রমাদান বয়ে আনুক আমূল পরিবর্তনের শুভ সূচনা

মু. আবিদুর রহমান : অবারিত রহমতের বার্তা নিয়ে বছরের পথপরিক্রমায় আমাদের মাঝে সমাগত মানব জাতির সর্বশেষ হেদায়াত গ্রন্থ ‘আল-কুরআন’ নাযিলের মাস মাহে রমাদান। ঈমানদারদের জন্য এই মাস হলো পূন্যের মৌসুম। রমাদান এমন এক আকাঙ্খিত মাস যার আগমনে সমগ্র মুসলিম মিল্লাত নব উদ্যমে জেগে উঠে। নিজেকে সময়ের উপযোগী করে গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা নিয়ে স্বাগত জানায় রমাদানকে। পূন্যের মৌসুম রমাদানের ‍সুফল বয়ে আনার জন্য প্রয়োজন পৃ্র্ব প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা। যেমনি ভাবে আমরা প্রস্তুতি নিয়ে থাকি পরিক্ষা , ব্যবসা বা যে কোন কাজের। কেননা সুন্দর একটি পরিকল্পনা যে কোন কাজের সফলতা বয়ে আনে।

 

রাসূল (সাঃ) দু’মাস পৃর্ব থেকেই রমাদানের প্রস্তুতি গ্রহন করতেন। মহান রবের দরবারে দরখাস্ত করে বলতেন- “হে আল্লাহ আমাদের রজব-শাবানে বরকাত দান করো এবং রমাদান পযর্ন্ত পৌছে দাত্ত” (মুসনাদে আহমদ)। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) রমজানের পৃ্র্বেই রমজানের ফযিলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনা করতেন। যেনো সাহাবায়ে কেরাম রমাদানের বারাকাহ লাভ করতে পারেন।

 

হযরত সালমান ফারসী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, “রাসূল (সাঃ) শাবান মাসের শেষ তারিখে আমাদের ভাষণ দিলেন এবং বললেন, হে লোক সকল তোমাদের উপর ছাঁয়া বিস্তার করছে একটি মর্যাদাশীল বরকতময় মাস। যাতে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ তা’য়ালা এ মাসের রোযা তোমাদের উপর ফরজ করেছেন ও কিয়ামুল লাইল করেছেন পূণ্যের কাজ। এ মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় যে একটি নফল কাজ করলো সে যেন ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে একটি ফরজ কাজ করলো। আর যে ব্যক্তি একটি ফরজ কাজ করলো সে যেন ঐ ব্যক্তির ন্যয় যে অণ্য মাসে সত্তরটি ফরজ কাজ করলো। এ মাস ধৈর্যের মাস যার বিনিময় হলো কেবল জান্নাত। এ মাস হলো সহানুভূতির মাস। এ মাসে বৃদ্ধি করা হয় মুমিনের রিযিক। যে ব্যক্তি রোযাদারকে ইফতার করাবে ইহা তার গুনাহের ক্ষমা ও দোযখ থেকে মুক্তির কারন হবে”(বায়হাকী)।

 

মানব জীবনকে পূত-পবিত্র করে গড়ে তোলার অত্যন্ত কার্যকরী পন্থা হলো মাহে রমাদান। গুনাহ মাফের মৌসুমে নিজের গুনাহগুলো মাফ করে নেওয়ার মাধ্যমে মহান রবের নৈকট্য লাভের সুযোগ এনে দিয়েছে মাহে রমাদান। রাসূল (সাঃ) বলেন, “তার নাক ধুলিমলিন হোক, যে রমাদান পেলো অথচ তার গুনাহসমূহ মাফ করিয়ে নিতে পারলো না”(আল-হাদিস)। আমাদের জীবন থেকে কতো রমাদান ইতিপূর্বে অতিবাহিত করে পেলেছি। আমাদের অন্তর কি বলে যে আমাদের গুনাহসমূহ মাফ করে নিতে পেরেছি? অন্তর বলবে পারি নাই। তাহলে আমাদের শপথ নিতে হবে আর কোন ভুল নয় এবারের রমাদানেই গুনাহ মাফের মাধ্যমে আমার জীবনে আনবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। জীবন পরিবর্তনের সুবর্ণ সুযোগ কে অবহেলা না করে পুরোমাত্রায় কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে শুভসূচনা হবে এই রমাদান।

 

আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনঃ মাহে রমাদান হলো আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠনর সবচেয়ে বড় সুযোগ। রাসূল (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি ঈমান ও আত্মবিশ্লেষনের মাধ্যমে রমাদানের রোযা রাখবে, তার পূর্বের যাবতীয় গুনাহসমূহ মাফ করা হবে”(সহিহ বুখারী)। মাহে রমাদান আত্মার পরিশুদ্ধতার সাথে সাথে দেহ ও মন-মগজ ও জবানকে করবে পরিচ্ছন্ন। জীবনকে রাঙিয়ে দেবে ইসলামের রঙে। আল্লাহ বলেন- “আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পযর্ন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে” (সূরা রা’দ-১১)। আর যে ব্যক্তি নিজেকে পরিবর্তন করতে পারবে সেই সফলতা লাভ করবে। আল্লাহ বলেন- “যে নিজেকে শুদ্ধ করে সেই সফলকাম হয়” (সূরা আশ-শামস-৯)। এই মাসে কঠোর সিয়াম ও ‍কিয়াম সাধনার মাধ্যমে শুদ্ধ হয়ে আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরী করা। নফসের দাসত্বের ওপর পূর্ণ-নিয়ন্ত্রন এনে আল্লাহ দাসত্ব গ্রহণ করা।

