরবংশীর মানুষকে আর বাইরে যেতে হবে না। দরকার সরকারের একটু স্বদিচ্ছা।

রায়পুর উপজেলা প্রানী সম্পদ কর্মকর্তা আতাউর রহমান  বলেন, রাসেল ঢাকায় একটি প্যাথলজিতে চাকুরির পাশাপাশি দু’দিন বাড়ীতে থেকে গরু ও ছাগলের খামার করা, অসাধারন। আমরা মুগ্ধ। প্রায় প্রতিদিনই তার খামারের খোঁজ নেয়া হয়। গরু ও ছাগলগুলোকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়। তার দেখায় অনেক যুবকও হাসপাতালে এসে পরামর্শ নিয়েছে। সরকারের কাছ থেকে রাসেলকে সহযোগিতার জন্য আমরাও চেষ্টা করবো।

Print Friendly, PDF & Email