ঢাকাSunday , 24 July 2022
  1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আইন-বিচার
  4. আন্তর্জাতিক
  5. কৃষি বার্তা
  6. খেলাধুলা
  7. গনমাধ্যাম
  8. চাকরি
  9. জাতীয়
  10. ধর্ম
  11. প্রবাসের খবর
  12. প্রযুক্তি সংবাদ
  13. ফিচার
  14. ফ্যাশন
  15. বিনোদন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডক্টর ইউনুস সফল হবেন না

hhzrc
July 24, 2022 4:56 pm
Link Copied!

আলাউদ্দিন মল্লিক:

একটি পুরানো কথা 
বাংলা অঞ্চলে মহাজনী সুদি পেশার দাপট দীর্ঘসময় গ্রামাঞ্চলের অসংখ্য মানুষের জীবনকে তছনছ করেছে। গত শতকের ত্রিশ দশকে এই অবস্থা আরও তীব্র হয়। বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে সংকট সর্বব্যাপী হয়, ক্ষোভেরও বিস্তার ঘটে। চল্লিশ দশকে যখন সারা বাংলায় তেভাগা আন্দোলন চলছিল তখন কৃষক জনতার প্রতিপক্ষ হিসেবে ব্রিটিশ রাজ ছাড়াও উচ্চারিত হতো জমিদার, জোতদার ও মহাজনের নাম। সে সময়ের বহু কবিতা, পুঁথি, গান, যাত্রা, নাটক, পোস্টারে তাই ‘মহাজন’চরিত্র পাওয়া যায়।

গ্রামীণ সুদী মহাজনদের অতি প্রয়োজনীয় অবদান 
‘মহাজন’ শব্দটি সাধারণভাবে একটি পেশাগত অবস্থান নির্দেশ করে। বাংলাদেশে চলতি অর্থে শব্দটি নির্দেশ করে এমন এক জনগোষ্ঠীকে, যারা নির্যাতনমূলক অর্থব্যবসায়ী, সুদকারবারি। উচ্চহারে এবং চক্রবৃদ্ধি সুদের বিনিময়ে ঋণ প্রদানকারী। এরকম গোষ্ঠীর অস্তিত্ব প্রাচীনকালেও বহু অঞ্চলে দেখা যায়। ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মশাস্ত্রে এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান থেকে বোঝা যায়, এর অত্যাচার পুরনোকালেও সাধারণ মানুষের ভেতর প্রবল বিরূপতা সৃষ্টি করেছিল; কিন্তু সমাজ-অর্থনীতি ক্ষমতার স্রোতে তা যে খুব কাজ করেনি, তা এসব ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর ইতিহাসই বলে।

বর্তমান সময়েও দেশের উত্তরাঞ্চলের চর এলাকাগুলোতে মহাজনদের ওপর দরিদ্র কৃষকের ঋণ নির্ভরতা বেশি। অনেক ক্ষেত্রে তারা মহাজনী ঋণের জাল থেকে বের হতে পারেন না। ঋণগ্রহীতা কৃষকদের ৮৮ শতাংশ মহাজনদের কাছে ধার-কর্জ করে থাকেন। আর এ ঋণে সুদের হার এলাকাভেদে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ।

সুদখোর মহাজনদের প্রতি গ্রামীণ জনগণের মনোভাব
ঢাকা পোস্ট প্রত্রিকার ১৯ এপ্রিল ২০২২ খ্রিস্টাব্দে “৫ হাজার টাকা ঋণ দিয়ে মাসে ৪ হাজার সুদ নেন লাকী” শিরোনামে নারায়ণগঞ্জ জেলায় ইটভাটার শ্রমিক বাবুল গাজীর ঘটনা প্রকাশিত হয়।  তিনি  ৩০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন। ছয় সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় বাবুল গাজীকে। পরিবারের এক সদস্যের চিকিৎসার জন্য বাধ্য হয়েই সপ্তাহে এক হাজার টাকা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন বাবুল। সেই ঋণের আসল শোধ হয়ে গেলেও মহাজনের সুদের বোঝা শেষ হয়নি এখনও। উল্টো সুদের টাকা শোধ না করায় মহাজনের আঘাতের চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন বাবুল গাজী। একই এলাকার পিঠাবিক্রেতা রহিমা বেগম। তিনিও এমন চড়া সুদে ঋণ নিয়েছিলেন। আসলের টাকা শোধ হলেও সুদের টাকা শোধ করতে মহাজনের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেছেন প্রায় এক বছর। আর রানী বেগম সুদের টাকা শোধ করতে বিক্রি করেছিলেন তার গর্ভের সন্তান। বাবুল গাজী, রহিমা বেগম ও রানী বেগমের মতো ওই এলাকার কয়েকশ শ্রমিক ও দিনমজুর মহাজনের সুদের ফাঁদে এমনভাবে জড়িয়েছেন যেন মুক্তির কোনো পথ নেই। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য এমন মহাজনী প্রথা এখনও সমাজে রয়েছে এবং আমাদের আশপাশেই। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পাগলা এলাকায় ঋণের টাকার সুদ পরিশোধ করতে সদ্য নবজাতক বিক্রির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পরই এমন অনেক ঘটনাই সামনে আসছে।

