রংপুরে হিন্দুদের ওপর হামলা কি এড়ানো যেত?

Print Friendly

8

ফেইসবুকে ধর্মীয় কটুক্তি ছড়ানোকে কেন্দ্র করে রংপুরে গঙ্গাচড়ায় শুক্রবার হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে হামলা ও আগুনে অন্তত এগারোটি ঘর পুড়েছে। উত্তেজিত জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে ওইদিন ঘটনাস্থলেই মারা গেছে একজন এবং বেশ কয়েকজন হামলাকারী আহত হয়েছে।

যেহেতু ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে থেকেই বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে আলোচনা এবং ক্ষোভ বিরাজ করছিল, এমনকি চারদিন আগে একটি মামলাও হয়েছিল, তাই প্রশ্ন উঠছে এ ঘটনা এতটা ছড়িয়ে পড়লো কী করে?

স্থানীয়রা জানান গত ২৮ অক্টোবর প্রথম টিটু রায়ের ছবি দিয়ে একটি ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করা ইসলামের নবীর অবমাননাকর একটি পোস্ট নিয়ে রংপুরে আলোচনা শুরু হয়। এরপর বিষয়টি স্থানীয়ভাবে দানা বাধঁতে থাকে। ৬ই নভেম্বর রাজু নামের একজন বাদী হয়ে গঙ্গাচড়া থানায় টিটু রায়ের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। টিটু রায়কে গ্রেপ্তারের দাবিতে স্থানীয় পুলিশ সুপারের কাছে একটি স্মরকলিপি দেয়া হয়েছিল।

ঠাকুরপাড়ার টিটু রায়ের ভাই বিপুল রায় বলেন, ”এটা নিয়ে উত্তেজন ছিল। হাটে-বাজারে আলোচনা হয়েছে। মাইকেও প্রচার হয়েছে যে শুক্রবার মানববন্ধন হবে। তাই আগেরদিনই আমার বউরে বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দিয়েছি।”

খলেয়া উইনিয়নের একজন কাউন্সিলর জানান এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছিল এবং ঠাকুর পাড়ায় গ্রাম পুলিশ দিয়ে আগে থেকে পাহারাও বসানো হয়েছিল।

ঠাকুর পাড়া থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দুরে শলেয়াসা বাজারের ব্যবসায়ী ফিরোজ আহমেদ জানান, তিনি দুই তিনদিন আগে থেকে এলাকায় মাইকিং করতে শুনেছেন। সেখানে কী বলা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “দুইদিন-তিনদিনব্যাপী মাইকিং হইছে। যে এরকম আমাদের নবীর নামে কটুক্তি, ব্যঙ্গচিত্র ছবি বাইর করার কারণে আমরা একটা মানববন্ধন করব। আপানারা সকল মুসলিম ভাইয়েরা একত্রিত হয়ে মানববন্ধনে থাকার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। এই কথা বলা হইছে।”

ফিরোজ আহমেদ জানান শলেয়াসা বাজারে শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর একটি মানববন্ধন হয়। জনগণকে শান্ত রাখতে বাজারের ওই মসজিদে ওইদিন পুলিশের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নামাজ আদায় করেন এবং বক্তৃতাও করেন।

”পুলিশের অনুমোদন নিয়ে নামাজের পর সেখানে ১০-১৫ মিনিটের একটি মানববন্ধন হয় এবং পরে তারা যে যার বাড়ীতে চলে যান। কিন্তু ঘটনার পর তিনটা থেকে সাড়ে তিনটার দিকে আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসে এবং পরিস্থিতির অবনতি হয়।”

রংপুরের একজন মানবাধিকার ও সাংস্কৃতিক কর্মী কে. এইচ. এম. ফখরুল আনাম মনে করেন এ ঘটনার শুরুতেই প্রশাসন গুরুত্ব দিলে ঘটনা এতদূর গড়াতো না। তিনি বলেন, “রামু থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিৎ ছিল, রামু থেকে যদি শিক্ষা না নিয়ে থাকি তাহলে পাবনা থেকে অথবা নাসিরনগর থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া উচিৎ ছিল। কারণ ২৮ তারিখে বিষয়টি জানাজানি হয়। ৬ তারিখে একটি মামলা হয়।”

ফখরুল আনাম বলেন, “জনপ্রতিনিধিরা ওখানে ছিল, তিনটি উপজেলার সমন্বয়ে সেখানে ইউএনওরা আছেন তাদের নিয়ে বসা উচিৎ ছিল। পলিটিকাল লোক, সুশীল সমাজের সদস্য, ওখানে মসজিদের ইমাম বা যারা ধর্মীয় বিষয়টি নিয়ে বেশি উত্তেজনা করেছে তাদেরকে নিয়ে বসলে আজকে ঘটনা এতদূর হতো না। আমার কাছে মনে হয়েছে যে সবকিছু মিলিয়ে শুরুতে গুরুত্বের অভাবটা ছিল।”

সাধারণ মানুষের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিলে বিশেষ করে টিটু রায়কে গ্রেপ্তার করলে পরিস্থিতি এমন হতো না বলে স্থানীয় মুসল্লিরা দাবি করেন।

তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন আগে থেকেই তাদের প্রস্তুতি ছিল। রংপুরের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, “জুম্মার নামাজের পর মানববন্ধন শেষে সবাই চলেও গিয়েছিল কিন্তু পাশের একটি ইউনিয়নের একজন সাবেক চেয়ারম্যান দুলাল চৌধুরীর জানাজায় অনেক মানুষ ছিল। সেখানে উসকানি দিয়ে তাদের এদিকে নিয়ে আসা হয়।”

রংপুরের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, “আরো বেশি ক্ষয়ক্ষতি হতে পারতো। কিন্তু সেটা হয়নি। যতটুকু ঘটনা ঘটেছে এটা নুন্যতম। ক্যাজুয়ালটি এর চেয়ে কমানো সম্ভব ছিল না।” সূত্র: বিবিসি বাংলা।