লক্ষ্মীপুরে সম্ভবনাময় বিসিক : হারিয়ে যাচ্ছে অব্যবস্থাপনায়

Print Friendly

7নিজস্ব প্রতিবেদক :
‘বেকার সমস্যা সমাধান ও শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তি’ এ লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে লক্ষ্মীপুরে গড়ে তোলা হয় বিসিক শিল্পনগরী এলাকা। কিন্তু অপার সম্ভাবনা থাকা সত্বেও দীর্ঘ ২০ বছরেও এখানে গড়ে উঠেনি উল্লেখ্যযোগ্য কোন শিল্প কারখানা। যেগুলো গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে লোকসানে মুখে সেগুলো এখন বন্ধের পথে। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ড্রেনেজ সমস্যা বিসিকের প্রধান সমস্যা। পাশাপাশি রয়েছে তীব্র লোডশেডিং ও গ্যাস-পানি সমস্যা। এসকল নানাবিদ সমস্যায় অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে পুরো বিসিক শিল্পনগরী। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, কর্তৃপক্ষের উদাসিনতাসহ নানা অনিয়ম এর মূল কারণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। ফলে বিসিকের মুল লক্ষ্য বেস্তে যেতে শুরু করেছে।

4
লক্ষ্মীপুর বিসিক শিল্প নগরীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিল্পায়নের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে লক্ষ্মীপুর শহরের মাত্র ১ কিলোমিটার অদূরে বাঞ্চানগর এলাকায় ১৬.০৭ একর ভূমি নিয়ে বিসিক শিল্প নগরীর প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০০৪ সালে প্রকল্প সম্পন্ন হয়। এর আগেই ২০০০ সাল থেকে প্লট বরাদ্ধ দেওয়া শুরু হয়। অফিস, ড্রেনেজসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার হয়েছে প্রকল্পের মোট ভূমির ৬.২৫ একর। বাকি ৯.৯১ একর ভূমিতে তৈরী করা হয় তিন ক্যাটাগরির ১০০টি প্লট। তন্মধ্যে ৫৯টি (প্রকল্প) ইউনিটের বিপরীতে এসব প্লট বরাদ্ধ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ২৭টি (প্রকল্প)ইউনিট চালু রয়েছে। ২৭টি (প্রকল্প) নির্মাণ কাজ বতর্মানে চলমান রয়েছে। বাকি ৫টি উৎপাদন জনিত কারণে বন্ধ রয়েছে।
গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তা ও ড্রেনেজ সমস্যার কারণে লোকসানের ভয়ে অধিকাংশ প্লটেই এখনো শিল্পায়ন গড়ে উঠেনি। যেগুলো গড়ে উঠেছে সেগুলোর মধ্যে বেকারী, ওয়েলমিল, জৈবসার কারখানা, সয়াবিন প্রক্রিয়াজাতকরণ ও অটো রাইচমিল, মবিল রি-প্যাকিং ফ্যাক্টরী, সামছুন্নাহার মাল্টি রিসাইকিংসহ চালু রয়েছে মাত্র ১৮ টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বিস্কুট উৎপাদন বেকারী রয়েছে ১২টি। এসব কারখানায় বছরে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যবসা হলেও, বর্তমানে উল্লেখিত সমস্যার কারণে এবং অধিক লোকসানে এ প্রতিষ্ঠান গুলো এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

6
অপরদিকে কিছু প্লটে পরিকল্পনা মোতাবেক অবকাঠামো গড়ে উঠলেও শুধুমাত্র গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, রাস্তা ড্রেনেজ সমস্যার কারণে তা চালু হচ্ছে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিসিক শিল্পনগরী এলাকার মূল ফটক থেকে শুরু করে প্রতিটি রাস্তার বেহাল দশা। কোন রাস্তার উপরই নেই কার্পেটিং। আছে বড় বড় গর্ত আর খানা-খন্দ, যেখানে পানি জমে রয়েছে।

