মেঘনায় ফের ভাঙন : লক্ষ্মীপুরে দ্বিতীয় ধাপে বাঁধ নির্মানে দাবী

Print Friendly

1

নিজস্ব প্রতিবেদক :
মেঘনা নদীর ভাঙন অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলছে না লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলাবাসীর। এক ভাঙনের ঘাঁ শুকাতে না শুকাতে ফের ভয়াবহ ভাঙন কবলে পড়েছেন উপকূলের বাসিন্দারা। বর্ষায় অতি বৃষ্টি ও নদীর ভাঙন আরো তীব্র আঁকারে রূপ নিয়েছে।
এরই মধ্যে কয়েকটি ইউনিয়নের ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, ব্রীজ-কালভার্ট, হাটবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ হাজার হাজার বিস্তৃর্ণ ফসলী মাঠ নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। হুমকিতে রয়েছে কমলনগর উপজেলা পরিষদ। প্রজেক্ট অনুযায়ী দ্বিতীয় ধাপে কমলনগরের ৮ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধ দ্রুত নির্মাণ না করা গেলে, সময়ের ব্যবধানে মেঘনার করাল গ্রাসে নবনির্মিত বাঁধসহ কমলনগর উপজেলা বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। এতে ব্যস্তে যাবে নদী ভাঙণ প্রতিরোধে সরকারের শত শত কোটি টাকার প্রকল্প। দ্বিতীয় ধাপের রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অর্থবরাদ্ধের জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন এলাকাবাসী।
এদিকে প্রথম ধাপের সরকারি বরাদ্ধে এই উপজেলায় নবনির্মিত এক কিলোমিটার রক্ষা বাঁধের উত্তর অংশে ধস নেমে ভাঙন দেখা দেয়ায় স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। তাদের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিনস্থ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান অনিয়ম, দূর্নীতির মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ করায় রক্ষা বাঁধে ধস নেমেছে। তাই দ্বিতীয় পর্যায়ের নদীর তীর রক্ষা বাঁধ সেনা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে দ্রুত নির্মানের দাবী স্থানীয়দের।

2
লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অফিস সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর জেলার অন্তর্গত রামগতি ও কমলনগর উপজেলা এবং তত সংলগ্ন মেঘনা নদীর ভাঙ্গন থেকে রক্ষা কল্পে নদীর তীর সংরক্ষণে- উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় তিন ধাপে ৩৫ কিলোমিটার নদীর তীরে রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজে সাড়ে ১৩শ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদ দেয় সরকার। প্রথম ধাপে ২০১৪ সালে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় মেঘনা নদী ভাঙন প্রতিরোধে ১৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। এর মধ্যে রামগতির সাড়ে ৪ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১৯ ইঞ্জিনিয়ারি কনস্ট্রাকশন এবং কমলনগর মাতাব্বরহাট এলাকায় এক কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ কাজ পায় নারায়নগঞ্জ ডকইয়ার্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিঃ। অর্থ বরাদ্দের দুই বছর পর প্রতিষ্ঠানটি ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংকে দিয়ে কাজ শুরু করে। যার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যা ভাঙন প্রতিরোধে যথেষ্ট নয়। প্রকল্প অনুযায়ী দ্বিতীয় ধাপে কমলনগর উপজেলার (মতিরহাট থেকে চর ভয়া) ৮ কিলোমিটার ও রামগতি উপজেলার জন্য সাড়ে ৭ কিলোমিটার এবং বাকী ১৪ কিলোমিটার নদীর তীর রক্ষা বাঁধ তৃতীয় ধাপে নির্মাণ হওয়ার কথা রয়েছে।
সরেজমিনে কমলনগরের ভাঙ্গন কবলিত এলাকা ঘুরে দেখা যায়, চলতি বর্ষার মৌসুমে মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে তলিয়ে গেছে কমলনগরের চর ফলকন ইউনিয়নের লুধুয়াঘাট, সাহেবের হাট ইউনিয়নের হাজীগঞ্জ, নবীগঞ্জ, কাদির পন্ডিতের হাট ও চর কালকিনি ইউপি’র জনতা বাজার ও নাসিরগঞ্জের অধিকাংশ এলাকা।

