চিকিৎসা নিতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ!

Print Friendly

ঢাকা: মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে সরকার মনোযোগী। কিন্তু যাদের মাধ্যমে সেবা পৌঁছবে, সেখানে গাফিলতি। স্বাস্থ্যখাতে পেশাগত রাজনীতি অনেক ভালো কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শক্ত তদ্বিরের কারণে চিকিৎসকদের গ্রামে পাঠানো যাচ্ছে না। নিয়োগ বাণিজ্য হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হচ্ছে দুর্নীতি করার জন্য। পদায়ন, বদলিসহ স্বাস্থ্যখাত শৃঙ্খলায় আনা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যসেবা এখন পণ্য হয়েছে। চড়া দামে কিনতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

স্বাস্থ্য খাতের এই পুরোনো চিত্র ছিলো চলতি বছরও। বিশেষ করে মাতৃ স্বাস্থ্যসেবার কিছুটা অবনতি লক্ষ করা গেছে। স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে ব্যয় বেড়েছে মানুষের। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবসহ অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের পরিমাণও বেড়েছে।

পাশাপাশি আশার খবরও ছিল। সরকারি-বেসরকারি নতুন হাসপাতাল হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে নিয়োগ পেয়েছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক চিকিৎসক ও নার্স। কিছুটা হলেও স্বাস্থ্যসেবায় গতি এসেছে। হার্টের রিং ও পেসমেকারসহ হৃদরোগ চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জামাদির মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যখাতে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা দিতে দেশে কাজ করেছে। জনবল বৃদ্ধি, অবকাঠামোর উন্নয়ন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যু হ্রাস, ওষুধের সরবরাহ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যখাতে ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রম ইত্যাদি উন্নয়নমূলক উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সফলতা পেয়েছে সরকার।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বাস্থ্যখাতে জনবল সংকট, অনিয়ম-দুর্নীতি, নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব এবারও ছিল। এসব ব্যর্থতা কাটিয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে পারাটাই মুখ্য বিষয়। সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যখাত কাজ করে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করছে। এগুলো প্রকাশও করেছে। এতে যেমন বর্থ্যতা প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি কিছু না কিছু সাফল্যও এসেছে। তবে বর্তমান সময়ে মা ও শিশু মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়া বড় ধরনের ব্যর্থতা।

এ ব্যাপারে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রশিদ-ই মাহবুব বলেন, মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে সরকার মনোযোগী। কাজও করছে। কিন্তু যাদের মাধ্যমে সেবা পৌঁছবে, সেখানে গাফিলতি আছে। স্বাস্থ্যখাতে পেশাগত রাজনীতি অনেক ভালো কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শক্ত তদ্বিরের কারণে চিকিৎসকদের গ্রামে পাঠানো যাচ্ছে না। নিয়োগ বাণিজ্য হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হচ্ছে দুর্নীতি করার জন্য। পদায়ন, বদলিসহ স্বাস্থ্যখাত শৃঙ্খলায় আনা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যসেবা এখন পণ্য হয়েছে। চড়া দামে কিনতে গিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।

বছরজুড়ে নতুন ও পুরোনো রোগ বেশ ভুগিয়েছে মানুষকে। মে মাসে ঢাকা শহরে চিকুনগুনিয়া মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরেও। চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিতর্ক ওঠে। রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ। বেশ দুর্ভোগ পোহাতে হয় আক্রান্তদের। হামে আক্রান্ত হয়ে সীতাকুন্ডের ত্রিপুরাপাড়ায় ৯ শিশুর মৃত্যু হয়। আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে ডিপথেরিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। দেশে ২০ থেকে ২৫ বছর আগে বিলুপ্ত হওয়া ডিপথেরিয়া কক্সবাজারে আশ্রয়রত রোহিঙ্গাদের মধ্যে শনাক্ত হয়। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের মধ্যে এইচআইভি/এইডস সংক্রমণ নতুন উদ্বেগ ছড়ায়। মিয়ানমারের রাখাইন থেকে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে অন্তত পাঁচ হাজার এইচআইভি আক্রান্ত বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৯৭ জনকে তলিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন শিশু, ৩৩ জন পুরুষ ও ৪৯ জন নারী।

আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রম আশানুরূপভাবে প্রসারিত হয়নি। দেশের বাইরে যেতে হচ্ছে রোগীদের। সেখানে গিয়েও রক্ত সম্পর্কের বাইরে অনাত্মীয়ের কিডনি গ্রহণ করছেন।

আগের বছরের মতো এ বছর জনবল বাড়লেও সেবার মান বাড়েনি সরকারি হাসপাতালগুলোতে। বিনামূল্যে জটিল এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসা পাওয়া কঠিন ছিল। সরকারি নিয়ন্ত্রণে নেই বেসরকারি চিকিৎসাসেবা। দেশের অধিকাংশ মানুষ বেসরকারি হাসপাতালের উচ্চ চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে পারে না। অসুস্থতার চিকিৎসা করাতে গিয়ে দেশে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের ন্যূনতম চিকিৎসা প্রাপ্তির সুযোগ সংকুচিত করে তুলছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি।

