আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসা বিষয়ে সচেতনতা দরকার

ডা. সমীর কুমার সাহা : করোনা মহামারীর কারণে স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য খাত হুমকির মধ্যে পড়েছে। করোনা পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিয়েছে স্বাস্থ্যখাতে আমাদের এখনো অনেকদূর যেতে হবে। আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে এখনো নানা সমস্যা বিরাজমান, যেমন দেশব্যাপী পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাব, চিকিৎসক স্বল্পতা এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসা ব্যবস্থা। যাদের আর্থিক সচ্ছলতা আছে, তারা বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ পেলেও ব্যাপক সংখ্যক গরিব মানুষ চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে দুঃসহ জীবন-যাপন করছে।

Haque Milk Chocolate Digestive Biscuit

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হলে একটি দেশ আর্থিকভাবে উপকৃত হয়ে থাকে। তাই এই সংস্থাটি এই খাতে ব্যাপক আর্থিক বিনিয়োগ করার জন্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এই প্রেক্ষিতে বলা যায়, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি (আয়ুর্বেদ ও ইউনানি) একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করেতে পারে। সংশ্লিষ্ট সবাই এগিয়ে এলে এই চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে। করোনা দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রেও প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতি বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে এবং করতে পারে। দুর্যোগ প্রতিরোধের জন্য এখন ঘরবন্দি জীবন-যাপন এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।  যে কোনো ধরনের মহামারী মোকাবিলার জন্য এমন দূরত্বের কথা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ২ হাজার ৫০০ বছর আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। আয়ুর্বেদ চিকিৎসাবিজ্ঞানী চরক-সুশ্রুত আড়াই হাজার বছর আগে রোগ-জীবাণু মোকাবিলার যে পথ প্রদর্শন করে গেছেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান তা-ই বলছে এখন। তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, জীবাণু হামলায় যখন সভ্যতা বিপন্ন, তখন প্রতিটি রোগী ও তার সংস্পর্শে আসা মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা ছাড়া বাঁচার উপায় নেই। অর্থাৎ আইসোলেশন ও সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং।

করোনা রুখতে এই দুই অস্ত্রের ওপর সবাই এখন সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, ভবিষ্যতের দুনিয়া দেখতে হলে বর্তমানের কয়েকটা দিন ঘরে বসে থাকুন। নচেৎ মূল্যহীন হবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, চীন করোনা সংক্রমণ মোকাবিলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভেষজ দ্রব্য ব্যবহার করে সাফল্য অর্জন করেছে।  করোনা মোকাবিলার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে এই বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

আয়ুর্বেদ এখন আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার দ্বারা প্রমাণিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতিও বটে। সারা বিশ্বে প্রতিনিয়ত এই চিকিৎসা পদ্ধতির প্রসার হচ্ছে। জটিল-কঠিন রোগ তথা এ শতাব্দীর বড় চ্যালেঞ্জ সংক্রামক ব্যাধিসমূহের চিকিৎসায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা উপকৃত হচ্ছেন এই পদ্ধতির মাধ্যমে। আয়ুর্বেদের লক্ষ্য হচ্ছে, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবন-যাপন পদ্ধতির বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া, যাতে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ব্যক্তিরা তাদের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করে চলতে পারেন এবং যারা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন তারা তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধন করতে পারেন। প্রাকৃতিক এই চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদেরকে সার্বিক ব্যবস্থার একটি ধারণা দেয় যা আমরা স্বাস্থ্যকর খাদ্য, ওষুধ ও ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগব্যাধি থেকে মুক্ত হতে পারি। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না যে, অনেক আধুনিক ওষুধ প্রাকৃতিক এই ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতিকে অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার জন্য এই ভেষজভিত্তিক ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ ধরনের উদ্ভিদ ঔষধি গুণসম্পন্ন বলে প্রমাণিত হয়েছে। ঐতিহ্যগত এই চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহারের একটি সুবিধা হলো এই যে, ব্যয়বহুল বিদেশি ওষুধ আমদানির ওপর আমরা নির্ভরশীলতা কমিয়ে ফেলতে পারি, তার পরিবর্তে আমরা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেরাই কম খরচে ওষুধ তৈরি করতে পারি।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এটাকে উল্লেখযোগ্য চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে যে বিভিন্ন রোগ থেকে আরোগ্য লাভ সম্ভব, সে বিষয়ে পশ্চিমা বিজ্ঞানীরা  স্বীকার করেছেন। যদি এই ধারা সাফল্যজনকভাবে অব্যাহত থাকে, তাহলে এর মাধ্যমে অল্প খরচে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। এতে এই দেশের স্বাস্থ্য খাত ও ওষুধ শিল্পে একটি বিপ্লব নিয়ে আসতে পারে। ভারত ও চীনের দিকে তাকালে দেখতে পাই, এই দুটি দেশ তাদের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে এই ঐতিহ্যগত পদ্ধতি অনুসরণ করে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। শ্রীলংকা, ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তানেও এই চিকিৎসা পদ্ধতির প্রতি জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

