বিএনপি চেয়ারপার্সন, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় আয়োজিত দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ক সহ-সম্পাদক, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং পবা–মোহনপুর আসনে বিএনপির মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবন দিয়ে দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে গেছেন।”
তিনি দোয়ায় উপস্থিত সকলের প্রতি বিএনপি ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জীবনে অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিনি নিজ বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন, হারিয়েছেন তাঁর স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোকে। এত দুঃখ-কষ্টের পরও তিনি কখনো দেশবাসীকে ছেড়ে যাননি।
মোহনপুর উপজেলার ধুরইল ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণের আয়োজনে এবং ধুরইল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও মোহনপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কাজিম উদ্দিন সরকারের সার্বিক তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই দোয়া মাহফিলে মিলন আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালে। ১৯৬০ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। ১৯৬৫ সালে ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তানের পক্ষে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সেই যুদ্ধে ভারত পরাজিত হয়। একজন সেনা সদস্য যুদ্ধে গেলে তাঁর পরিবারের সদস্যদের মানসিক অবস্থার কথা কেবল তারাই বুঝতে পারেন। তখন থেকেই বেগম খালেদা জিয়া নিজেকে কঠিন সময়ের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। মাত্র বিশ বছর বয়সেই তিনি কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হন।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে রক্ষার জন্য মেজর জিয়াউর রহমান পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। একজন সামরিক সদস্য যদি নিজের দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, সেই দেশের দৃষ্টিতে তাঁর কী পরিণতি হয় তা সবাই জানেন। সেই সংকটময় অবস্থায় বেগম খালেদা জিয়া পাকিস্তান থেকে জাহাজে করে চট্টগ্রামে আসেন এবং সেখান থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় পৌঁছালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে তিনি দীর্ঘ নয় মাস বন্দি ছিলেন। এই সময়েই তিনি নিজেকে আরও দৃঢ়চেতা করে গড়ে তোলেন।
মিলন বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শুধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই থেমে থাকেননি, তিনি নিজেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন। তেমনি বেগম খালেদা জিয়াও বন্দি অবস্থায় দেশের স্বাধীনতার জন্য রণাঙ্গনে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিয়মিত দোয়া করতেন।
তিনি আরও বলেন, ১৯৮১ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শাহাদাতবরণ করার পর বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দল বেইমানি ও মোনাফেকি করলেও তিনি একাই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নেতৃত্ব দেন এবং এরশাদ সরকারের পতন ঘটান। পরে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি তাঁর স্বামীর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে প্রাণান্ত চেষ্টা চালান। তিনি মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন, নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রণালয় গঠন করেন এবং রাষ্ট্রে প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা বাতিল করে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।
মিলন অভিযোগ করে বলেন, সেই নেত্রীকে মিথ্যা মামলার সাজানো রায়ে দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর কারাগারে রাখা হয়েছিল। গুরুতর অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাঁর কক্ষে তেলাপোকা, টিকটিকি ও ইঁদুর ছেড়ে দেওয়া হতো, যার ফলে ধীরে ধীরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তিনি আর সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেননি। অবশেষে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর তিনি দেশবাসীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান।
তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে শিখিয়ে গেছে। তাঁর জানাজায় বিশ্বের ২৬টি দেশের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেছিলেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পর বিশ্বের আর কোনো নেতার জানাজায় এত মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়নি।
বক্তব্যের শেষে তিনি বেগম খালেদা জিয়া, আরাফাত রহমান কোকো, জুলাই যুদ্ধে শহীদ সকল বীর, দীর্ঘ সতেরো বছর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিহত বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী-সমর্থকসহ সকল মৃত মুসলমানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। পাশাপাশি অসুস্থদের সুস্থতা কামনা করে আসন্ন নির্বাচনে ধানের শীষের পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
দোয়া মাহফিলে সভাপতিত্ব করেন ধুরইল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোখলেসুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্য ও মোহনপুর উপজেলা সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আব্দুস সামাদ, জেলা বিএনপির সদস্য ও নওহাটা পৌরসভার সাবেক মেয়র শেখ মকবুল হোসেন, জেলা বিএনপির সদস্য ও পবা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব সহকারী অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, জেলা বিএনপির সদস্য কামরুজ্জামান হেনা, মোহনপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শামিমুল ইসলাম মুন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুব আর রশিদ, সাংগঠনিক সম্পাদক বাচ্চু রহমান, শাহীন আক্তার সামসুজ্জাহা, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কাজিম উদ্দিন সরকার এবং কেশরহাট পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক খুশবুর রহমান।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন নওহাটা পৌর বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিক, জাহানাবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জিল্লুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মাসুদুর রহমান লিটন, মোহনপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম, জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দা রুমেনা হক, মোহনপুর উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক ও সদস্য সচিব মাহমুদুল হাসান রুবেলসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ।




