লক্ষ্মীপুর-মতিরহাট জনপদের সড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ!

Print Friendly

2

নিজস্ব প্রতিবেদক :
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে মেঘনার উপকূলীয় এলাকা মতিরহাট মাছঘাট। পর্যটন স্পোর্ট হিসেবে বেশ পরিচিত এটি। স্থানিয়রা ছাড়াও বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ বিনোদনের জন্য এখানে আসে। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় ক্রমেই পর্যটক শূন্য হয়ে পড়ছে মতিরহাট এলাকা।
কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ বাজার থেকে মতিরহাট মাছঘাট পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার সড়ক একে বারেই বেহাল দশা। সড়কের এক-তৃতীয়াংশ সংযোগ খালে ভেঙ্গে এবং সড়কে বড় বড় খানা-খন্দ সৃষ্টি হয়ে পরিণত হয়েছে মৃতুফাঁদে। প্রয়োজনের তাগিদে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পর্যটক ও এলাকার হাজার-হাজার মানুষ চরম দূর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। এতে প্রায়ই দূর্ঘটনা ঘটছে।

1
জানা যায়, সদর দপ্তরের সাথে তোরাবগঞ্জ, চরলরেঞ্চ, চরমাটিন ও চরকালকিনি ইউনিয়নের ১শ’টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সুগম করতে গত ১৫ বছর আগে তোরাবগঞ্জ বাজার-মতির হাট মাছঘাট ৯ কিলোমটির কাঁচাসড়ক পাকা করা হয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশলীর অধিনে। এরপর গত ৫ বছর পূর্বে তোরাবগঞ্জ বাজার এলাকার কিছু অংশ নামে মাত্র সংস্কার কাজ করা হলেও বাকী অংশের কোন কাজই করা হয়নি। বতর্মানে পুরো সড়কেরই হ-য-ব-র-ল অবস্থা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরো রাস্তার কার্পেটিং উঠে গেছে বহু আগেই। বেশিরভাগ অংশে বড় বড় খাদা-খন্দ সৃষ্টি হয়ে আছে। অধিকাংশ সড়ক ভেঙ্গে নদীর সংযোগ খালে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে রাস্তাটি দিনদিন সরু হয়ে পড়ছে। নদীর জোর আর বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে ভরে সড়কের বড় বড় গর্তগুলো মৃত্যু কূপে পরিণত হয়। এতে চলতে গিয়ে প্রতিদিনই ভাঙ্গছে যানবাহনের এক্সেল, নষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন সরঞ্জাম। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পর্যটক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কৃষক ও মৎস্যজীবিসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ যাতায়াত করতে গিয়ে দূর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।

3
স্থানীয়রা জানায়, কমলনগরের এ চারটি ইউনিয়ন কৃষি, মৎস্যজীবি ও পর্যটন কেন্দ্রীক এলাকা। বিকল্প সহজ কোন সড়ক না থাকায় এ সড়কে মানুষের যাতায়াতও বেশি। সড়কের বেহাল দশার কারণে কৃষি আবাদি ফসল, নদীতে জেলেদের ধরা মাছ শহরে বেশি দামে সরবরাহ করতে পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে ওই এলাকায় স্বল্প মূল্যে বিক্রি করে দিতে হচ্ছে তাদের। এতে উৎপাদন খরচের তুলনায় ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন তারা। তাছাড়া মতিরহাট পর্যটন এলাকা হওয়ায় ঈদসহ বিশেষ মূহুর্তগুলোতে বিভিন্ন স্থান থেকে আগত পর্যটকদের চাপও থাকে। এ সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে তারা পড়ছে বিপাকে।
ফেনীর বাসিন্দা মো.কামাল হোসেন, ঈদ উপলক্ষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রাইভেট কারে করে পর্যটন এলাকা মতিরহাট নদীর পাড়ে ঘুরতে এসেছেন। এসময় তিনি জানান, সড়কের বেহাল দশার কারনে গাড়ি নিয়ে বেকাদায় পড়তে হয়েছে। এমন জানলে এখানে আসতাম না।

4
সিএনজি চালক আলী হোসেন শীর্ষ সংবাদকে বলেন, তোরাবগঞ্জ থেকে মতির হাট যেতে সময় লাগতো ১৫-২০ মিনিট, রাস্তার এ ঝরাজীর্ণের কারণে সেখানে ১ ঘন্টা সময় লাগে। গর্তে পড়ে প্রায়ই গাড়ির সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যায়। তাই তারা অনেক সময় এ সড়কে আসতে চায় না।
এর চারটি ইউনিয়নে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, মাদ্রাসাসহ মোট ১৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ওই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর চলাচলের একমাত্র সড়ক এটি। স্কুলে যাওয়ার সময় সড়কের গর্তের ময়লা পানিতে নষ্ট হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পোষাক। রাস্তাটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সময়মতো তারা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানেও গিয়ে পাঠদানে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। এতে কমলমতি শিক্ষার্থীরা দিন দিন স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছে। সম্প্রতি মতিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দ্রুত রাস্তাটি মেরামতের জন্য মানববন্ধন করেন। স্থানীয় প্রতিনিধিরা প্রতিনিয়ত আশ্বাস দিলেও এখনো পর্যন্ত রাস্তাটি সংস্কারের কাজ শুরু না হওয়ায় চরম হতাশায় রয়েছে এলাকাবাসী।

লক্ষ্মীপুর সরকারী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র জুনায়েদ হাবিব শীর্ষ সংবাদকে জানায়, মতিরহাট থেকে প্রতিদিন তাকে ক্লাস করতে লক্ষ্মীপুর কলেজে আসতে হয়। কিন্তু সড়কের বেহাল দশার কারণে প্রায় সে ১/২টা ক্লাস সময়মত করতে পারে না। তাই সে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এর দ্রুত সংস্কারের দাবী জানায়।

5
মতিরহাটের আলী আকবর ও চর মার্টিন এলাকার মফিজউল্ল্যাসহ কয়েকজন লোক শীর্ষ সংবাদকে জানায়, এ সড়কের বেহাল দশার কারণে সাধারন জনগণকে দূর্ভোগ পোহাতে হয়। রোগী নিয়ে সময়মত হাসপাতালেও পৌঁছানো যায় না। সমস্যার কথা বার বার জনপ্রতিনিধিদের জানিয়েও কোন লাভ হয়নি। আশ্বাস দিয়েই সময় পার করে দেয়।
এ ব্যাপারে চর কালকিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাস্টার মো. সাইফুল্ল্যাহ শীর্ষ সংবাদকে জানান, এ সড়কটি দিয়ে দৈনিক ৫ হাজার মানুষ চলাচল করে। বিভিন্ন এলাকার পর্যটক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় এলাকাবাসী সড়কের বেহাল দশার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের কয়েকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যা সমাধান হচ্ছে না।
জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুরের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনজুরুল ইসলাম শীর্ষ সংবাদকে জানান, তোরাবগঞ্জ-মতিরহাট সড়কটি প্রায় ৯ কিলোমিটার। আইআরআইডিপি’র প্রকল্পের আওতায় প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার একাংশের রাস্তা সংস্কারের কাজের জন্য ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে। কাজটি দ্রুত শুরু করা হবে। বাকি রাস্তা অন্য প্রকল্পের আওতায় এনে সংস্কার করা হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।