ভারত তার কমিউনিটি স্বাস্থ্য সমস্যার মোকাবিলায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। শ্রীলংকায় বিকল্প চিকিৎসা বিষয়ে আলাদা একটি মন্ত্রণালয় রয়েছে। বাংলাদেশ যেসব স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবিলা করছে এক্ষেত্রে বলা যায়, আমাদেরকে সব চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্বেষণ ও উন্নয়ন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। প্রাকৃতিক এই চিকিৎসা ব্যবস্থা আমাদের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে, এ অর্থে যে এটা আমরা সহজেই পেতে পারি এবং এটা আমাদের ক্রয়ক্ষমতার ভেতরেই আছে। অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে ডাক্তার, নার্স ও মিডওয়াইফের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। প্রাকৃতিক চিকিৎসার কর্মীবাহিনী ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বাস্থ্য খাতে এ ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পারি। আমাদের জন্য এখন সময় এসেছে প্রাকৃতিক এই চিকিৎসা পদ্ধতির সক্ষমতাকে মূলধারায় অধিকতর সুযোগ দেওয়া এবং এক্ষেত্রে কর্মরত জনশক্তিকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা।

ভারতীয় উপমহাদেশে হাজার হাজার বছর ধরেই ঐতিহ্যবাহী ভেষজ চিকিৎসা প্রচলিত আছে কিন্তু সেভাবে গবেষণা হয়নি, যা হওয়া উচিত ছিল। সে কারণে হয়তো অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকরা আয়ুর্বেদ, ইউনানি বা হোমিওপ্যাথিক ওষুধকে কোনো গুরুত্বই দিতে চান না। কোষের আনুবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণে তারাও যে মানবদেহে রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতাকে উৎসাহিত করে, এমন লক্ষণ দেখা গেছে। কাজেই সঠিক পথে গবেষণা হলে এমনও হতে পারত যে, আয়ুর্বেদ তথা ভেষজ উপাদানগুলোই কোভিডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারত।

আয়ুর্বেদ অ্যান্ড ন্যাচারোপ্যাথি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আয়ুন্স) ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নয়নে প্রায় এক যুগ ধরে কাজ করে আসছে। আয়ুন্স মনে করে, এ খাতে উন্নয়ন করা গেলে আমরা স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নতি অর্জন করতে পারব। এজন্য আয়ুন্স এই চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে গবেষণা চালানোর ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। কিন্তু  এই সেক্টরে আমাদের দেশে বেশকিছু সমস্যা আছে, যেগুলো দূর করতে পারলে আমরা এই সেক্টরে উন্নতি অর্জন করতে পারব। সরকারের অধিক পৃষ্ঠপোষকতা, ইউনানি ও আয়ুর্বেদ গ্র্যাজুয়েট ও ডিপ্লোমা চিকিৎসকদের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ দানের ব্যবস্থা করা। উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা। দেশের প্রতিটি বিভাগে একটি করে আয়ুর্বেদ ও ইউনানি মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও প্রতিটি জেলায় ভেষজ বাগান তৈরি করতে হবে। ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ যাতে মানসম্মতভাবে তৈরি করা হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

অথেনটিক বা বিশুদ্ধ আয়ুর্বেদ-ইউনানি চিকিৎসা, ওষুধ এখন সময়ের দাবি। দেশের জনগণ বিশেষ করে শিক্ষিত সচেতন ব্যক্তিদের এখন জোর চাহিদা ভেজাল, কেমিক্যালমুক্ত বিশুদ্ধ ভেষজ ওষুধ। সঠিক ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকার কারণে মুনাফালোভী, ব্যবসায়ী চিকিৎসদের আধিপত্য বেড়েছে। তাই অনতিবিলম্বে এ সিস্টেমকে মনিটর করার জন্য বিএমডিসি’র মতো স্বতন্ত্র একটি কাউন্সিল গঠন করা দরকার।

আমাদের দেশের অধিকাংশ লোক নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যআয়ের। জটিল কঠিন রোগের জন্য আমাদের এ জনগোষ্ঠীর অনেকের পক্ষেই বিপুল অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসা চালানো দুরূহ ব্যাপার। অথচ ঐতিহ্যগত চিকিৎসা পদ্ধতিতে একজন মানুষ অল্প খরচেই জটিল কঠিন রোগের চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণ করতে পারে। প্রাকৃতিক পদ্ধতি হওয়ায় এই পদ্ধতিতে চিকিৎসার কোনো বিশেষ নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, যা অন্যপ্যাথির আধুনিক পদ্ধতিতে লক্ষ করা যায়। আয়ুর্বেদ ও ইউনানি চিকিৎসা বিষয়ে জনগণের মাঝে সচেতনতা তৈরি এবং এই চিকিৎসা পদ্ধতির  গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

লেখক : ভাইস চেয়ারপারসন, পাবলিক হেল্থ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

Print Friendly, PDF & Email