ঠিকাদারি ব্যবসা এখন সনাতন ধ্যান-ধারণার অনেক ঊর্ধ্বে

Print Friendly
ঠিকাদারি ব্যবসা এখন সনাতন ধ্যান-ধারণার অনেক ঊর্ধ্বে

ঢাকা : দেশের কনস্ট্রাকশন খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ম্যাক্স গ্রুপ। রেলসংশ্লিষ্ট নির্মাণে দেশীয় ঠিকাদারের অন্যতম তারা। এর বাইরে ফ্লাইওভারসহ অন্যান্য মেগাপ্রকল্পেও সাফল্য দেখিয়েছে তারা। গ্রুপের দুটি বিদ্যুেকন্দ্রের ইপিসি কন্ট্রাক্টরও ছিল নিজেরাই। প্রথম দেশীয় ঠিকাদার হিসেবে ইপিসি কন্ট্রাক্টের অভিজ্ঞতা

নিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন গ্রুপটির নির্বাহী পরিচালক কাজী ইয়ামিনুর রশীদ তুর্য। আলোচনায় উঠে আসে ঠিকাদারি ব্যবসার পরিবর্তিত স্পিরিটও।

ম্যাক্স গ্রুপের দ্বিতীয় বিদ্যুেকন্দ্রটি সম্প্রতি উত্পাদনে এসেছে। যতটুকু জেনেছি, প্রথম স্থানীয় ঠিকাদার হিসেবে আপনারা নিজেরাই দুটি কেন্দ্রের ইপিসি সম্পন্ন করেছেন। অভিজ্ঞতাটি শেয়ার করবেন…

ঠিকাদার হিসেবে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ নেয়া ও তা সফলভাবে সম্পন্ন করায় ম্যাক্স গ্রুপের ইতিহাস অনেক দিনের। মেগাপ্রকল্পে আমাদের ট্র্যাক রেকর্ড চমত্কার। আপনারা জানেন, রেল কনস্ট্রাকশন ও এর ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে আমরা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কোম্পানি। আরো বেশকিছু খাতে এ গ্রুপের ব্যবসা রয়েছে।

বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সরকারের যে ভিশন, তার অংশ হওয়ার চেষ্টায় আমরা ২০১১ সালে বিদ্যুত্ উত্পাদনে যুক্ত হই। ম্যাক্স পাওয়ারের প্রথম বিদ্যুেকন্দ্রটি ছিল ঘোড়াশালে, ৭৮ দশমিক ৫ মেগাওয়াটের একটি সিম্পল সাইকেল প্লান্ট। বিদ্যুেকন্দ্রের অনুমোদন পাওয়ার পরই আমরা ভাবি, দেশের অন্যসব প্লান্টের মতো ইপিসির কাজটি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) বিদেশী ঠিকাদার দিয়ে না করিয়ে আমরা নিজেরাই করব। আমাদের ইঞ্জিনিয়াররাও সাহস করলেন। এর প্রতি সম্মান জানিয়ে কাজ শুরু করলাম। সফলও হলাম।

এটি অসম্ভব কাজ নয়, আবার খুব সোজাও নয়। বিশেষ করে যখন আমরা দেখি, বিদ্যুত্ উত্পাদন খুব সংবেদনশীল একটি কাজ। সেখানে টেকনিক্যাল দিকগুলোয় কোনো ভুল হলে এর মাশুল অনেক বেশি। দেশে একটি প্রতিষ্ঠিত বিজনেস হাউজের অভিজ্ঞতা আমরা সবাই জানি।

সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে ম্যাক্স পাওয়ারের দ্বিতীয় বিদ্যুেকন্দ্রটি যখন অনুমোদিত হয়, তখনো নিজেরাই ইপিসি করার সাহস করলাম। এটি আবার কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্ট। তুলনামূলক জটিল। আমরা জানতাম, আমাদের জনবল, প্রকৌশল দক্ষতা সবই আপ টু দ্য মার্ক। আগের বিদ্যুেকন্দ্রটি নির্মাণের সময় আমাদের কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছিল, একটা এক্সপার্ট টিমও তৈরি হয়েছিল। সবমিলে তারা নতুন প্রকল্পটি চমত্কারভাবেই সম্পন্ন করল। আমরা এখন অনেক আত্মবিশ্বাসী। খুবই ভালো লাগল, যখন হিসাব করে দেখলাম যে, তৃতীয় পক্ষের বিদেশী ঠিকাদারকে দিয়ে ইপিসি সম্পন্ন করতে ম্যাক্সকে যে ব্যয় করতে হতো, নিজেরা কাজটি করায় খরচ তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।

চট্টগ্রামে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফ্লাইওভারটি আপনারা নির্মাণ করছেন। এটি কবে নাগাদ নগরবাসীর জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত হবে?

