ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে নৌকাডুবি ও সৃষ্ট ঝড়ে গাছ পড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৩৫ জন নিহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
ভোলায় গাছচাপা পড়ে ও পানিতে ডুবে চারজনের প্রাণহানি হয়েছে। কুমিল্লায় গাছচাপা পড়ে বাবা, মা ও সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। টাঙ্গাইলে ঝড়ের কবলে পড়ে মাইক্রোবাস দুর্ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্য ও এক আসামির মৃত্যু হয়েছে। কক্সবাজারের টেকনাফ স্থলবন্দরে জাহাজ থেকে পড়ে মিয়ানমারের এক নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। শরীয়তপুরে গাছচাপায় মারা গেছেন এক বৃদ্ধ।
মুন্সীগঞ্জে ঘুমন্ত অবস্থায় গাছ ভেঙে পড়ায় ২৮ বছর বয়সী এক নারী ও তার চার বছরের মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। নোয়াখালীর সুবর্ণচরে মঙ্গলবার ভোরে গাছ ধসে এক বছরের এক মেয়ে শিশু নিহত ও তার মা আহত হয়েছেন। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় যমুনা নদীর খালে নৌকা ডুবে মা ও তার ছেলের মৃত্যু হয়েছে।
আরও পড়ুন- অপব্যবহার রোধে ফেসবুককে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে
গাজীপুরে দেয়াল চাপায় ঘুমন্ত অবস্থায় এক শিশু মারা গেছে। এ ছাড়া ঝড়ে ঢাকায় দেয়াল চাপায় একজন, ঝালকাঠিতে দুইজন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দুইজন, নড়াইলে একজন ও গোপালগঞ্জে দুইজন প্রাণ হারিয়েছেন।
এ দিকে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে সাগরে ট্রলার ডুবে আট শ্রমিকের লাশ উদ্ধার হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ খবরটি প্রশাসনিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৭টায় উদ্ধার অভিযান স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিনহাজুর রহমান জানান, কাউকে এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ট্রলারটি কুলে ভিড়ানোর চেষ্টা করছেন। সকালে আবার উদ্ধার অভিযান শুরু হবে।
ভোলা সংবাদদাতা জানান, ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের আঘাতে উপকূলীয় জেলা ভোলার বিভিন্ন জনপদ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। মৃত্যু হয়েছে চারজনের। দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দুই শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এর সাথে আংশিক ক্ষতি হয়েছে পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি। পানিতে তলিয়ে গেছে শতাধিক পুকুর ও মাছের ঘের। বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের তারে গাছপালা পড়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এখনো বিদ্যুৎসংযোগ বন্ধ রয়েছে। এর সাথে চলতি মৌসুমে আমন ধান ও আগাম শীতকালীন শাকসবজির ক্ষতি হওয়ায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে জেলার কৃষি বিভাগ।
আরও পড়ুন- আংশিক সূর্যগ্রহণ আজ
সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাতের সাথে ঝড়ো বাতাসে গাছ চাপা ও পানিতে ডুবে ভোলা সদর উপজেলা, দৌলতখান, লালমোহন ও চরফ্যাসন উপজেলায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের মেইকার বাড়িতে ঘর চাপায় মফিজল ইসলাম (৬০), দৌলতখান উপজেলায় বিবি খাদিজা (২০), লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নে ফাতেমাবাদ গ্রামে পানিতে ডুবে রাবেয়া (৩০) ও চরফ্যাসন উপজেলার হাজারিগঞ্জ ইউনিয়নে মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় গাছের চাপায় মনির (৩০) মারা গেছেন।
ভোলা-চরফ্যাসন ও ভোলা-দৌলতখান আঞ্চলিক সড়কে বড় বড় গাছ ভেঙে পড়ে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে জেলার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন চরফ্যাসন উপজেলার ঢালচর ও কুকরি-মুকরি ইউনিয়নে।
সোমবার সকাল থেকেই ঢালচর ও কুকরি-মুকরি ইউনিয়ন ছিল পানির নিচে। দুপুরের পর থেকে দমকা হাওয়া ও ঝড়ো বাতাসের সাথেই এক এক করে বিধ্বস্ত হয়েছে সেখানকার বিভিন্ন দোকানপাট, কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক ঘরবাড়ি। এর সাথে আংশিক ক্ষতি হয়েছে আরো পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি। বর্তমানে সেখানকার দুই শতাধিক পরিবার খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে।
আরও পড়ুন- নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ
এ দিকে ঝড়ের আঘাতে চলতি মৌসুমে আমনের আবাদের পাশাপাশি শাকসবজির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। জেলা কৃষি ও সম্প্রসারণ অধিদফতরে তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে জেলায় আমন ধানের আবাদ হয়েছে এক লাখ ৭৫ হাজার হেক্টর। তার মধ্যে ১০ শতাংশ গাছে ফুল এসেছে। বৃষ্টি ও বাতাসের আঘাতে ওই সব গাছের ফুল ঝরে পড়ার পাশাপাশি গাছ নুইয়ে পড়ে আমনের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। এর সাথে ছয় হাজার হেক্টরে আবাদকৃত শাকসবজির মধ্যে প্রায় ২০০ হেক্টর শাকসবজি পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ হাসান ওয়াহিদুল কবির জানান, ঘূর্ণিঝড়ে আমরা যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করেছি, আল্লাহর অশেষ কৃপায় সে পরিমাণ ক্ষতি হয়নি।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা নিরূপণ করার কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান ভোলা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।





