জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে নিয়ে ভারতে আশ্রিত বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে পলাতক অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণার পর তাঁদের প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে নয়াদিল্লিকে আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশ সরকার জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়া কোনোভাবেই বন্ধুসুলভ আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।
তবে গত সোমবার রায়ের পর ভারত যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, সেটি ছিল স্পষ্টতই কৌশলী এবং সেখানে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সম্পর্কে কোনো উল্লেখ ছিল না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখে দিল্লি তার প্রচ্ছন্ন নেতিবাচক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। বিবৃতিতে বলা হয়, রায় ভারতের নজরে আছে এবং দেশটি “বাংলাদেশের শান্তি, গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে” সব পক্ষের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করবে।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে রায়ের পর ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। তবে কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে ভারত ফেরত দেবে—এমন সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভারত যদি তাঁকে ফেরত না দেয়, তাহলে বাংলাদেশের কাছে বিকল্প কী?
২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত ভারত–বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির লক্ষ্য ছিল দুই দেশের মধ্যে অপরাধ ও সন্ত্রাস দমনে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা গড়ে তোলা এবং পলাতক আসামিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সুস্পষ্ট করা। চুক্তি অনুযায়ী, যে অপরাধে উভয় দেশে কমপক্ষে এক বছরের কারাদণ্ড হতে পারে, তা প্রত্যর্পণযোগ্য। এর মধ্যে হত্যা, সন্ত্রাস, অপহরণ, সহিংসতা, আর্থিক অপরাধ ও রাজস্ব-সম্পর্কিত অপরাধও অন্তর্ভুক্ত। এমনকি সহায়তা, উসকানি বা সহযোগী হিসেবে অংশ নেওয়াও অপরাধের আওতায় পড়ে। কোনো ব্যক্তি অভিযুক্ত, অভিযুক্ত হয়ে পলাতক বা দণ্ডিত হয়ে অন্য দেশে পালিয়ে গেলে—দুই দেশই তাকে ফেরত চাওয়ার আবেদন করতে পারে।
তবে কিছু পরিস্থিতিতে প্রত্যর্পণ নাকচ করা যেতে পারে। চুক্তির ৬(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, অপরাধ যদি রাজনৈতিক ধরনের হয়, তাহলে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যাবে। যদিও ৬(২) অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, হত্যা, সন্ত্রাস, অপহরণ, হত্যায় প্ররোচনা, সহিংসতা বা অস্ত্র-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধ রাজনৈতিক হিসেবে গণ্য হবে না। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতনসহ গুরুতর অভিযোগ থাকায় এই ধারার প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। চুক্তির ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে, অভিযোগ খুব তুচ্ছ হলে, অভিযোগের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলে, কিংবা ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে বা খারাপ বিশ্বাসে অভিযোগ আনা হলে—প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে। এছাড়া শুধুই সামরিক প্রকৃতির অপরাধ হলে এবং সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ না হলে প্রত্যর্পণ নাকচ করা সম্ভব।
দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পাশাপাশি ভারত ১৯৬২ সালের এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট অনুসরণ করে। এই আইনের ২৯ ও ৩১ ধারায় প্রত্যর্পণ অস্বীকারের কয়েকটি শর্ত নির্ধারিত আছে—অপরাধটি রাজনৈতিক হলে, কোনো রাজনৈতিক কারণে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকলে, মামলার সময়সীমা অতিক্রান্ত হলে বা পলাতক ব্যক্তি ভারতে কোনো মামলায় যুক্ত থাকলে বা সাজা ভোগ করলে—তাঁকে ফেরত দেওয়া যাবে না। এছাড়া অনুরোধকারী দেশকে নিশ্চিত করতে হবে যে ব্যক্তিকে শুধু সেই অপরাধেই বিচার করা হবে, যেটি প্রত্যর্পণযোগ্য এবং ভারতের অনুমোদিত।
ভারতের আদালতও এ বিষয়ে বেশ কিছু নজির স্থাপন করেছে। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আইনসিদ্ধ প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।’ সুপ্রিম কোর্টের মতে, এই অধিকার ভারতের মাটিতে অবস্থানকারী যেকোনো বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আদালতের বিভিন্ন রায়ে বলা হয়েছে, আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত না করে কাউকে এমন কোনো দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার মৃত্যু, নির্যাতন বা অমানবিক আচরণের আশঙ্কা রয়েছে। ১৯৯৮ সালের কাতিয়ার আব্বাস হাবিব আল-কুতাইফি বনাম ভারত সরকার মামলায় ইরাকের দুই আশ্রয়প্রার্থীকে ফেরত পাঠানো বন্ধ করা হয়। গুজরাট হাইকোর্ট আন্তর্জাতিক আইনের নন-রিফাউলমেন্ট নীতির উল্লেখ করে জানায়, কোনো ব্যক্তির জীবন বা স্বাধীনতা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এমন দেশে ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ। ভারত ১৯৫১ সালের শরণার্থী সনদে স্বাক্ষরকারী না হলেও এই নীতিকে আন্তর্জাতিক প্রচলিত আইন হিসেবে মানে, যা প্রতিফলিত হয়েছে আইসিসিপিআরে, যার সদস্য ভারত।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশের কী করার আছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, আনুষ্ঠানিক নোট, বৈঠক বা যৌথ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে দিল্লির ওপর চাপ বাড়ানো যেতে পারে। তবে দুই দেশের ক্ষমতার ভারসাম্য, ভূরাজনীতি ও বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনায় এই চাপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বা আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিষয়টি উত্থাপন করে আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা যেতে পারে। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া, বিশেষত মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল করতে পারে। চাইলে বাংলাদেশ ভারতের উদ্বেগ কমাতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়া বা নতুন বিচার কাঠামোর প্রতিশ্রুতি দিতে পারে। যদিও সাধারণত প্রত্যর্পণ বিরোধ আন্তর্জাতিক আদালতে তোলা যায়, শক্তিশালী আঞ্চলিক ক্ষমতা হিসেবে ভারতের বিরুদ্ধে এমন পদক্ষেপ বাস্তবে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, যেসব দেশে মৃত্যুদণ্ড নেই, তারা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিকে ফেরত দেয় না। এ বাস্তবতা শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থান অনুমান করতে সাহায্য করে। ২০১৩ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যার মামলায় আশরাফুজ্জামান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাঁদের ফেরত দেয়নি। মুঈনুদ্দীন লন্ডনে সংগঠনের নেতৃত্বে যুক্ত আছেন, আর আশরাফুজ্জামান পেনসিলভানিয়ায় নাগরিকত্বসহ বসবাস করছেন। তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী সে সময় বলেছিলেন, মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ায় এসব দেশ তাঁদের ফেরত দেয়নি। একইভাবে ১৯৯৬ সাল থেকে কানাডায় অবস্থানরত বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দণ্ডিত আসামি নূর চৌধুরীকেও কানাডা মৃত্যুদণ্ডবিরোধী নীতি অনুসরণ করে ফেরত দেয়নি। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার খুনিদের মতো বুদ্ধিজীবী হত্যার আসামিদেরও ফিরিয়ে আনা যায়নি, কারণ সংশ্লিষ্ট দেশগুলো মৃত্যুদণ্ডবিরোধী।