কুরআন শিক্ষা ও অনুসরণঃ রমাদান তো সে মাস যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে। কুরআন নাযিলের মাসে আল-কুরআনকে জ্ঞানের প্রধাণ উৎস হিসেবে গ্রহণ করা। মহা গ্রন্থ আল-কুরআন বুজতে চেষ্টা করা এবং এর মর্ম উপলব্ধি করা। কুরআন বুঝে বুঝে পড়ার এবং এর উপদেশ ও শিক্ষার আলোকে নিজেদের  জীবনকে গড়ে তোলা। কুরআনের নির্দেশিত বিধি-বিধান  ও হুকুম-আহকামকে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা। কুরআন প্রচার ও প্রসারে নিজেকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ হলো মাহে রমাদান।

 

ভালো কাজকে অভ্যাসে পরিণত করাঃ সমাজ জীবনে চলার পথে আমরা অসংখ্য গুনাহ করে যাচ্ছি। বিশেষ করে অশ্লীল-খারাপ কাজ ও আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজগুলো করার মাধ্যমে বড় বড় কবীরা গুনাহের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। এই সকল গুনাহসমূহ যে প্রতিনিয়ত হয়ে যাচ্ছে তা আমরা কখনো চিন্তাও করি না। রোযা এমন এক ইবাদত যার মাধ্যমে যাবতীয় অশ্লীল ও নিষিদ্ধ কাজ দূর হয়ে যায়। প্রতিনিয়ত ভালো কাজ করার জন্য রমাদানের বিকল্প নেই। ফলে মাহে রমাদান যেনো আমাদের ব্যক্তি জীবনরে খারাপ অভ্যাসগুলো দূর করে ভালো আমলগুলো অভ্যাসে পরিণত হয়।

 

আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়ঃ আল্লাহর পথে খরচ করা এমন এক ব্যবসার নাম যা আখিরাতে নাজাতের পথ সুগম করে। যেই ব্যবসায় কোন লোকসান নেই শুধু লাভ আর লাভ। আল্লাহর পথে খরচের সাওয়াব অনেক বেশী। আল্লাহর বান্দাহ আল্লাহকে খুশি করার জন্য যা কিছু খরচ করে আল্লাহ এর উত্তম প্রতিফল দান করবেন। আহলে নিসাব তথা যাকাত ফরজ হয়েছে এমন ব্যক্তিরা যাকাত আদায় করা। ঈমানদাররা পূণ্যের মৌসুমে আখিরাতের পুঁজি অর্জনের লক্ষ্যে অধিক পরিমাণ আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়ে সক্রিয় থাকে।

 

কিয়ামুল লাইলঃ আল্লাহ বলেন- “যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সেজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে এবাদত করে ,পরকালের আশংকা রাখে এবং তার পালনকর্তার রহমতের প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান যে এরূপ করে না” (সূরা আয-যুমার-৯)। মহান আল্লাহর জন্য আরামের ঘুম স্বেচ্ছায় ছেড়ে দিয়ে রাত জেগে ইবাদত করা আল্লাহর প্রিয় বান্দাহদের একটি গুন। দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত প্রতি রাতেই আসে। যখন চারদিক অন্ধকার , পিনপতন নিরবতা তখন নিকটবর্তী আসমানের খুব সন্নিকটে মহান প্রভু এসে ঘোষনা করছেন, “কে আছো এমন যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া ‍দেব। কে আছো এমন যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করবো।” প্রত্যহ আমরা অলসতা আর দূর্বলতার কারনে মালিকে ডাকে সাড়া দিতে পারি না। মাহে রমাদানে সাহরী খাওয়ার জন্য উঠবো একটু পৃর্বে উঠে শেষ রাতে রবের দরবারে দরনা দেওয়ার সুযোগকে কাজে লাগানো। রাসূল (সাঃ) বলেন- “ফরজ সালাতের পর সর্বোত্তম সালাত হলো সালাতুল লাইল” (মুসলিম)। রমাদানের রাতগুলো আলস্যে পার না করে প্রত্যহ দাঁড়িয়ে যাই তারাবী ও তাহাজ্জদের সালাতে এবং সিজদাবনত হই রবের দরবারে।

 

ক্ষমা ও তাওবাহঃ পবিত্র মাহে রমাদানকে পরিকল্পিত ভাবে অতিবাহিত করার জন্য প্রতিনিয়ত অতীতের গুনাহের জন্য মালিকের কাছে ক্ষমা চাওয়া। আর গুনাহ না করার শপথ গ্রহণ করা। পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আপনাকে পৌঁছে দেবে রবের দরবারে। রাসূল (সাঃ) বলেন- “ধ্বংস তার জন্য যে রমাদান পেয়েছে কিন্তু নিজেকে ক্ষমাযোগ্য করত পারে নি।” প্রতিদিন রাসূল (সাঃ) নিজেও সত্তর বার তাওবাহ করতেন। যেই খানে তার কোন গুনাহ ছিলো না। গুনাহ মাফের এই মাসে সর্বদা অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার করার মাধ্যমে মহান প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জন করা।

 

এই রমাদান হতে পারে আমাদের জীবনের শেষ রমাদান। মহান রবের নিকট দরখাস্ত মালিক যেনো মাহে রমাদানের পৃর্ব প্রস্তুতি নিয়ে মাহে রমাদান কে বরন করে নেওয়ার এবং ঈমান ও এহতেছাবের সাথে মাহে রমাদান পালনের প্রত্যয় গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন।(আমিন)

Print Friendly, PDF & Email