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সার্থক উত্তরাধিকার 
বাংলাদেশের শাসন কাজে নিয়োজিত আর বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের সবাই মূলত গ্রাম থেকে আসা।  অনেকে দ্বিতীয় প্রজন্মের হলেও বেশির ভাগ এখনও গ্রামীণ শিকড়যুক্ত।  তাই আমাদের মন ও মানসে এখনো গ্রামীণ প্রভাব প্রবল। তাই গ্রামে প্রচলিত  কয়েক সহস্র বৎসরের মহাজনী কারবারে পর্যদুস্ত জনগোষ্ঠীর উত্তরাধিকার নতুন ক্ষমতার অংশে পরিণত হওয়ার পরও সমান ঘৃণা আর অপছন্দ নিয়ে মহাজনী সুদকে বিচার করে। তার সাথে এর সাথে যুক্ত গোষ্ঠীর উপরও সমান বিরাগ পোষণ করে।

বাংলাদেশের নিজস্ব নোবেল প্রাপ্তি 
ডক্টর ইউনুস যখন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য গ্রামীণ ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেন, তখন অনেকেই বিশেষত দরিদ্র মানুষ একে স্বাগত জানিয়েছিল।  তার প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৬৬ লক্ষ সদস্য হয়েছে।  গ্রামীণ ব্যাঙ্ক ক্ষুদ্র ঋণের পাশাপাশি সেলুলার ফোন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, খাদ্য, কুটির শিল্প, বস্ত্র ও ফ্যাশন ইত্যাদি ব্যবসায় যুক্ত হন ডক্টর ইউনুস।  তাঁর হাতে যেন সোনা ফলে – ব্যবসার যেদিকে হাত দেন তাই সফল। অবশ্য আইটি ট্রেনিং ব্যবসাটা তিনি চালিয়ে যেতে পারেননি।

২০০৬ সালের ১৩ অক্টোবর নরওয়ের নোবেল পিস প্রাইজ কমিটি ঘোষণা করে সেই বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ঋণের জনক ড. মুহাম্মদ ইউনুস ও তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক। ওই বছরেরই দশই ডিসেম্বর নরওয়ের রাজধানী অসলোতে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করেন ড. ইউনুস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে তাসলিমা বেগম।

বাংলাদেশের বন্দর নগরী চট্টগ্রামের এক সম্পন্ন স্বর্ণ ব্যবসায়ী পরিবারে ইউনুস-এর জন্ম ১৯৪০ সালে৷ চৌদ্দ জন সন্তানের তিনি অন্যতম৷ তাঁর ওপর মা সোফিয়া খাতুনের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি৷ মাকে দেখেছেন – কখনও দু:স্থ কোন মানুষকে দরজা থেকে ফিরিয়ে দেন নি৷ এক ধরনের শিক্ষা এঁকে দিয়েছিল তাঁর মনে৷ ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সংলগ্ন জোবরা গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছিল প্রফেসর ইউনুসের গ্রামীন ব্যাংক প্রকল্প৷ ক্রমে তা সম্প্রসারিত হতে থাকে দেশের নানা জেলায়৷ আজ সারা বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে গ্রামীন ব্যাংকের উজ্জ্বল উপস্থিতি৷ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামীন ব্যাংক বিশ্বের অন্যান্য বহু দেশে৷

প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে গ্রামীণ ব্যাংক ঋণ দিয়েছে ৫.৭২ বিলিয়ন ডলার৷ ফেরত এসেছে ৫.০৭ বিলিয়ন ডলার৷ গত ৮ বছরে ব্যাংক দাতাদের কাছ থেকে কোন অর্থ গ্রহণ করে নি৷ ছেষট্টি লাখেরও বেশি মানুষ ঋণ পেয়েছে গ্রামীন ব্যাংকের কাছ থেকে৷ তাঁদের প্রায় ৯৭ শতাংশই নারী৷ ঋণগ্রহীতারাই ব্যাংকের ৯৪ শতাংশ শেয়ারের মালিক৷ ছয় শতাংশ বাংলাদেশ সরকারের৷ কোন রকম জামানত দিতে হয় না ঋণের জন্য৷ আয়ের উত্ স সৃষ্টিকারী সব ঋণের জন্য সুদের হার ২০ শতাংশ৷

ডক্টর ইউনুসকে নিয়ে উৎচ্ছ্বাস  
পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানিত নোবেল পাওয়ার পর প্রায় দুমাস ধরে সংবর্ধনা আর শুভেচ্ছার বন্যায় ভেসেছেন ড. ইউনুস। অসলোর সিটি হলে সেদিন ড. ইউনুস তাঁর দেয়া নোবেল বক্তৃতা শুরু করেন বাংলায়। ঐতিহাসিক সেই বক্তৃতায় ড. ইউনুস বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন সবার যৌথ উদ্যোগই পারে একটি দারিদ্রমুক্ত বিশ্ব তৈরি করতে যেখানে দারিদ্র্য থাকবে জাদুঘরে। ক্ষুদ্র ঋণের পর ড. ইউনুস এখন কাজ করছেন তাঁর নতুন ধারার সামাজিক ব্যবসা নিয়ে। বলা হচ্ছে, এসবই তিনি করছেন, একটিমাত্র লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য। ড. ইউনুসের সেই লক্ষ্যটি হলো, দারিদ্র্য একদিন ঠাঁই পাবে জাদুঘরে।

