চলমান শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত রাজশাহীর জনজীবন। কুয়াশার তেমন ঘনত্ব না থাকলেও হাড়কাঁপানো হিমেল হাওয়ায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে বহুগুণ। এই শীতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন প্রকৃত দুঃস্থ ও ভাসমান মানুষ। কেউ প্রয়োজনেও একটি কম্বল পাচ্ছেন না, আবার কেউ প্লাস্টিকের বস্তা গায়ে জড়িয়ে কম্বলকে পুঁজি করে ব্যবসায় নেমেছেন— এমন চিত্রই এখন চোখে পড়ছে রাজশাহীতে।
শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৮টার দিকে রাজশাহী মহানগরীর রেলস্টেশনে দেখা যায়, প্রায় ৭০ জন মানুষ প্লাস্টিকের বস্তা গায়ে জড়িয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। কারও গায়ে কম্বল নেই, কেউবা আশায় বসে আছেন—কখন কোনো সহায়তা আসবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলস্টেশনের এক কুলি জানান, তিনি প্রায় পাঁচ বছর ধরে এই স্টেশনে কাজ করছেন। তার ভাষায়—
“এবার দেখছি, অনেকেই প্লাস্টিকের বস্তা গায়ে দিয়ে রাত ১২টা পর্যন্ত শুয়ে থাকে কম্বলের আশায়। যারা প্রকৃত অসুস্থ বা একেবারে গরিব, তারাই ঠিকমতো কম্বল পায় না। অথচ কিছু মানুষ এটাকে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছে। তারা কোনো কোনো দিন একাধিক কম্বল পায় এবং পরে সেগুলো কুলি, গাড়ির স্টাফ, দোকানদার বা অটোরিকশা চালকদের কাছে বিক্রি করে দেয়। সঠিক মানুষকে কম্বল দিলে সত্যিকারের উপকার হতো।”
এক অটোরিকশা চালক বলেন, বুধবার ও বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে কম্বল বিতরণ করেছিলেন। কিন্তু শুক্রবার রাতে অনেকের গায়েই একটি কম্বলও নেই।
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন স্থানীয়রাও।
এদিকে পাবনার ঈশ্বরদী থেকে আসা রাজশাহী রেলস্টেশনের মেইন গেটের সামনে প্লাস্টিকের বস্তা গায়ে জড়িয়ে শুয়ে থাকা প্রায় ৫০ বছর বয়সী এক নারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা প্রকৃত গরিব। আমার তিনবার ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে। ঠিকমতো কথা বলতে পারি না, হাত-পাও ভালোভাবে চলে না। আমাকে যদি একটি কম্বল দেন, খুব উপকার হয়।
শৈত্যপ্রবাহের তীব্রতায় রাজশাহী জেলার জনজীবন অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। শহর ও গ্রামের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই—সবখানেই শীতের প্রভাব স্পষ্ট। বিশেষ করে দিনমজুর, ভাসমান মানুষ ও খেটে খাওয়া মানুষের কষ্ট সবচেয়ে বেশি। খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো এসব মানুষের দুর্ভোগ দেখার যেন কেউ নেই।
রাজশাহী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আব্দুল হাই সরকার বলেন, আমরা শীতবস্ত্র ও কম্বল বিতরণ করছি। আগে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এ কাজ করতেন, ফলে প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রকৃত দুঃস্থ মানুষ সহযোগিতা পেত। তারা মানুষ চিহ্নিত করতে পারতেন। বর্তমানে জনপ্রতিনিধি না থাকায় সঠিক যাচাই করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে, যার সুযোগ নিচ্ছে কিছু মানুষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শীতের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। তবে জীবিকার তাগিদে দিনমজুর ও ভাসমান মানুষ বাধ্য হয়ে এই প্রচণ্ড শীতেও কাজের সন্ধানে বের হচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃত অসহায় মানুষের জন্য দ্রুত শীতবস্ত্র বিতরণ ও জরুরি মানবিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন তারা।




