লক্ষ্মীপুরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে পদায়ন থাকলেও সেখানে যান না চিকিৎসকরা। মেডিকেল অফিসারের পদায়ন থাকলেও নানা অজুহাতে সেখানে যান না অনেকে। একইসঙ্গে ১৬৫টি পদই শূন্য এবং এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভবনেরও বেহাল অবস্থা।
রায়পুর, সদর ও কমলনগরে ৫টি পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের সংস্কার কাজ চলমান। ৪টি কেন্দ্র খুবই জরাজীর্ণ অবস্থায়। সেখানেই সেবা দিচ্ছেন এফডব্লিউভি বা পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ও কর্মকর্তারা। তবে চাহিদা অনুযায়ী সেবা পাচ্ছেন না সেবাপ্রত্যাশীরা। চলছে নানা অনিয়ম ও দূর্ণীতি। কয়েক দিনের অনুসন্ধানে এটি দেখা গেছে।
নিয়োগ নেই বেশিরভাগ পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে। যেখানে আছে, সেখানেও যান না চিকিৎসকরা। পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে ভিজিট করেন না এবং চিকিৎসাও দিচ্ছেন না। ডাক্তার না থাকায় ও তদারকি না করায়, ডেলিভারি করার নামে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এফডব্লিউভিরা। কাগজে-কলমে বছরের পর বছর পদায়ন থাকলেও তাদের চেনেন না এলাকার মানুষ। এভাবেই চলছে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ জেলার ৩৫টি পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। সেবা নিতে তাদের ছুটতে হয় গ্রাম থেকে জেলা সদর হাসপাতালে।
জেলায় অনুমোদিত পদ উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকসহ ৬১৮ জন। এর মধ্যে মেডিকেল অফিসার (সিসি) ১ জনে ১ জন, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ৫ জনে ৩ জন, মেডিকেল অফিসার (এমসিএইচ-এফপি ও পরিবার কল্যাণ) ২ জন। সহকারী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ৯ জনের মধ্যে ৮ জন নেই। উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ৩১ জনের মধ্যে ২১ জন নেই, ফার্মাসিস্ট ১১ জনের মধ্যে ৮ জন নেই, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা ৩০ জন, পরিবার কল্যাণ সহকারী ১২৯ জনসহ মোট ১৬৫টি পদ শূন্য। সদর, রামগঞ্জ, কমলনগর ও রামগতি উপজেলায় খুবই করুন অবস্থা ও দূর্ণীতি বিরাজ করছে।
লক্ষ্মীপুর পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৫টি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩৫টি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলো হলো: সদর উপজেলায় ১৭টি, রায়পুর উপজেলায় ৭টি, রামগঞ্জ উপজেলায় ২টি, কমলনগর উপজেলায় ২টি এবং রামগতি উপজেলায় ৬টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এই কেন্দ্রগুলো ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রতিদিন প্রায় ১৫শ থেকে ২ হাজার মানুষ চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ আরও জানায়, এই উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোর মধ্যে ৬টি কেন্দ্রে চিকিৎসক পদায়ন আছে এবং ১টিতে পদ শূন্য রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে পদায়ন থাকলেও সেখানে যান না চিকিৎসকরা। সহকারী মেডিকেল অফিসারের পদায়ন থাকলেও নানা অজুহাতে সেখানে যান না অনেকে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ভবনও বেহাল অবস্থায়। সর্বশেষ ২০১৯ সালে কিছুটা মেরামতের কাজ করা হয়েছে। তবে বেশিরভাগ উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রেরই জরাজীর্ণ অবস্থা। সেখানেই সেবা দিচ্ছেন কর্মকর্তারা। চাহিদা অনুযায়ী সেবাপাচ্ছেনা সেবাপ্রত্যাশীরা।
রায়পুরের চরপাতা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। কোনো মেডিকেল অফিসারের দেখা মেলেনি। ঠাণ্ডা জ্বরের ওষুধ দেয়াসহ সব কাজ করছেন পরিদর্শিকা। অনেক রোগীকে দেখা গেছে চিকিৎসা না নিয়ে ফেরত যেতে। একই অবস্থা বিরাজ করছে কেরোয়া, বামনী, চরমোহনা, চরবংশী ও চরআবাবিল ইউনিয়নের কেন্দ্রগুলোতে।
একইভাবে সদরের উত্তর হামছাদী, উত্তর জয়পুর, চন্দ্রগঞ্জ, কমলনগরের চরফলকন ও রামগঞ্জের দরবেশপুর ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও কোনো মেডিকেল অফিসার নেই। নামমাত্র চলছে চিকিৎসা সেবা।
চিকিৎসকসহ জনবল পদায়ন না হওয়ায় প্রায় এক বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে রায়পুরের সোনাপুরসহ কয়েকটি পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। কেন্দ্রগুলোতে ইট ও প্লাস্টার খুলে পড়েছে। জানালা-দরজা চুরি হয়ে গেছে। পরিণত হয়েছে জঙ্গলে। অথচ সরকারি খাতায় এখনো চালু এই কেন্দ্র।
রায়পুরের চরপাতা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে সেবা নিতে আসা পারুল বেগমের স্বজন বলেন, “আমরা এর আগে এখানে একজন বড় ডাক্তার দেখেছি। তিনি মাঝে মাঝে এসে আমাদের সেবা দিতেন। অনেক বছর হয়ে গেছে, তিনি চলে গেছেন। এরপর আর কাউকে দেখি না।”
মাহফুজা বেগম বলেন, “পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে আসলে শুধু চেকআপের পর কিছু বড়ি ছাড়া আর কোন ওষুধ দেওয়া হয় না। এত বড় হাসপাতাল করছে সরকার। শুনেছি এখানে বড় ডাক্তারের নিয়োগও আছে, কিন্তু আমরা তাঁকে পাই না। আমরা চাই, এখানে একজন মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দেয়া হোক, যিনি নিয়মিত আমাদের সেবা দেবেন।”
রায়পুর পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডাঃ আবদুল্লাহ আল নোমান (শিশু ডাক্তার) ও রামগঞ্জে ডাক্তার এএম সালমান রহমান এবং সদরের ডাঃ জুনাইদ আহমেদ মারুফ বলেন, “পুরো জেলার চিত্র এটি। ঈদের পর প্রতিটি কেন্দ্র ভিজিট করা হবে।”
লক্ষ্মীপুর জেলার পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক নাজমুল হাসান বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, “এই জেলায় চিকিৎসক ও কর্মকর্তার সংখ্যা খুবই কম। বিষয়টি নিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি। তারা আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন, জেলায় চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হবে। আশা করি, নিয়োগ হলে এ সমস্যার সমাধান হবে।”



