মালদ্বীপ নিয়ে কী রাজনীতিতে মেতেছে ভারত-চীন

Print Friendly
মালদ্বীপ নিয়ে কী রাজনীতিতে মেতেছে ভারত-চীন

ঢাকা: ভারত মহাসাগরের বিলাস বহুল রিসোর্ট ও কাচের মত স্বচ্ছ নীল পানির জন্য বিখ্যাত দ্বীপ রাষ্ট্র হচ্ছে মলদ্বীপ। ইউরোপে যার পরিচিত ব্রিটিশদের ‘হানিমুন পাড়া’ হিসেবে! সম্প্রতি আবারও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মুসলিম প্রধান এই দেশটি অশান্ত হয়ে উঠেছে।

পনেরো দিনের জন্য সেখানে চলছে জরুরি অবস্থা। প্রধান বিচারপতিসহ তিন বিচারপতি, সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সবের পেছনে ভারতের অদৃশ্য হাত রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

অশান্তির শুরু হয় গত ২ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের মাধ্যমে। ওই রায়ে বলা হয় ‘সন্ত্রাসবাদের’ অভিযোগে শ্রীলঙ্কায় নির্বাসিত দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ নাসিদ নির্দোষ। আরও বলা হয়, সদস্য পদ বাতিল হওয়া ১২ মজলিসকে (সংসদ সদস্য) তাদের পদ ফিরিয়ে দিতে।

এদিকে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়েমিন বুঝতে পেরেছিলেন যে, আদালতের রায়ে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হতে পারে। বিরোধী দলগুলির শীর্ষ নেতাদের আগেই বন্দি করেছিলেন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট ওই রায়ে তিনি আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতিকে গ্রেপ্তার করেন। গ্রেপ্তার করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং তার সৎভাই অশীতিপর মামুন আবদুল গাইয়ুমকেও।

প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তারের পর অবশ্য সুপ্রিম কোর্টের অন্য বেঞ্চ বিরোধী নেতাদের মুক্তির নির্দেশ বাতিল করেছে। কিন্তু বিরোধী দল এমডিপি-র প্রধান তথা মালদ্বীপের অপর সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ আহ্বান জানিয়েছেন ইয়ামিন সরকারকে উৎখাত করার।

মালদ্বীপের সংকট নিয়ে ভারত-চীনের স্নায়ুযুদ্ধ:
প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রভাবখাটানো ক্ষেত্রে ভারত বেশ কয়েক বছর ধরেই বেশ ধাক্কা খাচ্ছে। একের পর এক দেশের উপর অবৈধ প্রভাব যেনো তাদের কমছেই। শ্রীলঙ্কা ও নেপাল তো এখন তাদের নাগালেরে বাইরে চলার পথে হাঁটছে। এদিকে আবদুল্লাহ ইয়েমিন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই চীনের প্রভাব বেড়ে গেছে। চার লাখ জনসংখ্যার এই দেশটিতে ২০১৭ সালে তিন লাখ পর্যটক পাঠিয়েছে চীন। রাজধানী মালের পাশে একটি দ্বীপ ৫০ বছরের জন্য লিজ নিয়ে রিসোর্ট নির্মাণ করছে ওই চীনেরই একটি কোম্পানি।

প্রতিবেশী দুই প্রভাবশালী দেশ চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো সময়ই সম্পর্ক ভালো ছিল না ভারতের। আর চীনের সঙ্গে তো এখন সম্পর্ক তলানিতে। এরই মধ্যে বড় এক ধাক্কা খেলো দেশটি। দিনটি গলো ৮ ডিসেম্বর। নয়াদিল্লির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। মালদ্বীপ ও চীন মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সই করেছে। আর তা করেছে এমন গোপনে ও তাড়াহুড়ো করে যে, কাকপক্ষীও টের পায়নি। এমনটা বলাই যায়, মালদ্বীপে ভারতকে কোনঠাসা করে চীনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো।

এসবের পরও ভারত কী বসে থাকবে? ঐতিহাসিকভাবেই মালদ্বীপে তাদের প্রভাব রয়েছে। তারই বাস্তবতা গত ২ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইয়েমিন ১৫ দিনের জন্য দেশটিতে জরুরি অবস্থা জারি করে। পর্যটনের ওপর ভর করে চলা দেশটি অর্থনীতি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে, ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া দেশটিতে থাকা তাদের নাগরিকদের চলাচলে সতর্কতা জারি করেছে।

সেখানে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, এরই মধ্যে মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ ভারতের কাছে সেনা হস্তক্ষেপ চেয়েছে। ভারতও তা পাঠানোর জন্য বিশেষ বাহিনী প্রস্তুত রেখেছে বলে নয়াদিল্লি সূত্রে খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।

ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েলর একটি সূত্রের উদ্ধৃত করে এক প্রতিবেদনে বলেছে, ভারত ও চীনের মধ্যে সঙ্ঘাতের আর একটি বিন্দু হয়ে উঠুক মালদ্বীপ, বেইজিং এমনটা চায় না। সেই কারণে মালদ্বীপের সঙ্কট নিরসনের বিষয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে চীন।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেইজিং কৌশলী পন্থা অবলম্বন করেছে। তারা বারবারই বলছে, মালদ্বীপের সঙ্কট নিরসনে কোনো বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপ কাম্য নয়।