প্রাশ্চাত্য পরিকল্পনায় ডক্টর ইউনুস
অবশ্য একজন অর্থনীতিবিদ হওয়ার পরও কেন শান্তিতে নোবেল দেয়া হলো ড. ইউনুসকে সেরকম একটি আলোচনা বেশ জোরেসোরেই চলেছে তাঁর নোবেল বিজয়ের পর। নোবেল কমিটি ডক্টর ইউনুস ও গ্রামীন ব্যাংককে একেবারে নিচে থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন জারিত করার জন্য তাদের কর্ম তত্ পরতার স্বীকৃতি হিসেবে দুই সমান ভাগে ২০০৬-এর নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ কমিটির প্রশস্তিপত্রে বলা হয়েছে যে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী যদি দারিদ্র্যের বৃত্ত ভেঙে ফেলার উপায় খুঁজে না পায় তাহলে স্থায়ী শান্তি অর্জিত হতে পারে না৷ মাইক্রোক্রেডিট হল এরকমই এক উপায়৷

একসময়ের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারিশমাটিক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ছিলেন ডক্টর ইউনুস এর বন্ধুস্থানীয়। বিল ক্লিনটন তার প্রেসিডেন্সির সময় হতে অদ্যাবদি মার্কিন রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আছেন। ওয়েস্টার্ন মিডিয়া তাঁকে (ডক্টর ইউনুস) ক্লিনটন পরিবারের বন্ধু বলে উল্লেখ করেছেন। ডক্টর ইউনুস যে পাশ্চাত্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কান্ডারি তা দেশের এক এগারোর সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সমর্থন দেয়ার ঘটনা দিয়ে ব্যাখ্যা করে যায়।  জনশ্রুতি, প্রথমে তাকেই মূল দায়িত্ব নেয়ার আহবান করা হয়।  কিন্তু তিনি একটি স্বল্প সময়ের সরকার পরিচালনার চাইতে দীর্ঘ মেয়াদের চিন্তা প্রকাশ করেন। তাঁর প্রস্তাবনায় ঐ সরকার গঠিত হয়। আর তিনি একটি রাজনৈতিক দল গঠনে নিজেকে নিয়োগ করেন। তাঁদের পরিকল্পনা ছিল, ঐ সরকার তাঁদের দলকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করবে। পাশ্চাত্য এভাবেই বাংলাদেশকে তাদের প্রভাবে রাখার চিন্তা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছে।

সুশীল সমাজের পরিকল্পনায় আধা সামরিক শাসন (২০০৭-২০০৮)

২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি বাংলাদেশে সামরিক আর সুশীল সমাজের সমন্বয়ে একটি দুই বৎসর ব্যাপী । তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ একদল সেনা কর্মকর্তা দুপুরের দিকে বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন।

মঈন ইউ আহমেদ ‘শান্তির স্বপ্নে: সময়ের স্মৃতিচারণ’ নামে সে বইতে  বর্ণনা করেন, ” আমি প্রেসিডেন্টকে দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি, নির্বাচন, বিরোধী রাজনৈতিক দলের আল্টিমেটাম এবং বিদেশী রাষ্ট্র সমূহের অবস্থান, বিশেষ করে নির্বাচনের ব্যাপারে জাতিসংঘের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানালাম। জাতিসংঘ মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করা হলে যে বিপর্যয় ঘটতে পারে তা সবিস্তারে বর্ণনা করলাম। নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধান নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রেসিডেন্টকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝাতে সচেষ্ট হলো।”

শেষ পর্যন্ত নতুন সরকার ফখরুদ্দিনের নেতৃত্বে তাদের কাজ শুরু করেন।  এই সরকার প্রায় দুই বৎসর ক্ষমতায় থেকে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন দিয়ে চলে যায়।  শুরুতে দেশের জন্য ইতিবাচক হলেও ক্রমান্বয়ে নিজেদের ক্ষমতা সংহতকরণের দিকে এগিয়ে গেলে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এর তীব্র বিরোধিতা শুরু করে।  ২০০৮ এর আগস্ট হতে শুরু হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বিক্ষোভ অল্প সময়ের মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পরে। এতে এই অদ্ভুত তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি বিদায় নিতে বাধ্য হয়।

