লক্ষ্মীপুরে স্বাক্ষর নিতে জনপ্রতিনিধিদের খোঁজে সেবাপ্রত্যাশীরা!

নিজস্ব প্রতিবেদক :

১৯৭৩ সালে তিনটি গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার শাকচর (ইউপি) ইউনিয়ন পরিষদ। এতে প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আলতাফ আলী চৌধুরী। তৎকালে নির্বাচনের মাধ্যমে বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধি এ ইউনিয়নে জনসেবা করেন। ২০১১ সালে দূর-দুরান্তের মানুষের ভোগান্তি দূর করতে বৃহত্তর শাকচর ইউনিয়ন পরিষদকে তিনটি ইউনিয়ন পরিষদে রূপান্তরিত করা হয়। (১৬ নং শাকচর ইউনিয়ন পরিষদ, ২০নং চর রমনী মোহন ইউনিয়ন পরিষদ ও ২১নং টুমচর ইউনিয়ন পরিষদ।) নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হলেও তিনটি ইউনিয়ন পরিষদেরই নেই নিজস্ব কোন কমপ্লেক্স ভবন। তাছাড়া বাড়েনিও ইউপি সেবার গতি। টিনসেট ঘর ভাড়া নিয়ে পরিষদের কার্যক্রম চালাতে গিয়ে বিভিন্ন সঙ্কটের সম্মুখিন হতে হচ্ছে জনপ্রতিনিধিদের। অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে এসেও চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এ তিন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের।

শুধু সদর উপজেলার এ তিনটি (ইউপি) ইউনিয়ন পরিষদ নয়, লক্ষ্মীপুরের সদর, রামগঞ্জ, রায়পুর, কমলনগর ও রামগতিসহ ৫ উপজেলায় ৫৮টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। ৩২টি ইউনিয়ন পরিষদের কমপ্লেক্স ভবন থাকলেও ২৬টি ইউনিয়ন পরিষদের নেই নিজস্ব কমপ্লেক্স ভবন। কোন ইউনিয়ন পরিষদ টিনসেট ঘরে, কোন ইউনিয়ন পরিষদ জনপ্রতিনিধির বাসায়, আবার কোন ইউনিয়ন পরিষদ দোকানঘর ভাড়া নিয়ে জোড়াতালি দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। এতে কক্ষসহ বিভিন্ন সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে সেবা কার্যক্রম। এ সুযোগে জনপ্রতিনিধিরাও যেখানে সেখানে বসেই পরিষদের কার্যক্রম সেরে নিচ্ছেন। তবে কমপ্লেক্স ভবনের জন্য বারবার আবেদন করেও লাভ হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।

লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রায় ১৮ লাখ মানুষের বসবাস। ২৬টি ইউনিয়নেরই নেই নিজস্ব কমপ্লেক্স ভবন। লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় ২১টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৯টিরই নেই নিজস্ব ভবন। পরিষদগুলো হলো, দক্ষিণ হামছাদী, দালাল বাজার, চররুহিতা, বাঙ্গাখাঁ, হাজিরপাড়া, শাকচর, তেওয়ারীগঞ্জ, চর রমনী মোহন ও টুমচর ইউনিয়ন পরিষদ।

ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন নেই রায়পুর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫টির। যথাক্রমে, উত্তর চর আবাবিল, উত্তর চর বংশী, চর মোহনা, সোনাপুর ও বামনী। রামগঞ্জ উপজেলায় ১০টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ভাট্টা ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব কমপ্লেক্স ভবন নেই।

কমপ্লেক্স ভবন নেই মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত রামগতি উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন পরিষদের ৫টির। যথাক্রমে, চর বাদাম, চর আবদুল্যাহ, চর আলগী, বড়খেরী ও চরগাজী। এছাড়াও ৯ টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ৬টির নিজস্ব কমপ্লেক্স ভবন নেই কমলনগর উপজেলায়। চর কালকিনি, সাহেবের হাট, চর লরেঞ্চ, পাটারীর হাট, হাজীর হাট ও তোরাবগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ।