এদিকে, মালদ্বীপের অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে জানানোর জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে  ফোন দিয়েছিলেন। দ্বীপরাষ্ট্রে যে রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে, তার নিরসনকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে দিল্লি, ওই ফোনালাপেই তা স্পষ্ট হয়ে গেছে।

চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং ৯ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, মালদ্বীপের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা উচিত আন্তর্জাতিক মহলের। মালদ্বীপের বর্তমান পরিস্থিতি তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে এই সমস্যার উপযুক্ত সমাধান খুঁজে বার করা উচিত।

অর্থাৎ, চীন খুব স্পষ্ট করে বোঝাতে চাইছে, কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ নয়, বেইজিং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পক্ষে।

ইতিহাসে মালদ্বীপ:
ঠিক কখন থেকে ভারত মহাসাগরের এই দেশটিতে মানুষের বসবাস শুরু হয় তার সঠিক সময় নির্ধারণ করা এখনো সম্ভব হয়নি। দ্বাদশ শতাব্দির মাঝামাঝিতে মালদ্বীপে মুসলিমের আগমন ঘটে। বৌদ্ধ শাসনের এই দেশটিতে ১১৫৮ সালে তৎকালিন শাসক ইসলামের ছায়াতলে আসেন। এবং তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে সুলতান মাহমুদ আল আদিল ধারণ করেন। সেই থেকেই ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত দেশটির শাসকদের পরিচিতি ছিল সুলতান।

দেশটির ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তন:
১৫৫৮-১৫৭৩ : পর্তুগিজ দখলদারিত্ব
১৮৮৭      : ব্রিটিশ তদারকিতে স্বশাসিত সরকার প্রতিষ্ঠা
১৯৩২      : প্রথম গণতান্ত্রিক সংবিধান ঘোষণা, নির্বাচনের মাধ্যমে সুলতান নির্ধারণ
১৯৫৩      : কমনওয়েলথের আওতায় প্রজাতন্ত্রে পরিণত, সালতানাত আমল বিলুপ্ত। তবে কয়েক মাসের মধ্যে ফের সালতানাত প্রতিষ্ঠা।
১৯৬৫     : পূর্ণস্বাধীনতা লাভ
১৯৬৮     : গণভোটে সুলতানের পদচ্যুতি, ইব্রাহিম নাসির হন প্রেসিডেন্ট
১৯৭৮     : নাসিরের অবসরগ্রহণ, প্রেসিডেন্ট হন মামুন আব্দুল গাইয়ুম
১৭৮৮     : শ্রীলঙ্কার দুর্বৃত্তদের অভ্যুত্থানচেষ্টা, ভারতের চেষ্টায় ভুণ্ডুল হয়
১৯৯৮     : প্রেসিডেন্ট গণভোটে পঞ্চম মেয়াদে পুনর্নির্বাচিত গাইয়ুম
১৯৯৯, নভেম্বর: পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়, ৪০টি আসনে ১২০ জনের স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশগ্রহণ
২০০৩     : নব্বই ভাগের বেশি ভোট পেয়ে ষষ্ঠ বারের মত গাইয়ুম পুর্নির্বাচিত
২০০৮     : বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে জরুরি অবস্থা জারি
২০০৫, জুন: পার্লানেন্টে বহুদলীয় গণতন্ত্র অনুমোদন
২০০৫, আগস্ট: বিরোধীদলীয় নেতা মোহাম্মদ নাশিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাবাদ ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ
২০০৮, আগস্ট: গাইয়ুমকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট হলেন মোহাম্মদ নাশিদ
২০১০, জুন: বিরোধীদের অবরোধের মুখে মন্ত্রিসভার পদত্যাগ
২০১২, জুন: প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ
২০১২, ফেব্রুয়ারি: প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের পদত্যাগ। ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ ওয়াহিদ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ
২০১২, জুলাই: প্রধান বিচারপতিকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়ায় নাশিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
২০১৩, নভেম্বর: গাইয়ুমের সৎভাই আব্দুল্লাহ ইয়ামিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী
২০১৫, ফেব্রুয়ারি: নাশিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ, গ্রেপ্তার
২০১৫, মার্চ: নাশিদের ১৩ বছরের কারাদণ্ড
২০১৬, জানুয়ারি: স্বাস্থ্যগত কারণে নাশিদের মুক্তি
২০১৭, ডিসেম্বর: চীনের সাথে মুক্ত বাণিজ্যচুক্তি, ভারতের ক্ষোভ
২০১৮, ফেব্রুয়ারি: রাজনৈতিক গোলযোগ, সুপ্রিম কোর্টের রাজবন্দীদের মুক্তি দেয়ার নির্দেশ, জরুরি আইন জারি, প্রধান বিচারপতি গ্রেপ্তার।

তথ্যসূত্র: ব্লুমবার্গ, পিটিআই, বিবিসি ও উইকিপিডিয়া।