রাজনীতিবিদের প্রত্যাবর্তন  
২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে সমর্থন করে সেনাবাহিনী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করে, এর পূর্বেই দেশে জরুরি অবস্থা জারি ছিল। ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তার প্রায় সকল উপদেষ্টার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন এবং তিনি নিজেও প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১২ই জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদ তার স্থলাভিষিক্ত হন, যিনি বিশ্ব ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। নতুন গঠিত সরকার দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সকল প্রকার রাজনৈতিক কার্যক্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরবর্তীতে সরকার দুর্নীতি মামলাগুলোর উপর কাজ শুরু করে; রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ ১৬০ জনের বিরুদ্ধে ১৯৯০-এর দশকে করা কার্যক্রমের উপর চার্জশিট দাখিল করে ও তদন্ত শুরু করে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশের উভয় রাজনৈতিক দলের বিপক্ষে বিভিন্ন সময় দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। উপরন্তু কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার দেশের স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ কমাতে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে পাঠাতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন। তত্বাবধায়ক সরকার, ২০০৬-এর ২৮ শে অক্টোবর শেখ হাসিনার ডাকা লগি বইঠা আন্দোলন নামক বিক্ষোভের সময় ৪জন ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে শেখ হাসিনাকে অভিযুক্ত করে। সর্বোচ্চ আদালত রায় প্রদান করেন, জরুরি অবস্থার অধীনে খালেদা জিয়া জরুরি অবস্থা জারির পূর্বের কোন ঘটনায় অভিযুক্ত হবেন না কিন্তু ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে করা একটি আপিলে সর্বোচ্চ আদালত মামলা পরিচালনার রায় প্রদান করেন। ২০০৮ এর শেষ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সাধারণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে এবং ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও মহাজোট দুই তৃতীয়াংশ ভোটে জয় লাভ করে ও ২০০৯-এ সরকার গঠন করে।

অপাংতেয় ডক্টর ইউনুস
২০০৭ খ্রিস্টাব্দে এক এগারো সরকারের অন্যতম রূপকার এবং তার মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা যখন আর সফল হল না তখন ডক্টর ইউনুস বিদেশে চলে গেলেন।  বাস্তবতা হল এই ভদ্রলোক কখনও নিজ স্বার্থ ছাড়া কিছু দেখেন নাই।  তার প্রথম বিয়ে এবং তাদের প্রথম সন্তানের সাথে তাঁর দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ ছিল না – যদিও তিনি বার বার ইউরোপ-আমেরিকা  সফরে গেছেন। কেমন মানুষ তিনি এই উত্তরটা বার বার এড়িয়ে গেছেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী। নোবেল পাওয়ার পর তাঁর পরিবারের অনেক উৎচ্ছাস দেখা গেলেও তাঁর পরিবার সবসময় অন্তরালে।
একটি বড় পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে পাশ্চাত্য তাঁর নিকট হতে সাময়িক হলেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আর দেশে বৈরী সরকার; তাই বিদেশের মাটিতে কেটেছে এই দীর্ঘ সময়। অবশ্য নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিটিং প্রফেসর এবং উন্নয়ন আর ব্যবসা নিয়ে পেইড বক্তা হিসেবে উপার্জন কম ছিল না।

বিশ্ব সমর্থন 
“ শিক্ষার উচিত তাকে উদ্যোক্তা বা চাকরি সৃষ্টিকারী হতে প্রস্তুত করা, চাকরি খুঁজতে নয়।…আমরা যদি তরুণদের চাকরি সৃষ্টিকারী হিসেবে গড়ে তুলতাম, তাহলে বেকারত্ব বলে কিছু থাকত না ” – ডক্টর ইউনুসের এই বাণীটি যে কত প্রাসঙ্গিক তা আজকের করোনা অতিমারী পরবর্তী বিশ্ব প্রতি পদে আরো বেশি করে টের পাচ্ছে।  একমাত্র কৃষির অনন্য সাধারণ উন্নয়ন – যার প্রায় শতভাগ কৃতিত্ব কৃষি মন্ত্রীর তিনবার  দায়িত্ব  পালনকারী মতিয়া চৌধুরীর – বাংলাদেশকে করোনা পরবর্তী সংকট হতে রক্ষা করেছে। তবে ডক্টর ইউনুসের প্রস্তাবিত কর্মমুখী শিক্ষা আর তার সাথে গ্রামীণ ব্যাঙ্কের মত  প্রচলিত বাণিজ্যিক জামানতবিহীন ঋণ প্রদান তরুণদের উদ্যোক্তায় পরিণত করবে।  ফলে কোনো বেকার থাকার সুযোগ থাকছে না। এই প্রক্রিয়া যেমন বাংলাদেশে সফল, তেমনি সফল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসান স্টেটে।  আর পিছিয়ে থাকা দরিদ্র রাজ্য থেকে অর্থনৈতিক অগ্রসর হয়ে উঠা গভর্নর ক্লিনটনের পক্ষে গ্রামীণ ব্যাঙ্কের মডেলকে বাস্তবায়িত করেই সম্ভব হয়েছিল। ফলে ক্লিনটন পরিবার হয়ে উঠেছে ডক্টর ইউনুসের একান্ত আপনজন।
পাশ্চাত্য এই রকম একটি সমাধানের খোঁজে ছিল দীর্ঘ দিন। নিজ দেশে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে কিভাবে উন্নয়নের মহাসড়কে সামিল করা যায় তার উপযুক্ত কোনো অর্থনৈতিক মডেল পাশ্চাত্য অর্থনীতিবিদরা বিগত শতাব্দীতে বের করতে পারেননি। এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানে ব্যাপক জনগোষ্ঠী যারা দারিদ্র সীমার নিচে বাস করে তাদের জন্য তাদের জন্য বাস্তবায়নযোগ্য একটি  মডেল খুবই আবশ্যিক হয়ে পড়েছিল। গ্রামীণ ব্যাঙ্কের সাফল্য তাদের সেই অতি প্রয়োজনীয় মডেলকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাই পাশ্চাত্য ডক্টর ইউনুসকে তাদের কাছে টেনে নিয়েছেন।

