ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন। শনিবার তার কম্পাউন্ডে চালানো ওই হামলার পর রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম বিষয়টি নিশ্চিত করে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও জানিয়েছিলেন, শনিবার যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় খামেনির মৃত্যু হয়েছে এবং তিনি ও অন্য শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তারা ‘যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ও অত্যাধুনিক ট্র্যাকিং সিস্টেম এড়াতে পারেননি’।
ইরানের আধা-স্বায়ত্তশাসিত বার্তা সংস্থা তাসনিম জানায়, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে আমেরিকা ও জায়োনিস্ট শাসনের যৌথ হামলায় ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ ইমাম সৈয়দ আলি খামেনি শহীদ হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরও জানায়, তেহরানে তার কম্পাউন্ডে চালানো ওই হামলায় খামেনির সঙ্গে তার কন্যা, কন্যার স্বামী ও নাতিও নিহত হয়েছেন।
১৯৮৯ সালে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনি দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়ে খোমেনি ইরানের দীর্ঘদিনের পাহলভি রাজতন্ত্রের অবসান ঘটান এবং বিপ্লবের আদর্শিক ভিত্তি গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে নেতৃত্বে এসে খামেনি ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করেন, যা শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং দেশের সীমানার বাইরে প্রভাব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে ১৯৮০-এর দশকে ইরান–ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্লেষকদের মতে, সেই তীব্র ও ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো ইরাকের নেতা সাদ্দাম হুসেইনকে সমর্থন দেওয়ায় বহু ইরানির মধ্যে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হয়, যা বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি খামেনির অবিশ্বাসকে গভীর করে তোলে। এই মনোভাবই তার ৩৭ বছরের শাসনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে এবং তিনি বিশ্বাস করতেন—ইরানকে বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে সবসময় প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকতে হবে।
ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও ‘ইরান গ্রান্ড স্ট্র্যাটেজি: অ্যা পলিটিক্যাল হিস্টোরি’ বইয়ের লেখক ওয়ালি নাসর বলেন, মানুষ ইরানকে ধর্মতন্ত্র হিসেবে দেখে, কারণ খামেনি পাগড়ি পরেন এবং রাষ্ট্রের ভাষা ধর্মভিত্তিক। কিন্তু বাস্তবে তিনি যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ইরানের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন। নাসরের ভাষায়, খামেনির দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন এবং বিপ্লব, ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ—এগুলো পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রেক্ষাপটে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) একটি আধাসামরিক বাহিনী থেকে শক্তিশালী নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানের বিস্তৃত প্রভাব প্রতিষ্ঠায় এই বাহিনী কেন্দ্রীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। একই সঙ্গে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে খামেনি স্বনির্ভরতা জোরদারে ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ নীতির পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়ে দৃঢ় সংশয় বজায় রাখেন।
তবে তার দীর্ঘ শাসনকাল বিভিন্ন সময়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হলে তা কঠোরভাবে দমন করা হয়। এরপর ২০২২ সালে নারী অধিকার ইস্যুতে দেশজুড়ে আবারও বড় ধরনের প্রতিবাদ দেখা দেয়, যা এবারও শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অর্থনৈতিক দুর্দশা ঘিরে নতুন করে বিক্ষোভ ও অস্থিরতা শুরু হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং বহু প্রতিবাদকারী সরাসরি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের উচ্ছেদের আহ্বান জানায়। এই দমন-পীড়নের সময় দেশটি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর সবচেয়ে সহিংস পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় বলে বিশ্লেষকদের মত।
সমালোচকদের দৃষ্টিতে, খামেনি ধীরে ধীরে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী থেকে দূরে সরে যান। তরুণদের একটি অংশ যেখানে সংস্কার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘ ছায়াযুদ্ধের নীতিতে তার অনড় অবস্থান ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ওয়ালি নাসরের মতে, জাতীয় স্বাধীনতার ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়ার মূল্য ইরানিদের অনেক বেশি দিতে হয়েছে এবং এ প্রক্রিয়ায় খামেনি জনগণের একটি অংশের আস্থা হারান।
১৯৩৯ সালে ইরানের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় পবিত্র শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন আলি খামেনি। তার বাবা ছিলেন একজন প্রখ্যাত মুসলিম নেতা, যিনি প্রতিবেশী ইরাক থেকে আসা আজারবাইজানি বংশোদ্ভূত। মায়ের প্রেরণায় ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও কবিতার প্রতি তার গভীর আগ্রহ গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে তিনি পাহলভি রাজপরিবারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত হন।
১৯৫৩ সালে যুক্তরাজ্যের এমআইসিক্স ও যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ’র পরিকল্পিত অভ্যুত্থানে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হন, যিনি দেশটির তেল শিল্প জাতীয়করণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এরপর পুনরায় পাহলভি পরিবার ক্ষমতায় ফিরে আসে। ওই সময় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খামেনিকে বারবার গ্রেপ্তার করে রেজা শাহ পাহলভির গোপন পুলিশ ‘সাভাক’ এবং এক পর্যায়ে তাকে ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রত্যন্ত শহর ইরানশাহরে নির্বাসন দেওয়া হয়।
১৯৭৮ সালে নির্বাসন শেষে ফিরে এসে তিনি পাহলভি শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, যা পরবর্তীতে ইসলামিক বিপ্লবের পথ সুগম করে এবং রেজা শাহের পতন ঘটে। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে তিনি দ্রুত নতুন ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ১৯৮০ সালে স্বল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবেও ভূমিকা রাখেন। অনলবর্ষী বক্তা হিসেবে তিনি তেহরানের জুমার নামাজের নেতৃত্বের প্রভাবশালী পদেও ছিলেন।
১৯৮১ সালে মোজাহেদিন-ই-খালক (এমইকে) নামের একটি সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর হত্যাচেষ্টা থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান খামেনি, তবে তার ডান হাত স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যায়। একই বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি ইরানের প্রথম মৌলভী প্রেসিডেন্ট হন। এরপর ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে টানা ৩৭ বছর ইরানকে নেতৃত্ব দেন তিনি।



