গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত, নিবন্ধন নং ১১৪
  1. অন্যান্য
  2. অর্থ ও বাণিজ্য
  3. আইন-বিচার
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আবহাওয়া
  6. কৃষি ও প্রকৃতি
  7. খেলাধুলা
  8. গণমাধ্যম
  9. চাকরি
  10. জাতীয়
  11. ধর্ম
  12. নির্বাচন
  13. প্রবাসের খবর
  14. ফিচার
  15. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
  16. বিনোদন
  17. বিশেষ প্রতিবেদন
  18. রাজনীতি
  19. শিক্ষাঙ্গন
  20. শেখ হাসিনার পতন
  21. সম্পাদকীয়
  22. সারাদেশ
  23. স্বাস্থ্য
  24. হট আপ নিউজ
  25. হট এক্সলুসিভ
  26. হাই লাইটস

“সময়, শ্রম ও প্রাপ্যের ন্যায্যতা”

জে এম আলী নয়ন
মার্চ ৮, ২০২৬ ১১:৩৫ অপরাহ্ণ
  • “সময়, শ্রম ও প্রাপ্যের ন্যায্যতা”

    এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

Link Copied!

মানুষ যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করে, তখন সে কেবল একটি দায়িত্ব পালন করে না; সে তার জীবনের একটি অংশ সেখানে বিনিয়োগ করে। প্রতিটি কর্মঘণ্টার ভেতরে লুকিয়ে থাকে সময়, পরিশ্রম, চিন্তা, দক্ষতা এবং কখনো কখনো ব্যক্তিগত ত্যাগও। কেউ হয়তো ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে জীবিকার সন্ধানে বের হয়, কেউ সারাদিন শারীরিক শ্রম দেয় নির্মাণক্ষেত্রে বা মাঠে, আবার কেউ অফিসের ডেস্কে বসে মানসিক শ্রম ব্যয় করে একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য পরিকল্পনা তৈরি করে। তাই শ্রমের বিনিময়ে যে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়, তা কেবল অর্থের বিনিময় নয়— এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব, একটি সামাজিক চুক্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে একটি আমানত।

একটি সুস্থ সমাজ বা সুস্থ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো এই আমানতকে যথাযথভাবে রক্ষা করা এবং যার প্রাপ্য তাকে তার অধিকার যথাসময়ে পৌঁছে দেওয়া। কারণ শ্রমের মূল্য যদি সঠিক সময়ে মানুষের হাতে না পৌঁছায়, তাহলে শুধু একজন মানুষের আর্থিক ক্ষতিই হয় না; তার মানসিক শান্তিও বিঘ্নিত হয়। তার দৈনন্দিন পরিকল্পনা ব্যাহত হয়, পরিবার অনিশ্চয়তার ভেতরে পড়ে যায়, আর কর্মক্ষেত্রের প্রতি তার বিশ্বাসেও ধরে ফাটল।

মানবসমাজে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ব্যবস্থা চলে আসছে, আর তা হলো- মানুষ কাজ করে, তারপর নির্দিষ্ট সময়ের শেষে তার পারিশ্রমিক পায়। কেউ দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করে দিনের শেষে পায়, কেউ সাপ্তাহিক ভিত্তিতে, কেউ আবার মাসিক ভিত্তিতে। আধুনিক অর্থনীতিতে এটি একটি স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত কাঠামো। কিন্তু এই ব্যবস্থার ভেতরে কখনো কখনো এমন একটি দূরত্ব তৈরি হয়, যেখানে শ্রম আর প্রাপ্তির মাঝখানে সময়ের একটি দীর্ঘ ব্যবধান দাঁড়িয়ে যায়। সেই ব্যবধান অনেক সময় মানুষকে অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা এবং মানসিক চাপের ভেতরে ফেলে দেয়।

গ্রামবাংলার একটি পরিচিত দৃশ্য কল্পনা করা যেতে পারে। একজন দিনমজুর ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেন। কখনো ধানক্ষেতে তো কখনো ইটভাটায় তো আবার কখনো নির্মাণকাজে। সারাদিনের কঠোর পরিশ্রম শেষে যখন তিনি তার পারিশ্রমিক হাতে পান, তখন সেই অর্থ কেবল তার শ্রমের মূল্য নয়; সেটি তার পরিবারের খাবারের নিশ্চয়তা, সন্তানের ওষুধ কেনার সামর্থ্য কিংবা পরদিনের প্রয়োজনীয় খরচের ভিত্তি। কিন্তু যদি কোনো কারণে সেই পারিশ্রমিক বিলম্বিত হয়, তাহলে তার পুরো দিনের পরিশ্রম যেন এক ধরনের অনিশ্চয়তার ভেতরে ঝুলে থাকে।