ভারতীয় বিরোধিতা 
ডক্টর ইউনুস ভারতের ক্ষমতাসীন এবং বৃহৎ পুঁজির বিরাগভাজন।  তাঁর এদেশীয় সমর্থক আর অনুসারী প্রায় সবাই ভারত বিরোধী শিবিরের। এখানটাতেই প্রধান সমস্যা।  তাঁর নতুন সামাজিক ব্যবসার তত্ত্বটি মূলত কয়েকজন জিরো মার্জিনাল ইকোনমি নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞজন – যার একটি পূর্ণ ধারণা পাওয়া যায়  জেরেমি রিফকিন কর্তৃক রচিত  “দ্য জিরো মার্জিনাল কস্ট সোসাইটি: দ্য ইন্টারনেট অফ থিংস, দ্য কোলাবোরেটিভ কমন্স এবং দ্য ইক্লিপস অফ ক্যাপিটালিজম”  যা ৭ জুলাই, ২০১৫ প্রকাশিত রচনায় – থেকে ধার করা।  এজন্য নোবেল পুরুস্কার পাওয়ার পর প্রথম দিকে তিনি এর পূর্ণ ব্যাখ্যা দেননি। পরে ২০১৬-১৭ খ্রিস্টাব্দ হতে তার নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতায়  পাওয়া যায়।  তাই তেমন কোনো প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতিবিদ তাঁর মডেলের সাথে একমত হচ্ছেন না।  ফলে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরাও একে সন্দেহের চোখেই দেখেন।  তাঁরই ধারাবাহিকতায় ভারতের ব্যবসায়ীরাও ডক্টর ইউনুসকে গ্রহণ করেন নি।  আর নতুন সাম্রাজ্য সৃষ্টিকারী ভারতীয় নেতৃত্ব সাথে আমলারা তাঁকে একেবারেই জায়গা দেননি।

ডক্টর ইউনুস আর বাংলাদেশ – রূপকথার দুয়োরানী 
ডক্টর ইউনুস বিশ্বব্যাপী এক পরিচিত নাম; একটি অনন্য ব্র্যান্ড।  কিন্তু কি দেশে কি বিদেশে তাঁর মডেল নিয়ে কাজ করার ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একেবারেই নগন্য। তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু রাজনৈতিক আর সামাজিক পরিমণ্ডলে।  অর্থনৈতিক আর ব্যবসা-বাণিজ্যের জগতে তিনি ব্যাপক আলোচিত হলেও মডেলটি কার্যকর করার ব্যাপারে সবার অনীহা। নিজ দেশে ক্ষমতার মহলে তিনি অগ্রহনযোগ্য; পারলে এখনই তাঁর বিচার করা হয় – শুধু বিশ্বব্যাপী পরিচিতির কারণে তিনি নিজেকে রক্ষা করে চলেছেন।

বাংলাদেশ যুগ যুগ  ধরে সম্পদ সন্ধানীদের কাছে এক লোভনীয় নাম। এই ভুখন্ডটি এতটাই বিদেশীদের আকর্ষণ করেছে যে একটি দীর্ঘ সময় শাসনও করেছে বিদেশীরা। সত্যিকার ভূমিপুত্ররা বাংলার শাসন ক্ষমতায় নেই বললেই চলে।  এজন্য ঐতিহাসিকরা দুঃখ নিয়ে বলেন, বাংলার ইতিহাস এর  মানুষের ইতিহাস নয়, বাংলার শাসকদের  যাদের অধিকাংশই হানাদার। এই শাসকরা বাংলার উন্নতির চাইতে নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধির চিন্তায় ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন।  তাই বহু আক্রমণকারীর অত্যাচার সয়ে বাংলা আজ রিক্ত।  তার সোনালী অতীত এখন শুধুই ইতিহাসের পাতায় পাতায়। আজ বাংলা দারিদ্র পীড়িত এক বহু মানুষের জনপদ।

ডক্টর ইউনুস আর বাংলাদেশ দুটিরই যেন রূপকথার সেই দুয়োরাণীর অবস্থা।

সহজ সমাধানের খোঁজে 
মানুষ সম্পর্কিত কোনো বিষয়ই সহজ নয়।  এর পরতে পরতে বিভিন্ন ধরণে সম্পর্ক আর তাদের আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে নানা টানাপোড়েন যুক্ত।  তাই রাজনীতিতে যেকোন সহজ সমাধান আসলে ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।  আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা সহজ কোন সমাধান বের করার চেষ্টা করছেন তাদের কেউ যদি এই সময় সফল হন তাহলে তা হবে সাময়িক সময়ের জন্য। বিজ্ঞজনেরা গত শতকের নব্বইয়ের গণআন্দোলনে সাফল্যের পর মনে করেছিলেন একটি স্থায়ী সমাধান পাওয়া গেল।  কিন্তু কয়েক বৎসরের মধ্যে সেই ভুল ভেঙে যায়। আবার আন্দোলন, আবার সহিংসতা, আবার নতুন করে হিসেব কষা।  এভাবে এবারো যারা সহজ সাফল্যের পথে চলছেন, তারাও একই স্বপ্ন ভঙ্গের মুখোমুখি হবেন।