চট্টগ্রামে আমরা চৌধুরী আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার নির্মাণ করছি। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি, নির্মাণে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও গুণগত মানের কারণে ফ্লাইওভারটি এরই মধ্যে প্রশাসন ও সর্বসাধারণের প্রশংসা পেয়েছে। এর নির্মাণকাজ অনেকাংশেই সম্পন্ন হয়ে গেছে। কিন্তু নকশায় নতুন কিছু বিষয় সংযোজিত হওয়ায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করতে কিছুটা সময় লেগেছে। আমরা আশা করছি, চলতি বছরের শেষের দিকে চট্টগ্রামবাসীর জন্য ফ্লাইওভারটি পুরোদমে খুলে দেয়া সম্ভব হবে।

দেশের মেগাপ্রকল্পে স্থানীয় ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ কতটা বাড়ছে?

বর্তমানে অধিকাংশ মেগা প্রকল্পই আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে হয়। সেখানে বিশ্বের সব প্রান্ত থেকেই কোম্পানিগুলো টেন্ডার ড্রপ করে। সবাই নিজেদের যোগ্যতা, সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। এমপ্লয়ার তথা সরকারের কর্তৃপক্ষ যোগ্যদের কাজ দেয়। কেবল মেগাপ্রকল্পে অভিজ্ঞতার দিক থেকে আমরা বিদেশী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে আছি। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কারিগরি, ব্যবস্থাপনাগত ও আর্থিক সক্ষমতায় ম্যাক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখন যথেষ্ট সক্ষম। অভিজ্ঞতার বিষয়টি আমরা হায়ারিংয়ের মাধ্যমে হ্যান্ডল করতে পারি, যেমনটি আমাদের বিভিন্ন প্রকল্পে এরই মধ্যে দেখা গেছে। বিশ্বের সেরা কোম্পানিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়েও অনেকে বাংলাদেশী কোম্পানিতে কাজ করতে আসছে। ষাটের দশকে প্রচুর আমেরিকান এক্সপার্ট উচ্চ বেতন-ভাতায় জাপানি কোম্পানিগুলোয় কাজ করতেন, এখন চীনা কোম্পানিগুলোয় যেমন করছেন। আমি মনে করি, উত্কর্ষে পৌঁছানোর সাধনা আর সাহস থাকলে সবাই একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। মেগাপ্রকল্পে বিদেশী কোম্পানির অংশীদার হিসেবেও স্থানীয় কোম্পানিগুলো নিজেদের সমৃদ্ধ করছে। আশা করি, এক দশক পরে দেশের অনেক মেগাপ্রকল্প আমাদের মতো কোম্পানিগুলো এককভাবেই সম্পন্ন করতে পারবে।

স্থানীয় ঠিকাদার কোম্পানিগুলো পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির স্পিরিটটা কতটা আত্মস্থ করছে? আপনি কী মনে করেন?

এক কথায় বললে, ঠিকাদারি এখন আর সনাতন ধ্যান-ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটা সময় ছিল, ঠিকাদার বললেই মানুষ পেশিশক্তি, বাহুবল ও রাজনৈতিক আনুকূল্য পাওয়া একটি শ্রেণী বলে ধরে নিতো। তবে প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার আর দ্বিতীয় শ্রেণীর ঠিকাদারদের যোগ্যতা, আচরণ, কাজের ধরন সর্বোপরি পেশাদারিত্বে একটি পার্থক্য সবসময়ই ছিল। দেশের কিছু প্রকল্পে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার করা ঠিকাদারের কথা আমরা পত্রপত্রিকায় পড়েছি। তবে বর্তমানে প্রকল্পের প্রক্রিয়াগত বিষয়গুলো যেভাবে এগোচ্ছে, আমি নিশ্চিত তারা আগামীতে ব্যবসায় থাকতে পারবেন না। দেখতেই পাচ্ছেন, সব কাজেই প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা ক্রমেই বাড়ছে। সংবাদ মাধ্যমের কল্যাণে অনিয়মকারী কোনো ঠিকাদারের নামই কিন্তু গোপন থাকছে না।

যেসব প্রকল্পে আন্তর্জাতিক টেন্ডার হয়, সেখানে তথাকথিত সেসব সুবিধা নিয়েও কাজ হয় না। বর্তমান প্রক্রিয়ায় স্থানীয় কোম্পানি হিসেবে আমরা মাঝে মধ্যে বিদেশীদের সঙ্গে অংশীদারিত্বে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করি। অংশীদার বাছাইয়ের সময় বিদেশীরা আমাদের সক্ষমতা আর ট্র্যাক রেকর্ডগুলোকেই মূল্যায়ন করে, আমরাও তাদেরটা। এমপ্লয়ার হিসেবে সরকারের প্রতিষ্ঠানও ঠিকাদারের যোগ্যতা বিবেচনা করে। আমি বলব, এখন প্রতিযোগিতা কেবল সক্ষমতা ও দক্ষতার।

আপনারা পরবর্তী কোন মেগাপ্রকল্পে যুক্ত হচ্ছেন?

ইচ্ছা ও পরিকল্পনায় অনেক কিছুই আছে। ম্যাক্স গ্রুপ দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে নিজের সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে। কিছুদিন আগেই অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে আমরা কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে যুক্ত হয়েছি। কক্সবাজারে হতে যাওয়া দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন রেলস্টেশনটিও আমরা নির্মাণ করব। ভবিষ্যতে আরো বড় অবকাঠামোর কাজ এককভাবে সম্পন্ন করার দৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে আমরা নিজেদের প্রস্তুত করছি।