এমন পরিস্থিতিতে দরিদ্র-মধ্যবিত্ত-ধনী সব শ্রেণির মানুষের জন্য ন্যূনতম মানসম্পন্ন সেবা প্রদান জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিষয়ক কোনো নীতিই বাস্তবে কার্যকর করে তুলতে পারেনি সরকার। সরকারি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার সঙ্গে সম্পৃক্তদের দায়িত্ব পালনে অবহেলার বিষয়টি দীর্ঘ বছর ধরে বেশ আলোচিত হয়ে আসছে। বর্তমান সরকারও এ সমালোচনা থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

সরকারি চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতির হার ফের বেড়েছে। তাদের কেউ কেউ কর্মস্থলে গিয়ে উপস্থিতি খাতায় স্বাক্ষর দিয়েই চলে যান। অনেকে আসেন দিনের শেষ বেলায়। থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে চিকিৎসকদের দেখা পান না রোগীরা। তবে নিজেদের আবাসিক কক্ষে গড়ে তোলা অবৈধ চেম্বারে অফিস সময়ে চড়া ফি নিয়ে রোগী দেখতে ভোলেন না চিকিৎসকরা। কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গঠিত পরিদর্শন টিমের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। থানা পর্যায়ে টিমের সদস্যরা যান না। এমনকি থানা পর্যায়ে সব রোগীকে বিনা টাকায় চিকিৎসা ও ওষুধ না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অনুকম্পা ছাড়া বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। ফলে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অনেক রোগীকে সাধারণ ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে হয়। আর হাসপাতালে কী কী ওষুধ বিনা টাকায় দেওয়া হয়ে থাকে, তা রোগী ও তাদের অভিভাবকদের জানার সুযোগ দেওয়া হয় না। এতে নিরুপায় হয়ে রোগী বাঁচানোর তাগিদে বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনেন রোগীর লোকজন। বর্তমান সরকারও স্বাস্থ্য সেক্টরকে দুর্নীতি ও দলীয় লোকজনের অহেতুক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখতে পারেনি। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির অনেক ঘটনায় অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

আশার খবরও ছিল। স্বাস্থ্যখাতে এ বছর রেকর্ডসংখ্যক জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একসঙ্গে ১০ হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়ায় সরকারি নার্স সংকট কেটে যায়। একইভাবে ৫ শতাধিক চিকিৎসক পদোন্নতি পান।

স্বাস্থ্যবিষয়ক সহস্রাব্দ লক্ষ্য অর্জনেও অগ্রগতি হয়েছে। অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী শিশুর কম ওজন হার ১৯৯০ সালের ৬৬ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী শিশু মৃত্যুর হার ১৯৯০ সালের তুলনায় ৭১ শতাংশে কমে এমডিজি ৪ অর্জিত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো ১৯ লাখ ৬৫ হাজার প্রসব-পূর্ব সেবা দিয়েছে। এগিয়ে চলেছে স্বাস্থ্যখাতে ডিজিটাল বাংলাদেশ কার্যক্রম। মাঠ পর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে ল্যাপটপ ও ট্যাবলেট কম্পিউটার। গ্রাম এলাকার প্রতিদিনের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের সব পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং করা সম্ভব হচ্ছে। অবশেষে পোলিওমুক্ত দেশ হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সার্টিফিকেট গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ।

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার উন্নয়নে বেশ কিছু আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সেগুলোর কয়েকটি হলো ‘রোগী সুরক্ষা আইন-২০১৪’ এবং ‘স্বাস্থ্যসেবা দানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা আইন-২০১৪’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে প্রণীত হয়েছে ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন-২০১৪’। ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন (সংশোধিত) আইন-২০১৪’। সংসদে পাস হয়েছে ওষুধনীতি আইন। পোলিওর পর নির্মূল হয়েছে ধনুষ্টংকার রোগ।

উখিয়া, টেকনাফ ও বান্দরবানে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে বাড়তি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিয়েছে সরকার। নতুন স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে। গর্ভবতী নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৫২ হাজার শিশুকে হাম, রুবেলাসহ নানা রোগের টিকা দেওয়া হয়েছে। ৪০টির বেশি বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বাস্থ্য কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। একইভাবে রোহিঙ্গা নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মোট ১০টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। মেডিক্যাল টিমগুলো ৮ থেকে ১০ প্রকার ওষুধ এবং তিন ধরনের অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী (কনডম, খাবার বড়ি, তিন মাস মেয়াদি ইনজেকশন) বিতরণ করছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৭৩টি নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হয়েছে।