উঠে আসছে অন্য কেউ 
ভিপি নূর: নুরুল হক নুর (ভিপি নূর হিসেবে প্রসিদ্ধ) বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের  অন্যতম আলোচিত রাজনীতিবিদ।  ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্যতম যুগ্ম-আহ্বায়ক হিসেবে তিনি আলোচনায় আসেন। তিনি ২০১৯ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচনে সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। জুন ২০২০ সালে নুর তরুণদের নেতৃত্বে একটা নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করার ব্যাপারে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন। অর্থনীতিবিদ ড. রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হক নুরের নেতৃত্বে ‘বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদ’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দলের ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর ঢাকায় পল্টনের প্রিতম জামান টাওয়ারে অবস্থিত দলটির কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নাম ঘোষণা করেন নুরুল হক নুর। বর্তমান সময়ে সরকার বিরোধী কর্মকান্ডে তার ভূমিকা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। কিছু সমালোচনা থাকলেও দেশের এক শ্রেণীর মানুষ তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে।

এবি পার্টি: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘সংস্কারপন্থি’ নেতারা ‘মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার’ বাস্তবায়ন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার এই তিন মূলনীতির ভিত্তিতে গতকাল (শনিবার) সকালে রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘আমার বাংলাদেশ পার্টি’ (এবি পার্টি) নামের এই  দলের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এই দলের আহ্বায়ক ঘোষণা করা হয়েছে জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগকারী নেতা এবং সরকারের একজন সাবেক সচিব এ এফ এম সোলায়মান চৌধুরীকে। তিনি সরকারের একজন সাবেক সচিব ছিলেন। এই দুই বছরেও জামায়াতকে সেভাবে টানতে পারেনি এবং রাজনীতির মাঠেও সাড়া ফেলতে পারেনি। তবে নতুন এই দলের উদ্যোক্তারা বলছেন, অল্প সময়ে দলটির তৎপরতা নানা মহলের দৃষ্টিতে পড়েছে। এবি পার্টির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, তাঁরা ধীরে-সুস্থে এগোচ্ছেন। এই মুহূর্তে তাঁদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধন পাওয়া। এ লক্ষ্যে সারা দেশে দলের কমিটি গঠন চলছে। এখন পর্যন্ত ৪৫টি জেলা ও প্রায় ১০০ উপজেলায় এবি পার্টির কমিটি করা হয়েছে। প্রবাসীদের নিয়েও সাংগঠনিক কাজ চলছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ ১২টি দেশে প্রবাসীদের নিয়ে কমিটি  হয়েছে। নতুন নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু করলে এবি পার্টিও আবেদন করবে।

বিডিএ: গত দশকের জাতীয় পার্টির রাজশাহীর জনপ্রিয় নেতা এবং গত এক দশক যাবৎ মার্কিন যুক্তরাস্ট্র প্রবাসী এবং সামাজিক সংস্থা এসবি ফাউন্ডেশনের প্রধান শাহাব উদ্দিন বাচ্চুর উদ্যোগে ২০২০ খ্রিস্টাব্দ হতে নিউ ইয়র্কে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স ২০২১ এর শেষ দিকে বাংলাদেশে তার কর্মকান্ড শুরু করে।  ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাজশাহীতে প্রধান কার্যালয় স্থাপন করার মাধ্যমে (অক্টোবর ২০২১) বিডিএ মূলত উত্তরবঙ্গ কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করে।  উত্তরবঙ্গে এরই মধ্যে দলটি বেশ গুছিয়ে নিয়েছে।  এদের মূল শক্তি নিউ ইয়র্ক কেন্দ্রিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত প্রবাসীরা।

প্রবাসী উদ্যোগ: বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবাসী উদ্যোগ তেমনটা চোখে পড়ে না।  তবে ডক্টর মতিউর রহমান তার “বাংলাদেশ ডেমোক্র্যাসি এন্ড জাস্টিস পার্টি” প্রস্তাবনা দিয়ে প্রচারণা ও উদ্যোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