3
উপকূলের বাসিন্দারা জানায়, প্রথম ধাপে সেনা বাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাঁধ নির্মাণ করায় রামগতি উপজেলা রক্ষা পেলেও নদী ভাঙন থেকে রক্ষা পায়নি কমলনগর উপজেলাবাসী। এবারের বর্ষায় মেঘনা নদীর ভাঙন আরো প্রকল্প আঁকার ধারণ করেছে। প্রতিনিয়তই অতি বৃষ্টি আর তীব্র স্রেতে ভাঙছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ব্রীজ, হাটবাজার সহ ফসলী জমি। এছাড়াও গত কয়েক বছরের ভাঙনে উপকূলীয় এলাকার ১৫/২০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘরসহ হাজার হাজার একর ফসলী জমি নদী গর্বে বিলিন হয়ে গেছে। তলিয়ে গেছে ১০ কিলোমিটারের দু’টি বেঁড়ি বাঁধ। দানবের মত গ্রাস করে নিঃশ্ব করে দিয়েছে ওই অঞ্চলের মানুষ গুলোকে।
স্থানিয়দের দাবী, নদীর তীর রক্ষায় কমলনগরের ১ কিলোমিটার যতেষ্ট নয়, ভাঙন প্রতিরোধে ৮ কিলোমিটার রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজ করা অতি জরুরী। তা না হলে ভাঙল কবলে পড়ে কমলনগর উপজেলা নদী গর্বে তলি যাবে। তাই অতিবিলম্বে অর্থবরাদ্দের মাধ্যমে দ্বিতীয় ধাপে রক্ষা বাঁধ নির্মানের দাবী স্থানীয়দের।

নবীগঞ্জ নদীর পাড়ের টং দোকানদার শাহজাহান বলেন, বাড়িসহ ৬ কানি ফসলি জমি নদীতে তলিয়ে গেছে। নিঃস্ব হয়ে নদীর পাড়ে টং দোকান ব্যবসা করে সংসার চাই, তাও কয়েক’শ বার ভাঙ্গল কবলে পড়ে স্থান্তর করতে হয়েছে। কমলনগরকে রক্ষায় দ্রুত নদীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

5

সাহেবের হাট ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা মাকছুদুর রহমান জানান, গত কয়েক বছরের ভাঙনে এই ইউনিয়নের ৩টি ওয়ার্ড, ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১টি মাধ্যমিক স্কুল, ১টি দাখিল মাদ্রাসা ও ২টি আলিম মাদ্রাসা নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। বর্তমানে হুমকিতে রয়েছে ৪টি স্কুল ও ১টি মাদ্রাসা। নদীতে তলিয়ে সাহেবের হাট ইউনিয়ণ পরিষদ ৩ বার স্থানন্তর করা হয়েছে। সহায় সম্বল ও ভিটেমাটি হারাতে হয়েছে তিন ওয়ার্ডে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে।
চর কালকিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফ উল্যাহ জানান, মেঘনা নদী ভাঙন কবলে পড়ে তার ২টি ওয়ার্ড পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নদীতে বিলিন হয়েছে। রক্ষা বাঁধ নির্মাণ না হলে এ ইউনিয়ন পুরোটাই নদী গর্ভে তলিয়ে যাবে। তাই দ্রুত বাঁধ নির্মাণের বাদী জানান তিনি।
কমলনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মো. শফিক উদ্দিন বলেন, রক্ষা বাঁধের এক কিলোমিটার কাজেও পানি উন্নয়ন বোর্ড অনিয়ম করেছে। দ্বিতীয় ধাপে চরকালকিনি ইউনিয়নের মতিরহাট থেকে চর বয়া পর্যন্ত যে ৮ কিলোমিটার রক্ষাবাঁধ নির্মাণের প্রকল্প হয়েছে, তা অতিবিলম্বে অর্থবরাদ্ধ দিয়ে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে বাঁধ নির্মাণ কাজ করা হোক। এতে একদিকে সরকারের উন্নয়ন কাজ সঠিক বাস্তবায়ন হবে, অন্যদিকে ভাঙন থেকে রক্ষা পাবে কমলনগর উপজেলা।
এদিকে ২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১৯ ইঞ্জিনিয়ারি কনস্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন রামগতি ভাঙন রোধে সাড়ে ৪ কিলোমিটার বাঁধ সফলভাবে বাস্তবায়ন করে। কিন্তু একই সময়ের অর্থ বরাদ্দের দুই বছর পর ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান কাজের শুরু করে থেকেই নিম্মমানের বালু ও জিও ব্যাগ ব্যবহারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এতে কাজ শেষ না হতেই নবনির্মিত বাঁধে ধস নেমে ভাঙণ দেখা দেয়। এতে স্থানীয়দের আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

4
জানতে চাইলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এজিএম মাসুদ রানা অনিয়মের বিষয় অস্বীকার করে বলেন, ভালো বালু প্রাপ্তিতে অসুবিধার কারণে সামান্য কিছু অংশে বালুভর্তি জিও ব্যাগ যথাসময়ে ডাম্পিং করা সম্ভব হয়নি। যে কারণে তীব্র জোয়ারে বাঁধের ওই অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফের জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে।

লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী বদরুল মনির হানাফী বলেন, ব্লকের পরে ৪০ মিটার জিও ব্যাগ ড্রাম্পিং না করে ব্লক স্থাপনের কারণে প্রায় ১৫০ মিটার বাঁধে ধস নেমেছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কার হবে। তিনি আরো বলেন, দ্বিতীয় ধাপে মেঘনা নদীর তীর রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ কাজের অর্থ বরাদ্দের জন্য মন্ত্রীসভায় প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। অর্থবরাদ্দ পেলে দ্রুত বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে বলে জানান তিনি।