তারপরও সব অন্ধকার নির্বাসিত হোক আলোর উত্থানে

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

মানুষ খুব জটিল একটি বিষয়। মানুষের মনস্তত্ব তার থেকেও জটিল। এক একটা পরিবর্তনে মানুষের এক এক ধরনের রূপান্তর ঘটে। রংবেরঙের একটা আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে মানুষ ভাবে তার একটা পরিচয় আছে। অথচ এই মানুষটা  যখন মরে যায় তখন সে আর মানুষ থাকে না। সবার কাছে সে একটা লাশ হয়ে যায়। তখন তার বাবা মায়ের দেওয়া নামটাও মানুষ আর মুখে আনে না। তার মানে যতক্ষণ জীবন ততক্ষণ মানুষ। ততক্ষণ মানুষের অস্তিত্ব। জীবনটা উড়াল দিলেই মানুষটা আর মানুষ থাকে না, হয়ে যায় একটা লাশ। যে লাশটা কিছুক্ষণ আগেও মানুষের সাজানো পৃথিবীর মানুষ ছিল। মানুষের কাছে এই তো মানুষের মূল্য। হয়তো এমন করেই মানুষের মূল্য শোধ করতে করতে একদিন মানুষ মূল্যহীন হয়ে যায়। যেদিন মানুষ মূল্যহীন হয় সেদিন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে পালিয়ে যায়। যেমন মানুষ জীবন যন্ত্রণায় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পালিয়ে বেড়ায়। পৃথিবীতে মানুষের রূপান্তরটা খুব অদ্ভুত। সময় যত গড়ায় মানুষের বয়স তত কমতে থাকে। কারণ ততই মানুষ মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হয়। জন্ম থেকে মানুষের বড় হওয়াটা আমরা বিবেচনা করি। এটা হয়তো প্রথাগত একটা নিয়ম।

অথচ মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মানুষের ছোট হওয়াটা বিবেচনা করা উচিত। যদিও মানুষের মৃত্যুটা খুব অনিশ্চিত। খুব রহস্যাবৃত। তবে সেটা যেটাই হোক না কেন মৃত্যু অবধারিত। মানুষ খুব সাধ করে সংসার গড়ে। সে সংসার আলো করে সন্তানরা  জন্ম নেয়। যে মানুষেরা একসময় মানুষ ছিল। সে মানুষেরা সন্তান জন্ম দিয়ে সন্তানের মা-বাবা হয়ে যায়। খুব অদ্ভুত জীবনের একটা রূপান্তর ঘটে। অনেকটা জাদুর মতো। মা-বাবার পরম ভালোবাসার বন্ধনে আবৃত হয়ে সন্তানরা বড় হয়। তারাও সংসার গড়ে। মা-বাবার মতো পরম আপনজনরা কেমন করে যেন রং বদলের খেলায় পর হয়ে যায়। তখন মা-বাবা আর মা-বাবা থাকে না বুড়া-বুড়ি হয়ে যায়। বোধশক্তিটা মানুষের তখন বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আপনজনকে মুখ দিয়ে ডাকা প্রিয় শব্দরা কেমন যেন পরিবর্তনের দমকা বাতাসে আঘাত খায়, পাখা ঝাপটায়। কি জানি, সব কেমন যেন বেমানান। হয়তো পৃথিবীতে কেউ কারো না। মানুষ তার স্বার্থের প্রয়োজনে সম্পর্ক গড়ে। আবার স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে সম্পর্কে ফাটল ধরায়। সব মানুষ কি এমন নাকি অমানুষের ভিতরেও মানুষ থাকে। যে মানুষটা নিজের মুখটা  নিজে দেখতে পায়, নিজের মুখটা  দেখার জন্য যার আয়নার দরকার হয় না তেমন অপ্রাসঙ্গিক মানুষটাই মানুষ থেকে যায় আমৃত্যু। বড় বড় পদ পদবি দিয়ে মানুষ এখন বড় হয়, সৃজনশীল মানুষ এখন মূল্যহীন। তবে সে পদের বিনিময়ে তাকে যা করতে হয় সেটা অদেখা থেকে যায় মানুষের কাছে। কিন্তু যে মানুষটা এই অসম সমঝোতাটা করে সে জানে সে কতটা পথচ্যুত হয়েছে। মানুষ থেকে কতটা অমানুষ তাকে হতে হয়েছে। এতটা তাকে দিতে হয়েছে তার থেকে বেশি নিতে তাকে এতটা নিচে নামতে হয় তখন তার মনুষত্বটা মরে যায়। এটা এমন এক মরণ নেশার খেল যে খেলায় মানুষ ক্রমাগত অর্থের দাস হতে থাকে। সবাই হয়তো জানে, বুঝতেও পারে তবে না জানার অভিনয়টা মানুষ এখন ভালোই রপ্ত করেছে।