একইভাবে শহরের একজন কর্মচারীর কথাও ভাবা যেতে পারে। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানে মাসব্যাপী কাজ করেন, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তার জীবনের প্রয়োজনগুলো তো মাসের শেষে এসে একসাথে উপস্থিত হয় না। বাড়িভাড়া, বাজার, ওষুধ, সন্তানের পড়াশোনা— এসব প্রয়োজন প্রতিদিনের জীবনের অংশ। অথচ পারিশ্রমিক যদি কেবল মাসের শেষ দিনটির সঙ্গে বাঁধা থাকে, তাহলে সেই দীর্ঘ অপেক্ষা অনেক সময় অদৃশ্য মানসিক চাপ তৈরি করে।

এই বাস্তবতার ভেতরেই ইসলামিক অর্থনৈতিক দর্শন একটি গভীর নৈতিক নির্দেশনা প্রদান করেছে। ইসলামে শ্রমিকের অধিকারকে অত্যন্ত সম্মানজনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদা (সাঃ) একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে বলেছেন— “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।”

এই সংক্ষিপ্ত বাক্যের ভেতরে একটি গভীর অর্থনৈতিক ও নৈতিক দর্শন নিহিত রয়েছে। এখানে কেবল পারিশ্রমিক দেওয়ার কথা বলা হয়নি; বলা হয়েছে সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে। অর্থাৎ শ্রম যেন অবহেলিত না হয়, এবং শ্রমের মূল্য যেন বিলম্বের কারণে তার মর্যাদা হারিয়ে না ফেলে। এই নির্দেশনার ভেতরে লুকিয়ে আছে ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যের একটি শক্তিশালী ধারণা।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি ভিন্ন ধরনের কর্মব্যবস্থার ধারণা কল্পনা করা যেতে পারে। এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে কাজের মূল্য সময়ের শেষ প্রান্তে গিয়ে হঠাৎ করে উপস্থিত হয় না; বরং কাজের ধারাবাহিকতার ভেতরেই ধীরে ধীরে মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসে। এখানে প্রাপ্তি কোনো দূরের প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া।

ধরা যাক, কেউ দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করছে। প্রচলিত ব্যবস্থায় সে দিনের শেষে তার পারিশ্রমিক পায়। কিন্তু একটি উন্নত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থায় এমন একটি কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে দিনের কাজ চলমান থাকা অবস্থাতেই তার প্রাপ্যের হিসাব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কাজ যত এগোবে, তার প্রাপ্যের নিশ্চয়তাও তত দৃশ্যমান হবে। প্রযুক্তির যুগে এটি আর কল্পনার বিষয় নয়। ডিজিটাল হিসাবব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় পেমেন্ট ব্যবস্থা কিংবা মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে কাজের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে প্রাপ্যের হিসাবও পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান করা সম্ভব।

সাপ্তাহিক ভিত্তিতে যারা কাজ করে, তাদের ক্ষেত্রেও একই নীতি কার্যকর হতে পারে। সপ্তাহের শেষ দিনটি একমাত্র নির্ভরতার জায়গা হয়ে থাকবে না। বরং সপ্তাহের প্রতিটি দিনের কাজের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে একটি স্বচ্ছ হিসাব তৈরি হবে, যেখানে কর্মী বুঝতে পারবে তার পরিশ্রমের মূল্য কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।

মাসিক কর্মব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিন্তা প্রয়োগ করা যেতে পারে। একটি মাস অনেক সময় দীর্ঘ মনে হয়, বিশেষ করে যখন মানুষের প্রয়োজন প্রতিদিনের। কিন্তু যদি এমন একটি ব্যবস্থা থাকে যেখানে মাসের শেষ দিনটির উপর সবকিছু নির্ভর করে না, বরং মাসের ভেতরেই প্রাপ্তির একটি ধারাবাহিক প্রবাহ তৈরি হয়, তাহলে কর্মীর মানসিক স্থিরতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে করে কর্মক্ষেত্রে একটি নতুন ধরনের বিশ্বাস জন্ম নিতে পারে— যেখানে মানুষ জানবে যে তার পরিশ্রমের মূল্য দূরের কোনো ক্যালেন্ডারের সঙ্গে বাঁধা নেই।