সামান্য বৃষ্টিতেই এসব রাস্তায় হাটু সমান পানি জমে যায়। রাস্তার এ দূরাবস্থায় ভয়ে কোন যানবাহন ওই এলাকায় প্রবেশ করতে চায় না। এতে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় সংশ্লিষ্টদের। তাছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় ড্রেনগুলো খুব চিকন ও সরু। এতে বিভিন্ন স্থানে কারখানার পরিত্যক্ত ময়লা ও বজ্রপদার্থ নিষ্কাশন না হয়ে জমে আছে। এ ড্রেনগুলো পরিচ্ছন্নতার অভাবে পুরো বিসিক এলাকা জুড়ে দূর্গন্ধে নর্দমায় পরিণত হয়ে আছে। এতে বিভিন্ন রোগজীবানুর সৃষ্টি হয়ে থাকে।

2
বিসিক কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর সাড়ে চার হাজার টাকা সার্ভিস চার্জ নিলেও কোনো সুযোগ-সুবিধা ও যথাযথ তদারকি না করাসহ প্রকৃত শিল্প উদ্যোক্তাদের প্লট বরাদ্দ না দিয়ে অর্থের বিনিময়ে অসাধু বিসিক কর্মকর্তারা ব্যক্তি বিশেষের নামে-বেনামে ৫/৭টি প্লট বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক ব্যবসায়ী। এতে করে বিসিক শিল্পনগরীতে কারখানা স্থাপন থেকে শিল্প উদ্যোক্তারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন জানিয়ে সব সমস্যা সমাধানে সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন স্থানীয়রা।
এদিকে শিল্পনগরী এলাকার ল্যাম্পপোষ্টগুলোতে নেই বৈদ্যুতিক বাল্ব। এতে সন্ধ্যা নামতেই অন্ধকারে চেয়ে যায় পুরো বিসিক এলাকা। এছাড়াও নেই নিরাপত্তা বাউন্ডারী দেওয়াল। প্রতিনিয়তই ঘটছে চুরি-চিনতাইসহ বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা। এতে ঝুঁকি নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছেন বিসিক শিল্পনগরী এলাকার মালিক-শ্রমিকরা।

শিল্প উদ্যোক্তারা শীর্ষ সংবাদকে জানান, পর্যাপ্ত পরিকল্পনার অভাব রয়েছে লক্ষ্মীপুরের বিসিক শিল্পনগরীতে। রাস্তার বেহাল দশায় কোন পন্যবাহী গাড়ী ঢুকতে চায় না এখানে। শিল্পভিত্তিক গ্যাস, বিদ্যুৎ না পাওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এতে লাভের তুলনায় প্রতিদিনই লোকশান গুনতে হচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে না পেরে ব্যবসায়ীকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানই ইতোমধ্যে বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
মেসার্স চৌধূরী অটো সয়াবিন এন্ড রাইচ মিল কারখানার প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন। ৫ বছর পূর্বে নিজের জমি বিক্রয় ও ব্যাংক ঋণ নিয়ে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে সয়াবিন প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাটি শুরু করেন। অথচ অব্যহত সমস্যার কারনে লোকসানে পড়ে তার এ প্রতিষ্ঠানটি এখন বন্ধ হওয়ার পথে।

3
আলাপ কালে তিনি শীর্ষ সংবাদকে বলেন, অনেক আশা নিয়ে কারখানাটি গড়ে তুলেছিলাম। কিন্তু বিদ্যুত, গ্যাস, পানি ও রাস্তার বেহাল দশার কারণে ঠিকমত কারখানার কার্যক্রম চালাতে পারছি না। অধিক লোকসানের মুখে কারখানার শ্রমিকদের বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