নিয়ম অনুযায়ী ইউপি চেয়ারম্যান, সচিব ও সদস্যদের পৃথক রুমে অফিস করার কথা থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদের ভবন না থাকায় পুরোন টিনসেট ঘর বা ভবন ভাড়া নিয়ে এক কক্ষে দায়সারাভাবে চলছে কার্যক্রম। গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র থাকলেও অনেক কার্যালয়ের দরজা-জানালা ভাঙা। বসার স্থান ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা না থাকায় আরও দূর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ মানুষদের। এতে অনিরাপদ হয়ে পড়েছে ইউপি কার্যালয়।

এদিকে বিভিন্ন স্থানে বসে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা ইচ্ছে মাফিক ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তারা জানায়, একদিকে কমপ্লেক্স ভবন না থাকায় ইউপির সব সেবা এক স্থানে পাওয়া যায় না। একটি চেয়ারম্যান সার্টিফিকেটের জন্য একবার যেতে হয় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে। আবার ইউপি চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরের নিতে যেতে হয় দুই-চার কিলোমিটার দূরে, তারপর ইউপি সদস্য (ওয়ার্ড মেম্বার) স্বাক্ষরের জন্য যেতে হয় অন্য স্থানে। ঠিকভাবে জনপ্রতিনিধিদের এক স্থানে পাওয়াও যায় না। ফলে নানা রকম হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা।

রসূল আলী, আকবার হোসেন, ও সাইদুর রহমানসহ কয়েকজন কৃষক জানান, এ অঞ্চল কৃষি ও মৎস্য নির্ভর এলাকা। ইউনিয়ণ পরিষদে এক-দুইজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বসার কথা। কিন্তু ভবন না থাকায় তারাও থাকেন না। এতে চাষাবাদের জন্য জরুরী পরামর্শের প্রয়োজনে সেবা পাওয়া যায় না। এতে ক্ষতির শিকার হতে হয়ে কৃষকদেরও।

লক্ষ্মীপুর সদর দপ্তর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে জেএম হাট এলাকায় অবস্থিত শাকচর ইউনিয়ন পরিষদ। পুরোন একটি দ্বিতলা ভবনের উপরের তলার একটি কক্ষে ইউপি চেয়ারম্যান চেম্বার, ইউপি সদস্যদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা না থাকায় ওই চেম্বারই ব্যবহার করতে হয়। পাশের কক্ষটি স্টোররুম। নিচতলায় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, উত্তর পাশে দ্বোচালা ছোট্ট একটি জরাজীর্ণ ঘরে এক পাশে ইউনিয়ন সচিবের কক্ষ, অপর পাশের কক্ষটিকে গ্রাম আদালত হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

শাকচর ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা মোহাম্মদ সিকান্দার বলেন, ইউপি ভবন থাকলে কৃষি, স্বাস্থ্য , ভূমি ও সমাজসেবাসহ বিভিন্ন বিভাগের ইউপি অফিস থাকতো এক কমপ্লেক্সে। এক ভবনে সকল সেবা নিতো সবাই। কিন্তু ভবনের অভাবে জোড়াতালি দিয়ে বাসিন্দাদের সেবা দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ভোগান্তি কমানো যাচ্ছে না।

শাকচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী টিটু বলেন, ইউপি সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়তই চলছে কার্যক্রম। ইউপি কমপ্লেক্স ভবনের না থাকায় সব সেবা একত্রে সম্ভব নয়। স্থানীয় ভাবে ইউপি কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের জন্য ভূমি পচন্দ করা হয়েছে। জমির মালিকদের কাছ থেকে রেজিষ্ট্রেশন পেলে পারলেই ইউনিয়ন কমপ্লেক্স ভবনের জন্য আবেদন করা হবে। এতে ইউনিয়নের বাসিন্দাদের ভোগান্তি লাগব হবে।