আর যারা শতাংশ বা অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করে, তাদের ক্ষেত্রেও একই নীতি কার্যকর হতে পারে। তাদের কাজের ফলাফল যত এগোবে, ততই তাদের অংশ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এতে করে অর্জন এবং প্রাপ্যের মাঝখানে অদৃশ্য কোনো দেয়াল তৈরি হবে না। বরং কাজের সাফল্য এবং ব্যক্তিগত প্রাপ্তি সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলবে।

এই ধরনের ব্যবস্থার একটি বড় উপকারিতা হলো— এটি কর্মক্ষেত্রে আস্থার পরিবেশ তৈরি করে। যখন মানুষ অনুভব করে যে তার শ্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং তার প্রাপ্য বিলম্বের ভেতরে আটকে নেই, তখন তার ভেতরে এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত আন্তরিকতা জন্ম নেয়। সেই আন্তরিকতা তাকে দায়িত্বশীল করে তোলে, এবং সেই দায়িত্বশীলতাই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

ইসলামিক অর্থনীতিতে “আমানত” শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দায়িত্ব যখন কারও হাতে দেওয়া হয়, তখন সেই দায়িত্বের ভেতরে অন্যের অধিকারও আমানত হিসেবে থাকে। একজন কর্মীর শ্রম, সময় এবং দক্ষতা একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার পারিশ্রমিকও সেই প্রতিষ্ঠানের কাছে একটি আমানত। এই আমানতকে যথাসময়ে ফিরিয়ে দেওয়া কেবল একটি অর্থনৈতিক দায়িত্ব নয়; এটি একটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্বও।

একটি প্রতিষ্ঠানের শক্তি কেবল তার মূলধন বা অবকাঠামোর উপর নির্ভর করে না। অনেক সময় একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে থাকে মানুষের বিশ্বাসের ভেতরে। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে এখানে তার শ্রমের মূল্য রয়েছে, তার প্রাপ্য নিরাপদ, এবং তার অধিকার সম্মানের সঙ্গে রক্ষা করা হচ্ছে—তখন সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক কেবল চাকরি বা কাজের সম্পর্ক থাকে না। তখন সেটি একটি আস্থার সম্পর্ক হয়ে ওঠে।

এই ধরনের কর্মব্যবস্থা বাইরে থেকে দেখলে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। সেখানে নিয়ম থাকবে, হিসাব থাকবে, দায়িত্ব থাকবে। কিন্তু ভেতরের স্তরে একটি সূক্ষ্ম দর্শন কাজ করবে— যেখানে সময়কে কেবল অপেক্ষার মাপকাঠি হিসেবে দেখা হবে না। বরং সময়কে ব্যবহার করা হবে ন্যায্যতার একটি সেতু হিসেবে।

যখন একটি সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেই সমাজ আরও স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। মানুষ তখন জানে— তার পরিশ্রমের মূল্য আছে, তার অধিকার সম্মানের সঙ্গে রক্ষা করা হবে। সেই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় দায়িত্ববোধ, আন্তরিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা।

এভাবে ধীরে ধীরে একটি নতুন ধারণা গড়ে উঠতে পারে— যেখানে কাজ এবং প্রাপ্তির মাঝখানে অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব থাকবে না। বরং কাজের প্রবাহের মধ্যেই প্রাপ্যের নিশ্চয়তা ধীরে ধীরে মানুষের হাতে পৌঁছে যাবে। তখন সময় আর শুধু অপেক্ষার প্রতীক থাকবে না; সময় হয়ে উঠবে ন্যায়, আস্থা এবং আমানতদারিতার একটি জীবন্ত প্রকাশ।

শীর্ষ সংবাদ | নয়ন

জে এম আলী নয়ন

জে এম আলী নয়ন

সাব এডিটর

সর্বমোট নিউজ: 6251

Share this...
বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বে-আইনি।
আরও দেখুন