ক্ষমতার মনোপলি
বাংলাদেশের রাজনীতি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হতে শুধুমাত্র ক্ষমতাসীন বর্তমান দলটিকে নানা উপায়ে ক্ষমতার বাইরে রাখার চেষ্টা হয়েছে। এই পঞ্চাশটি বৎসর রাজনীতির সব কর্মকান্ড কিভাবে দলটিকে ক্ষমতার বাইরে রেখে নিজেরা (কোন একটি গোষ্ঠী) যে কোন উপায়ে (সামরিক শাসন বা জোট সরকার) ক্ষমতাসীন থাকার উপর আবর্তিত।  ফলে, সব সময় দলটি ক্ষমতার আলোচনায় একটি প্রবল পক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।  এটা হওয়ার একমাত্র কারণ এই দলটি বাদে অন্য কারো কার্যকরী কোন জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই।  তাই, শেষ বিচারে দলটি স্বাধীনতা উত্তর এই পঞ্চাশ বৎসরের রাজনীতিতে একমাত্র প্রকৃত পক্ষ। এর অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে ক্রমান্বয়ে দলটি একমাত্র ক্ষমতা উপযোগী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।  যতবার এই দলটিকে বাইরে রেখে ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধান করার চেষ্টা হয়েছে ততবারই জন-অসন্তোষ আর অস্থিতিশীলতা তৈরী হয়েছে।  আর সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে দলটি ক্ষমতায় আসীন হয়েছে।  শেষ পর্যন্ত দলটি নিজেই ক্ষমতাকে নিজে পক্ষে এমন মাত্রায় সংহত করে ফেলেছে যে বিগত ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ হতে একটানা তেরো বৎসরের অধিক দৃশ্যমান কোনো বিরোধিতা ছাড়াই ক্ষমতাসীন আছে।

চাই সবার গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান 
ক্ষমতার একচেটিয়া সুবিধা ভোগকারী দলটির বিরুদ্ধে কোন সহজ আর সংক্ষিপ্ত পথ খুঁজতে চেষ্টা বিফল হতে বাধ্য। পৃথিবীর আদি হতে এই আধুনিক সময় পর্যন্ত দেশে দেশে ক্ষমতার একচেটিয়া দুভাবে দূর হয়েছে।  প্রথমটি- ক্ষমতার অন্তর্গত পরিবর্তন (অতীত কালে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে শাসকের নিকটবর্তী কারো কর্তৃক ক্ষমতা গ্রহণ আর আধুনিক কালে প্রধানত সামরিক শাসন জারি) এবং দ্বিতীয়টি- অতীতে প্রতিপক্ষ কর্তৃক ক্ষমতা গ্রহণ আর আধুনিক কালে জনসম্পৃক্ত একটি দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত হয়েছে। আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে – অতীতকালে প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে না পারলে শাসন নিরংকুশ হয়নি; নানা বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে এক অরাজক শোষণ পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করাটা আত্মঘাতী। আসলে বর্তমান যুগে’প্রতিটি অংশীদারদের নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান দরকার।  এধরণের সমাধান টেকসই আর দীর্ঘমেয়াদি।
আজ একচেটিয়া কায়েমের পর ক্ষমতাসীনরা যে উন্নয়নের দৃশ্যকল্প সৃষ্টি করে জনগণকে ক্রমাগত বুঝানোর প্রয়াস পাচ্ছেন তার উপর নির্ভর করে দীর্ঘদিন পৃথিবীতে কেউ ক্ষমতা বজায় রাখতে পারেনি। শতভাগ বিদ্যুতের গল্পটি গত দশদিনের পরিস্থিতি একবারে উল্টে দিয়েছে।  একইভাবে, শ্রীলংকার গণআন্দোলন এবং ক্ষমতার পটপরিবর্তন উন্নয়নের গল্পের উপর একটি ভয়াবহ আঘাত।  ক্ষমতাসীনদের এগুলো অবশ্যই ভাবতে বাধ্য করবে। আমাদের ভবিৎসত যাই হোক না কেন এটা সবার মনে রাখতে হবে আরেকবার বর্তমান ক্ষমতাসীনদের বাদ দিয়ে করে যে কোন সমাধান অতি নিকট ভবিষ্যতে আবার একটি ধারাবাহিক বিপর্যয় নিয়ে আসবে।

দারিদ্রকে জাদুঘরে পাঠানোর ব্যর্থ পদক্ষেপ  
ডক্টর ইউনুস কি কখনও কোথাও নিজেকে জনগণের লোক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।  অথবা বৃহত্তর জনগণের মতামত মেনে চলার কোন উদাহরণ কি তিনি সৃষ্টি করেছেন। অর্থনীতির প্রফেসর এই লোকটি সারাজীবন একাডেমিক এবং ক্ষমতার অংশ সমাজের উঁচু তলার মানুষের সাথে চলতে অভ্যস্ত।  তাঁর জনসম্পৃক্ততা বলতে শুধু গ্রামীণ ব্যাঙ্ক শুরুর দিকগুলোতে নিজ বিশ্ববিদ্যলয় সংলগ্ন অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সাথে বৈঠক – যারা তাঁকে তাদের বিপদের ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখেছে।  তাই রাজনীতিতে তাঁর অংশ নেয়ার প্রচেষ্টা বার বার বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে।

