ঢাকাThursday , 25 August 2022
  1. অন্যান্য
  2. অপরাধ
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-বিচার
  5. আন্তর্জাতিক
  6. আবহাওয়া ও কৃষি
  7. খেলাধুলা
  8. গনমাধ্যাম
  9. চাকরি
  10. জাতীয়
  11. ধর্ম
  12. নির্বাচন
  13. প্রবাসের খবর
  14. প্রযুক্তি সংবাদ
  15. ফিচার

বিলুপ্তির পথে মসজিদের মক্তব শিক্ষা.!

Link Copied!

হাবিব, মিনহাজ ও রুবেল তাদের তিনজনেরই বয়স ১০-১২ বছর। তারা বৃহস্পতিবার সকাল সাতটার সময় লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার পশ্চিম কাঞ্চনপুর গ্রামে বন্ধ চা দোকানের সামনে আড্ডায় মেতেছিলো। মসজিদের মক্তবে না গিয়ে দোকানের সামনে কেন ? এপ্রশ্ন করতেই তারা তিনজনই দোকানের সামনে থেকে ভোঁ -দৌড়। পরে মসজিদে গিয়ে দেখা যায় ইমাম সাহেব ৭-৮ জন শিশুকে নিয়ে মক্তবে পাঠদান করাচ্ছেন।।

চিরায়ত বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শত সহস্র বছরের জ্ঞানের আলো বিতরণকারী কোরআন শিক্ষাকেন্দ্র মক্তব। চিরচেনা সেই মক্তব শিক্ষার কথা এখনও বৃদ্ধদের মনে পড়ে। স্মৃতির পাতায় এখনও অপকটে দাগকাটে সেই সকাল বেলার মধুর সুরে আওয়াজ করে কোরআন তেলাওয়াত করার শৈশবের দিনগুলো। আগের মত এখন আর কঁচি-কাঁচা, শিশু-কিশোরদের কোরআন শিক্ষার জন্য মক্তবে যেতে দেখা যায় না। কালিমা তায়্যিবা আর আলিফ, বা, তা -এর শব্দে মুখরিত হয়ে উঠে না গ্রামে মসজিদগুলোতে।

জেলা ও অন্যন্ন স্থানেও শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করতেন স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা। কিন্তু সম্প্রতিককালে বিভিন্ন বেসরকারি স্কুল, কিন্ডার গার্টেন স্কুলে মর্নিং শিফট চালু হওয়ায় একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী মক্তবের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ছিল কোরআন শুদ্ধ করে জানে এমন একটি মেয়েই হবে ঘরনী। যাতে বাড়ি-ঘর কোরআনের শব্দে বরকতময় হয়ে উঠে। এখন সেই ঐতিহ্য মুছে যাচ্ছে মুসলিম সমাজ থেকে। একসময় বাংলার পথে-ঘাটে ভোরের পাখিদের সঙ্গে সঙ্গে মক্তবগামী কোরআনের পাখিদের দেখা মিলত। মুসলিম পরিবারে শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা কালিমা, নামাজ, রোজা, হজ, যাকাতসহ ধর্মীয় মাসয়ালা- শেখার অন্যতম ব্যবস্থা ছিলো এটি। ইহকালে শান্তি ও পরকালের নাজাতের শিক্ষার শুরু মক্তব থেকেই।

ভোর থেকে কিন্ডার গার্টেন শিক্ষা চালু হ্ওয়ায় শিশুরা মক্তবের এই ন্যূনতম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এটি তাদের কোরআন শেখা তথা দ্বীন শেখার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাবে তৈরি হচ্ছে ধর্মীয় জ্ঞানশূন্য একটি বিশাল জনগোষ্ঠী। ধর্মীয় জ্ঞানের অভাবে নীতি-নৈতিকতাহীনতার দিকে ধাবিত হচ্ছে সমাজ। যার ফলে প্রাত্যহিক জীবনে ঘটছে অনাচার-অবিচার, জুলুম, অন্যায়সহ নানাবিদ স্খলনের ঘটনা।