এদিকে ইউপি চেয়ারম্যানের বাসভবনে পরিচালিত হয় চর রমনী মোহন ইউনিয়ণ পরিষদ। বাসার সামনের একটি কক্ষে চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য ও অন্যান্যরা গাদাগাদি করে ইউপি কার্যক্রম চালায়, পেচনের কক্ষে ইউপি গুদাম। এতে প্রতিমাসে পরিষদকে ভাড়া গুনতে হয় মোটা অঙ্কের। তবে ইউনিয়ন পরিষদে নেই ইউনিয়ণ ডিজিটাল সেন্টার। সেটি দুই কিলোমিটার দূরে বাজার এলাকায়। এতে জন্ম, মৃত্যু, নাগরিকত্ব ও ওয়ারিশ সনদসহ বিভিন্ন ইউপি সেবা নিতে ২ কিলোমিটার ভাঙা রাস্তা ২-৪ বার পাড়ি দিতে হয় স্থানীয়দের।

তারা জানান, ইউপি চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ ছৈয়াল নিজ বাসভবনে ঠিকমত থাকেন না। থাকেন শহুরের বিলাশবহুল ভাড়া বাসায়। ইউপি চেয়রম্যানের স্বাক্ষরের জন্য শহরেরও আসতে হয় বলে জানান মেঘনার উপকূলী এ বাসিন্দারা।

ইউপি চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ ছৈয়াল বলেন, ভবন না থাকায় কোথায় বসে ইউনিয়নের বাসিন্দাদের সেবা দেবো। নিরাপত্তার জন্যই নিজ বাসার সামনের দুটি রুম দিয়ে ইউপি সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তবে বার বার আবেদন করেও ইউপি ভবনের ব্যবস্থা করতে পারিনি।

এদিকে ইউপি চেয়ারম্যানের বাড়ির সামনে চারকক্ষ বিশিষ্ট টিনসেট একটি ঘর ভাড়া করে পরিচালিত হচ্ছে সদর উপজেলার টুমচর ইউনিয়ন পরিষদ। এতে পরিষদের আসবাবপত্রসহ জরুরী কাজগপত্র যেমন নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। তেমনী ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এই ইউনিয়নের সেবা প্রত্যাশীদের।

টিনসেট দোকানঘর ভাড়া নিয়ে পরিচালিত হয় কমলনগরের তোরাবগঞ্জ ইউনিয়ণ পরিষদ। ইউপি চেয়ারম্যান ফয়সাল আহমদ রতন জানান, ছোট একটি কক্ষে গাদাগাদি করে চলছে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম। ভাঙা হওয়ায় মাঝে মধ্যে বৃষ্টির পানি পড়ে অফিসের আসবাবপত্র, কম্পিউটারসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নষ্ট হয়ে যায়। এতে জনসাধারণকে সেবা দিতে বেগ পেতে হয়।

অন্যদিকে উত্তর চরবংশী ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সচিব মো. ইউছুফ জানান, ভবনের জায়গার সংকটে বাজারে ভাড়া রুম নিয়ে সেবা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের যে কার্যক্রম আছে, তা জনগণের কাছে পৌঁছানোর জন্য কমপ্লেক্স ভবন অতি জরুরী প্রয়োজন।

লক্ষ্মীপুরের নবাগত জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার হোছাইন আকন্দ বলেন, একটি ভবন করতে ২৫ শতাংশ পরিমাণ জমি প্রয়োজন। সে পরিমাণ জমি ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের জন্য ব্যবস্থা করতে না পারায় কমপ্লেক্স ভবনের বরাদ্ধ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবুও ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের জন্য মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেলে পর্যায়ক্রমে কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করা হবে। এতে ইউনিয়ন পর্যায়ের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ লাগব হবে বলে জানান তিনি।

Print Friendly, PDF & Email