ডক্টর কামাল হোসেনের গণফোরাম সৃষ্টির সময় (১৯৯৩ সালের ২৯ আগস্ট ) তিনি প্রথমবারের মতো “আমার স্বপ্নের রাজনৈতিক দল” নামে একটি প্রবন্ধে রাজনৈতিক উচ্চাশা প্রকাশ করেন। হয়ত তিনি ডক্টর কামাল হোসেনের সফলতা দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন।  এরপর দীর্ঘ এক যুগের বেশি আর এই বিষয়ে কোন ধরণের পদক্ষেপ নেননি।  ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে নোবেল শান্তি পুরুস্কার পাওয়ার পর তাঁর এই আকাঙ্খা আবার দেখা দেয়।  ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ১/১১ বাংলাদেশকে একটি সামরিক বাহিনীর সমর্থনে সুশীল সমাজের ক্ষমতার অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। এ সময় তিনি গুরুত্বের সাথে রাজনীতিতে প্রবেশে উদ্যোগী হয়ে উঠেন।  তাঁর ভাই সাংবাদিক জাহাঙ্গীরকে দিয়ে একটি প্রাক-রাজনৈতিক দল গঠন সমীক্ষা পরিচালনা করেন।  এবং হতাশজনক প্রতিক্রিয়া পেয়ে রাজনীতি করার ইচ্ছা হতে দূরে সরে যান। বুদ্ধিমান মানুষ তিনি- তাই রাজনৈতিক অবস্থা বুঝে সময়মত নিজেকে গুটিয়ে নেন।

একবার না পারিলে দেখো শতবার 
অতীতে একবার রাজনীতিতে নাক গলিয়ে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে সসম্মানে নিজেকে বাঁচিয়ে নেন। নোবেল পুরুস্কার আর আন্তর্জাতিক যোগাযোগকে বিবেচনায় নিয়ে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে সেনা-সমর্থিত সুশীল সমাজের সরকারকে আশ্রয় করে রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়ায় পুরোপুরি পাঁ ঢুকিয়ে আবারো ব্যর্থ মনোরথে বিদায় নেন। বিচারপতি সিনহার মাধ্যমে পাকিস্তানের মতো (২০১২ খিষ্টাব্দের ১৮ ই আগস্ট  পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে ২৬ সে মে ২০১২ হতে স্বপদে থাকার অযোগ্য ঘোষণার করে।) বিচারিক রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্ষমতার ষড়যন্ত্র ব্যর্থতার পর  এই’ ২১-তম প্রধান বিচারপতি ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর তারিখে বিদেশে ছুটিতে থাকা অবস্থায় তিনি পদত্যাগ করেন। এই বিচারিক ষড়যন্ত্রটি ডক্টর ইউনুসের তৃতীয় রাজনৈতিক উদ্যোগ। সর্বশেষ সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর নাম আবার ব্যাপকভাবে আলোচনায় চলে আসছে।  এবার তাঁর পক্ষে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেমে পড়েছে।  এর প্রথম কাজটি গত ২০২১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে ৬ জন উচ্চ পর্দস্থ কর্মকর্তার উপর নিষেধাজ্ঞা।  এরপর বাংলাদেশকে কোয়ার্ড জোটে (ইংরেজি শব্দ কোয়াড্রিলেটারেল বা চতুর্পাক্ষিকের সংক্ষিপ্ত রূপ হচ্ছে কোয়াড যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া আর ভারত – প্রাথমিকভাবে এই চারটি দেশ নিয়ে সৃষ্টি । এটি  চীনকে মোকাবেলা করবে) এযোগ দেয়ার তীব্র চাপ প্রদান।  সাথে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার গোপন হুমকি।  এর সাথে যুক্ত হয়েছে পাকিস্তানের ইমরান খান সরকারের পতন আর শ্রীলংকার অর্থনৈতিক দুরাবস্থা।

ব্যর্থতাই পরিণতি 
ডক্টর ইউনুস একজন অসম্ভব বুদ্ধিমান ব্যক্তি।  নিজের দক্ষিণপন্থী আর জনগণ বিপক্ষ অবস্থান খুবই সফলতার সাথে ঢেকে বাংলাদেশের একজন সুহৃদ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারঙ্গম এই লোক ব্যবসা-বাণিজ্য আর সরকারী প্রভাব নিজের স্বার্থে নিতে সিদ্ধহস্ত।  এমনকি সমস্ত আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে গ্রামীণ ব্যাংকের শীর্ষ পদে অতিরিক্ত ১০ বৎসর থেকেছেন।  আজীবন থাকার উদ্যোগ ব্যর্থ হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের মাধ্যমে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে প্রচেষ্টা নিয়েছেন। নিজ স্বার্থে গ্রামীণ ব্যাঙ্ক হতে অন্তত এক ডজনের বেশি কোম্পানি তৈরী করা  যার শেয়ার বা মালিকানা গ্রামীণ ব্যাংকের নয় তাঁর তীক্ষ্ণ ব্যবসায়িক বুদ্ধির পরিচয় হলেও এদেশে তিনি একজন গ্রামীণ সুদখোর মহাজনের অধিক কিছু নন।  তাই তাঁর জন-সম্পৃক্ত কর্মকান্ড গুলো বার বার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে।

লেখক : প্রধান সমন্বয়ক, আমরা ৯৯ শতাংশ (আপহোল্ড ৯৯) ।
ইমেইল: mallikbd@gmail.com

বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।
ঢাকা অফিসঃ ১৬৭/১২ টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল ঢাকা- ১০০০ আঞ্চলিক অফিস : উত্তর তেমুহনী সদর, লক্ষ্মীপুর ৩৭০০