মক্তবের অর্থ:–
মক্তব আরবি শব্দ। শাব্দিক অর্থ পাঠশালা বা বিদ্যালয়। শিশুদের কোরআন শিক্ষার তথা ইসলাম সম্পর্কে প্রাথমিক বা মৌল জ্ঞানার্জনের শিক্ষা কেন্দ্র হলো মক্তব। মুসলিম পরিবারের শিশুদেরকে আরবী হরফ, কোরআন পড়া-শেখা তথা কোরআনের তেলাওয়াত শেখার পাশাপাশি নামাজ-রোজার নিয়ম কানুন, জরুরি মাসয়ালা-মাসায়িল, দোয়া-কালাম, আদব-কায়দা, ধর্মীয় রীতিনীতি শিক্ষার একমাত্র ভরসা ছিলো মক্তব।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরআন তেলাওয়াতের প্রতি অত্যধিক গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘ সে-ই উত্তম, যে কোরআন শিখে ও অন্যকে শিখায়।’ (বোখারি : ৫০২৮)। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘কোরআনের একটি হরফ পড়লে একটি নেকি।’

কাঞ্চনপুর-গ্রামের তোফায়েল আহাম্মেদ ও সবির পাটোয়ারী নামের পঁচাত্তর বয়সি বৃদ্ধ বলেন, ৩০- ৩৫ বছর আগেই মসজিদ থেকে মক্ত্যব হারিয়ে গেছে। রাত ২টা পর্যন্ত মা-বাবার সাথে সন্তানরা জেগে থাকে এবং পরদিন সকালে ঘুম থেকে ৮-৯ টা সময় উঠলে কিভাবে মক্তবে যাবে ? সরকার বেত ব্যবহার নিষেধ করাতেও ছাত্ররা আরো নষ্ট হচ্ছে । আগে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।

পৌরসভার বকসি বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম ও শিক্ষক আবুল কাশিম বলেন, অভিভাবকরা সচেতন না হওয়ায় সন্তানরা ভোরবেলায় মক্তবে আসেনা। ১০-১২ জনকে নিয়েই মক্তব সময় শেষ করতে হয়। এসব বিষয়ে প্রতি শুক্রবার জুমার দিনে অভিভাবকের জানালেও তারা ভোর বেলায় সন্তানদের মক্তবে পাঠাচ্ছেন না।

রায়পুর উপজেলা ইমাম সমিতির সভাপতি ও আলিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা নিজাম উদ্দিন বলেন, পাড়া-মহল্লায় পাটি, মাদুর বিছিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়ের কোরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করা হতো। এভাবে শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে গড়ে উঠেছিল হাজারো মক্তব-মাদ্রাসা। সময়ের পরিক্রমায় সকালবেলা শিশু-কিশোররা টুপি, পাঞ্জাবি পরে দল বেঁধে কায়দা-সিপারা হাতে নিয়ে মক্তবে যাওয়ার দৃশ্য আগের মতো আর নজরে পড়ে না। ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি খুবই নগণ্য। রোজ সকালে কোরআনের আওয়াজ কঁচিকাঁচা শিশুদের কন্ঠ থেকে বের হয় না। অভিভাবকদের অবহেলার কারণে মসজিদের ইমাম সাহেবরা এখন মক্তবে কোরআন পড়ানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। যার কারণে শিশু-কিশোররা কোরআন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও দেখা গেছে, মক্তবগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এমনিতেই বন্ধ হয়ে গেছে। কোথাও যা-ও চালু আছে, সেগুলোতেও আগের মতো জৌলুস নেই। শিশুদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। বিভিন্ন অযুহাত দেখিয়ে এখন অভিভাবকেরা কঁচি-কাঁচা ও শিশু-কিশোরদের মক্তবে পাঠাতে চান না। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা সকালে ঘুম থেকে উঠলেই স্কুল, কোচিং অথবা কিন্ডার গার্টেনে ক্লাসের সময় হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রশংসার দাবি রাখে। ডিজিটালাইজেশনের ছোঁয়ায় কিন্ডার গার্টেন, ক্যাডেট মাদ্রাসা, কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানা, হিফজখানা, কোচিং ব্যবস্থার আড়ালেই হারিয়ে গেছে মক্তব শিক্ষা। এভাবে চলতে থাকলে আবহমান বাংলার আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইসলামী বুনিয়াদি শিক্ষার এ অবারিত ও ঐতিহ্যগত শিক্ষা ব্যবস্থার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। চিরতরে হারিয়ে যাবে এবং স্থান পাবে ইতিহাসের পাতায়। তাই অতীব গুরুত্বপূর্ণ এ শিক্ষা ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য বিকল্প পথ বের করা সময়ের দাবি।

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
ঢাকা অফিসঃ ১৬৭/১২ টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল ঢাকা- ১০০০ আঞ্চলিক অফিস : উত্তর তেমুহনী সদর, লক্ষ্মীপুর ৩৭০০