লক্ষ্মীপুরে মাছ চাষে সৃষ্টি হচ্ছে অসংখ্য কর্মসংস্থান

Print Friendly

1

নিজস্ব প্রতিবেদক :
স্থানীয়ভাবে চাহিদার প্রায় ৬২ শতাংশ বেশি মাছ উৎপাদন হয় লক্ষ্মীপুরে। যা মোট চাহিদার দ্বিগুন। দিনদিন মাছ উৎপাদনেও আগ্রহী হয়ে উঠছে এখানকার মানুষ। একদিকে নদীতে ধরা পড়ছে প্রচুর পরিমানে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। অন্যদিকে খাল-বিল, পুকুর ও প্লাবনভূমি পরিকল্পিত ও বাণিজ্যিকভাবে করা হচ্ছে মাছের চাষ। এতে সৃষ্টি হয়েছে বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান। তবে অধিকাংশ পুকুর এখনো পরিকল্পিত ও বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষের আওতায় আসেনি বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা।
এ পেশায় জড়িতরা জানায়, জেলার চাহিদা মেটাতে এক সময় খুলনা, বরিশাল, চাঁদপুর, ফরিদগঞ্জসহ কয়েকটি জেলা থেকে ট্রাক ভর্তি চিংড়ি, তেলাপিয়া, পাঙাস, রুই কাতল ও মৃগেলসহ বিভিন্ন মাছ আমদানি করা হতো। স্থানীয়ভাবে মাছের উৎপাদন বাড়ায় রূপ অনেকটা পাল্টে গেছে। এখনো উন্নত জাতের কিছু মাছ আমদানি হলেও সিংহভাগ চাহিদা পূরণ হয় স্থানীয়ভাবে। আর উদ্বৃত্ত মাছ বেপারীর সরবরাহ করছে পার্শ্ববর্তী জেলায়। এতে দেশে মাছের ঘাটতি পূরণেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তথ্য মতে, লক্ষ্মীপুর জেলার আয়তন ১ হাজার ৪৪০ দশমিক ৩৯ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা ১৭ লাখ ২৯ হাজার। জনসংখ্যা অনুযায়ী প্রতি বছর জেলায় মাছের চাহিদা ৩৭ হাজার ৮৬৫ মেট্রিক টন। জেলায় বছরে গড় ৬১ হাজার ৪১৫ দশমিক ৩১ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। চাহিদার তুলনায় ২৩ হাজার ৫৫০ দশমিক ৩১ মেট্রিক টন বেশি মাছ উৎপাদন হচ্ছে। যা মোট চাহিদার প্রায় ৬২ শতাংশ বেশি।
এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে মাছের উৎপাদন ছিল ৪৪ হাজার ১৪৩ মেট্রিক টন। এরপরের ২০১৪-১৫ বছরে ৫২ হাজার ৮৯০ মেট্রিক টন, তারপর ২০১৫-১৫ অর্থ বছরে তা বেড়ে ৬০ হাজার ২৮০ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয় লক্ষ্মীপুর জেলায়। চলতি বছর এসব রেকর্ডকে হার মানিয়ে মাছ উৎপাদন বেশি হয়েছে। এর মধ্যে মেঘনা নদীতেই ধরা পড়ে ২০ হাজার ৫৮০ মেট্রিক টন ইলিশ মাছ। এছাড়া চিংড়ি উৎপাদন হয়েছে ৯১ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন। বাকী সব মাছ জেলার বিভিন্ন মৎস্য খামারসহ বিভিন্ন জলাশয়ে উৎপাদন হয়ে থাকে।
জেলায় সরকারিভাবে ৭৩টি ও বেসরকারি ৫১ হাজার ৯১০টি পুকুর রয়েছে। এতে বছরে ২৯ হাজার ৮৬২ দশমিক ৬ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে সব পুকুর পরিকল্পিত ও বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ হয় না। এছাড়াও জেলার ১১৪টি বরোপিট, ২টি নদী, ১৫টি বিল, বর্ষায় প্লাবিত ধানক্ষেত, প্লাবনভূমি ও খাল রয়েছে ১২৭টি এবং ৩৯০টি খাচায় মাছ চাষসহ ৩১ হাজার ৫৫২ দশমিক ৭২ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হয়। জেলায় মোট মৎস্য আড়ৎ রয়েছে ১২৫টি, মাছ বাজার ১৯০টি, মাছ ঘাট ১৬টি। এসব স্থান থেকে স্থানীয় ও বিভিন্ন স্থানের পাইকারী ব্যবসায়ীরা মাছ সংগ্রহ করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায়।

