লক্ষ্মীপুরের রায়পুর ও সদর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একসময়ের খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদী আজ প্রায় পানিশূন্য। চার দশক আগেও নদীটি ছিল এ অঞ্চলের প্রধান নৌপথ। পালতোলা নৌকা, লঞ্চ ও মালবাহী ট্রলারের ব্যস্ত চলাচলে মুখর ছিল নদীপথ। কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে এখান থেকেই সেচের পানি পেতেন, মিলত দেশীয় মাছের প্রাচুর্য। হাজারো মানুষের জীবিকা নির্ভর ছিল এই নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির ওপর।
কিন্তু সময়ের ব্যবধানে নাব্যতা হারিয়ে ডাকাতিয়া এখন অনেক স্থানে বালুচর, কোথাও কচুরিপানায় ভরা মরা খাল। খনন না হওয়ায় কৃষকরা সেচের পানির অভাবে বাড়তি খরচে চাষাবাদ করছেন। একসময়ের আশীর্বাদস্বরূপ নদীটি এখন অনেকের কাছে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একদিন পরিষ্কার, তারপর নীরবতা
২০২৪ সালের ১২ জুলাই রায়পুর পৌর শহর অংশে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কচুরিপানা ও আবর্জনা পরিষ্কার করা হয়। পোস্ট অফিস সড়কের ওয়াপদা কলোনি থেকে বাঁধ পর্যন্ত চলে এই কার্যক্রম। তবে এরপর আর কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
দখল-দূষণে সংকুচিত নদীপথ
সোমবার (২ মার্চ) সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর তলদেশ ফেটে চৌচির; কোথাও ফসলের আবাদ, কোথাও মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। দুই তীরে প্রভাবশালীদের স্থাপনা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতঘর গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন হোটেল ও কারখানার বর্জ্য ফেলে নদীর পানি দূষিত করা হচ্ছে।
ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লা ও ফেনি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ডাকাতিয়া চাঁদপুর-ফরিদগঞ্জ অতিক্রম করে রায়পুরে মেঘনায় মিলিত হয়েছে। নদীটির দৈর্ঘ্য ২০৭ কিলোমিটার, প্রস্থ প্রায় ৬৭ মিটার (২২০ ফুট) হলেও বর্তমানে কোথাও সেই প্রস্থ খুঁজে পাওয়া যায় না। বহু স্থানে তা ৩০-৪০ ফুটে নেমে এসেছে।
স্থানীয়দের ক্ষোভ
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিদিন বাসাবাড়ি, হোটেল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলা হচ্ছে। একসময় এই নদীপথে বড় জাহাজ ও লঞ্চ চলাচল করত, আশপাশের জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা রায়পুরে আসতেন। হাজারো জেলে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন দখলদারিত্ব ও দূষণে নদীটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে।
খননের প্রস্তাব, অপেক্ষা অনুমোদনের
লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ডাকাতিয়া নদীসহ রায়পুরে ৭টি খাল—চরবংশী, এফ করিম, সি-ফোর, সি-ওয়ান, ই-ওয়ান ও ইওয়ান-এ—খননের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে খননকাজ শুরু হবে। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএর সহযোগিতায় উচ্ছেদ অভিযান চালানোর কথাও জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরে সুশীল সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে এবং সরকার গঠনের পর থেকেই দৃশ্যমান অগ্রগতি শুরু হয়েছে।
এখন প্রশ্ন—প্রস্তাবিত খনন ও উচ্ছেদ কার্যক্রম কত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে? নাকি অবহেলা ও দখলদারিত্বের চাপে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেবে একসময়ের খরস্রোতা ডাকাতিয়া?