আমিরাত লুব ওয়েল নামের মবিল কারখানার ম্যানেজার রসায়নবিদ রনি সেন শীর্ষ সংবাদকে বলেন, বাংলাদেশের কোন শিল্পনগরী লক্ষ্মীপুরের মত নয়। এখানে পানি থেকে শুরু করে সকল সমস্যা রয়েছে। রাস্তাটিতে গাড়ী নয় মানুষ পর্যন্ত যাতায়াত করতে কষ্ট হচ্ছে। গাড়ী চালক অতিরিক্ত ভাড়া ছাড়া বিসিক এলাকায় প্রবেশ করে না। অথচ বিসিক শিল্পনগরী কর্তৃপক্ষ যেন দেখেও তামাশা করছেন।
এদিকে অল সয়েস বিস্কুল ফ্যাক্টরির ম্যানেজার আবদুর রহিম শীর্ষ সংবাদকে জানায়, বিস্কুট উৎপাদনে সবচেয়ে প্রয়োজন বিদ্যুৎ ও গ্যাস। বিস্কুট উৎপাদনে হঠাৎ লোডশেডিং ও গ্যাস সংকট দেখা দিলে পুরো উৎপাদন কাঁচমাল বাদ করে দিতে হয়। এতে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয়। যা প্রতিনিধিই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাকে। তাছাড়া অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ড্রেনেজ সমস্যার কারনে প্রতিনিধিই সমস্যায় পড়তে হয় তাদের।

5

বিস্কুট ফ্যাক্টরি থেকে মাল পরিবহন করতে আসা মালবাহী পিকআপ ভ্যান চালক মো. রাজু শীর্ষ সংবাদকে বলেন, বিসিক এলাকার রাস্তাগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। বিভিন্ন স্থানে বড় বড় খানা-খন্দ রয়েছে, এ গর্ত গুলোতে গাড়ির চাকা পড়ে এক্সেল ভেঙ্গে প্রতিধিনই বিপাকে পড়তে হয়। তাছাড়া তার ভ্যানের এক্সেল এযাবত দুইবার ভেঙ্গেছে। যার কারণে অতিরিক্ত ভাড়া দিলেও অনেক সময় বিসিক এলাকায় আসতে চাই না।
বিসিক শিল্পনগরীর কারখানা মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কাশেম শীর্ষ সংবাদকে জানান, লক্ষ্মীপুরের বিসিক শিল্পনগরী এলাকা বর্তমানে অব্যবস্থাপনায় রয়েছে। রাস্তাঘাট নেই বললেই চলে। ড্রেনেজ ব্যবস্থা থেকেও নেই। তাছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে কোন নতুন কেউ এখানে শিল্প কারখানা করতে আসে না। যারা আছে তারাও ব্যাংক ঋণসহ বিভিন্ন লোকসানে বন্ধের পথে।
তিনি আরো জানান, অন্যান্য কারখানার চেয়ে বিস্কুল বেকারীর মালিকরা বেশি সমস্যা পড়ছে। তারা ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে সুদে ঋন নিয়ে এখন দেউলিয়ার পথে। কোটি কোটি টাকা লোকসানে পড়ে ৫টি বিস্কুট বেকারীই বন্ধ হয়ে গেছে। তাই বিসিক শিল্প বাঁচাতে তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

1

জানতে চাইলে বিভিন্ন সমস্যার কথা স্বীকার করে লক্ষ্মীপুর বিসিক শিল্প নগরীর উপ-ব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) অরবৃন্দ দাস।
তিনি শীর্ষ সংবাদকে জানান, জনবল সংকটের কারণে বিসিক শিল্পনগরী এলাকার ঠিকমত তদারকী করা যাচ্ছেনা। সব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।
তাছাড়া বিভিন্ন সমস্যার কারণে অধিকাংশ প্লটেই শিল্প উদ্যোক্তারা শিল্প কারখানা স্থাপন করতে পারছে না। নতুন করে কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখানে কারখানা গড়তে চায় না। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে খুব শীঘ্রই সমস্যাগুলোর সমাধানের আশ্বাস দেন এ কর্মকর্তা।