2
তথ্যে আরো জানা যায়, মৎস্য চাষ লাভজনক হওয়ায় দিনদিন এ চাষে মানুষ আগ্রহী হয়ে পড়েছে। জেলায় ৫২১টি মৎস্য খামার রয়েছে। নারী-পুরুষ মিলে ৫৪ হাজার ১২৫ জন মৎস্য চাষী রয়েছে। মাছ চাষ করে নিজের অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন তারা। এছাড়াও সৃষ্টি হয়েছে যুব সমাজের জন্য অসংখ্য কর্মসংস্থান। এখানে মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের সাথে জড়িত আছেন ৪৫ হাজার ৭৭১ জন। আইডিকার্ড ধারী জেলে সংখ্যা ২৭ হাজার ৬৬৯ জন। তবে জেলায় ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষে এগিয়ে রয়েছে।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুরে মাছ উৎপাদনে অনেক সরকারি, বেসরকারি হ্যাচারি ও নার্সারি গড়ে উঠেছে। তবে বেসরকারি হ্যাচারি ও নার্সারির সংখ্যা বেশি এখানে। জেলায় সরকারি হ্যাচারি একটি। বেসরকারি হ্যাচারি ১৩টি। এর মধ্যে সরকারী ভাবে ১টিই কার্প হ্যাচারি। বেসরকারি কার্প হ্যাচারি ৭টি ও ৫টি মনোসেক্স তেলাপিয়া রেনু উৎপাদনকারী হ্যাচারি। (ডিম থেকে রেনুতে পরিণত হতে ২৭ দিন সময় লাগে)
এছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি নার্সারির সংখ্যা ১০৩টি। এর মধ্যে ২টি সরকারী নার্সারি। এতে মোট ১৯ দশমিক ২৫ লাখ পোনা উৎপাদন হয়। আর বেসরকারি ১০২টিতে ৪৮৭.৬৩ লাখ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদন হয়ে থাকে। জেলায় ৩৯০ জন মৎস্য পোনা ব্যাবসায়ী রয়েছেন। এবং মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র আছে ১টি। উৎপাদিত রেণু ও পোনা স্থানীয় মৎস্য চাষিদের চাহিদা মিটিয়ে কুমিল্লা, চাঁদপুর সিলেট, বরিশাল সহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয় খামারিরা শীর্ষ সংবাদকে জানায়, রেণু-পোনাসহ অধিক পরিমানে মাছ উৎপাদন হয়ে থাকে এ জেলায়। এ হিসেবে এখানে মাছের দামও কম। খামারীদের মাছ ও রেণু-পোনা এখানকার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে। তবে অধিকাংশ পুকুরে এখনো বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করা হচ্ছে না। এসব পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে মাছ করা হলে দেশের চাহিদা মেটানোসহ জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত বলে জানান তারা।

3
২০০০ সালে মৎস্য বিভাগের এক কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়ে লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীরহাট এলাকার পৈত্রিক জমিতে আম্বার ফিশারিজ নামে একটি মনোসেক্স তেলাপিয়া মাছের খামার গড়েন কামরুল আলম চৌধুরী ও তার স্ত্রী ফারজানা চৌধুরী। এতে তারা বিনিয়োগ করেন ৩০ লাখ টাকা। এতে পুকুর রয়েছে ৩৫টি। পাশাপাশি করেন কার্প ও মনোসেক্স পোনা উৎপাদন। কথা হলে ওই খামারের মহা-ব্যবস্থাপক আমিন হোসেন শীর্ষ সংবাদকে জানান, রুই কাতল, মৃগেল, স্বরপুটি, কই, সিং, মাগুর, সিলবার কাপ ও পাঙাশ মাছ উৎপাদন হয়ে থাকে। এখানকার মাছ ও রেনু-পোন জেলার চাহিদা মিটিয়ে কুমিল্লা, চাঁদপুর, সিলেট, ভোলা, বরিশাল, বরগুনা ও রংপুরে সরবরাহ করা হয়।
তিনি আরো জানান, এ খামারকে ঘিরে ৩২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। বছরে আম্বার ফিশারিজ অ্যান্ড হ্যাচারিতে মাছ উৎপাদনে আড়াই কোটি টাকার টার্নওভার হয়ে থাকে। এর মধ্যে রেণু-পোনা ১ কোটির টাকার বেশি সরবরাহ হয়ে থাকে।
লক্ষ্মীপুর মৎস্য ব্যবসায়ী ও শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মনু মিয়া শীর্ষ সংবাদকে জানান, আগে বিভিন্ন জেলা থেকে বেশি মাছ আমদানি করা হতো। বর্তমানে নদীতে প্রচুর পরিমানে ইলিশ ও স্থানীয় ভাবে মাছ উৎপাদন বেড়েছে। এ জন্য বাহিরের মাছও কম আসে। মৎস্য ব্যবসায়ীর বেশির ভাগই মোট সুদে ঋণে আবদ্ধ। সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হলে। মৎস্য উৎপাদনে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতো।
লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা এস এম মহিব উল্যা শীর্ষ সংবাদকে জানান, জেলায় চাহিদার তুলনায় ২৩ হাজার ৫৫০ মেট্রিকটন বেশি মাছ উৎপাদন হয়। ভবিষ্যতে এর উৎপাদন আরো বাড়বে। এতে মাছ চাষে যুবসমাজের জন্য সৃষ্টি হচ্ছে অসংখ্য কর্মসংস্থান। উৎপাদন বৃদ্ধি করতে সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হচ্ছে সব ধরণের প্রস্তুতি। দেওয়া হচ্ছে খামারিসহ মাছ চাষিদের পরামর্শ। এছাড়াও অভিযানের সময় নদীতে মাছ ধরা থেকে বিরতও রাখা হচ্ছে। জেলার ৫ উপজেলায় বিভিন্ন জলাশয়ে অবমুক্ত করা হচ্ছে মাছের পোনা।