সে মানুষটা ততক্ষণ মানুষের কাছে মানুষের থেকে বড় যতক্ষণ তার দুর্নীতির খবর ফাঁস না হয়। যখন দুর্নীতির খবরটা সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসে তখন সে বড় মানুষটা মানুষের কাছে মূল্যহীন হয়ে যায়। তখন তার পদের নামটা আর থাকে না সেটা তখন দুর্নীতিবাজ নাম হয়ে উল্টে পাল্টে যায়। হামাগুড়ি খায়। ডিগবাজি খায়। এমনটাই তো ঘটছে সমাজে। যেখানে বিবেক বিক্রির জন্য দর কষাকষি চলছে। তবে সবাই তো এমন না। অমানুষদের ভিড়ে মানুষরাও থাকে, তারা পদের পিছনে দৌঁড়ায় না, পদ তাদের পিছনে দৌঁড়ায়। তবে সবটাই মানুষ দেখে না, যেটা মানুষ দেখে সেটাও মানুষ দেখে না। খুব অদ্ভুত ধাঁধা। জীবনের পরীক্ষার মতো। যার প্রশ্ন আছে অনেক, উত্তর নেই। সব কেমন যেন চুপচাপ। সবাই কি তবে বোবা হয়ে গেছে। কেউ যেন সত্যটা বলতে পারছে না। মানুষ থেকে বোবা মানুষের রূপান্তরের অভিনয়। খুব অদ্ভুত তবে বিস্ময়কর নয়।

একটা সমাজে সবারই যদি কোনো না কোনো বিষয়ে দুর্বলতা থাকে।তবে পচন ধরা মেরুদণ্ডে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার কেউ তো থাকবে না। খুব ভয় এখন মানুষের মধ্যে। অন্যের অসত্য প্রকাশ করলে তার অসত্য বেরিয়ে  পড়বার ভয়। অন্যের অনৈতিকতা ধরতে গেলে তার অনৈতিকতা বেরিয়ে পড়ার আশঙ্কা।এক একজন মানুষ এক একটা অসত্য আর অনৈতিকতার রশি টানাটানি নিয়ে ব্যস্ত। এমন টানাটানির ভাঙন থেকে কখন যে কার মুখ থেকে মুখোশটা খুলে বেরিয়ে পড়বে তা কেউ জানে না। সবাই  এমনটা না হলেই ভালো। সবটা মন্দ এমনটা না হলেই ভালো।

অদ্ভুত এক সময় দেখছি। যেখানে মানুষকে চিন্তা,  যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে মূল্যায়ন করার কথা সেখানে মানুষকে সংখ্যার জোর দিয়ে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। মানব সভ্যতার চরম বিকাশের সময় এমন ধরনের ধ্যান-ধারণা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। এ ধরনের মানসিকতা বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার উৎকর্ষতাকে নিরুৎসাহিত করে যুক্তিহীন দলবদ্ধতা ও গোষ্ঠীবদ্ধতার জন্ম দিতে পারে। যার প্রভাব হতে পারে সুদূর প্রসারী এবং এর ফলশ্রতিতে আগামীতে চিন্তাশক্তি শুন্য মাথাবিহীন প্রজন্মের সৃষ্টি হতে পারে। যাদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা থাকবে না। উদারভাবে  চিন্তা করার মানসিক শক্তি তৈরি হবে না। তখন কি ঘটতে পারে। তখন যা ঘটতে পারে তার ফলাফল অনেক ভয়াবহ হতে পারে। তবে ভয়কে জয় করাই তো মানুষের প্রবৃত্তি। মানুষের স্বপ্ন। মানুষের ধর্ম। মানুষের বর্ম।

সব যেন রূপান্তর। সব যেন পরিবর্তন। সব যেন অভিনয়। সব যেন রঙ্গমঞ্চ। সব যেন অদৃশ্য হাতের পুতুল নাচ। তারপরও সব অন্ধকার নির্বাসিত হোক আলোর উত্থানে। জেগে উঠুক মানুষ আপনা মাঝে শক্তি ধরে। জাগ্রত হোক মানুষের শুভবোধ জীবনের জয়গানে। যে রূপান্তর মানুষের জন্য মঙ্গলের সে রূপান্তর ঘটুক মানুষের জীবনে, জীবনের ভিতরের জীবনে। মানুষের মনে, মনের ভিতরের মনে। ভিতরে বাহিরে। সবখানে। সবসময়।

Print Friendly, PDF & Email